
নিউজ ডেস্ক: পিঠে স্কুলব্যাগ। হাতে আরও একটি ভারী ঝোলা। পরনে সাধারণ পোশাক। সকাল ন’টা নাগাদ রাস্তা দিয়ে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে যাওয়া এই দৃশ্য দেখে যে কারও মনে হতে পারে, প্রাইভেট টিউশন পড়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরছে কোনও এক স্কুলপড়ুয়া। চোখেমুখে এক রাশ সারল্য। কিন্তু এই চেনা, সাধারণ খোলসের আড়ালেই যে চোরাচালানের এমন এক মারাত্মক অপরাধের জাল বোনা হচ্ছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি সাধারণ পথচারীরা। তবে টহলদারি পুলিশের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি ওই নাবালকের পক্ষে। পড়ুয়ার ছদ্মবেশে থাকা ওই কিশোরের ব্যাগ খুলতেই কার্যত চক্ষু চড়কগাছ তদন্তকারী আধিকারিকদের। বই-খাতা, পেন-পেন্সিলের বদলে ব্যাগের ভেতর থেকে উদ্ধার হলো থরে থরে সাজানো নিষিদ্ধ কাফ সিরাপ বা ফেনসিডিলের বোতল। তাও আবার দু’এক বোতল নয়, একেবারে ১২৭ বোতল! নদিয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ থানা এলাকার মাজদিয়া টুঙ্গী রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে। পাচারের এই অভিনব ও দুর্ধর্ষ কৌশল প্রকাশ্যে আসতেই রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে গোটা নদিয়া জেলাজুড়ে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দিনটি ছিল আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই। সকালে কৃষ্ণগঞ্জ থানার অন্তর্গত মাজদিয়া টুঙ্গী রেলগেট এলাকা দিয়ে রুটিন টহল দিচ্ছিল পুলিশের একটি বিশেষ দল। সেই সময়েই ওই কিশোরকে বানপুরের দিকে হেঁটে যেতে দেখেন কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা। সকালবেলায় একজন কিশোর দুটি ভারী ব্যাগ নিয়ে একা হেঁটে যাচ্ছে, এই দৃশ্যটি প্রাথমিক ভাবে খুব একটা অস্বাভাবিক না হলেও, ছেলেটির হাঁটাচলা ও চোখেমুখে এক ধরনের চোরা আতঙ্ক লক্ষ করেন অভিজ্ঞ পুলিশ আধিকারিকরা। ব্যাগ দুটির ভারে ছেলেটি রীতিমতো কুঁকড়ে যাচ্ছিল এবং বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। সন্দেহ হওয়ায় তাকে দাঁড় করিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। আচমকা পুলিশের জেরার মুখে পড়ে থতমত খেয়ে যায় ওই কিশোর। কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে বা ব্যাগে এত ভারী কী আছে— এমন সাধারণ প্রশ্নের উত্তরেও সে অত্যন্ত অসংলগ্ন ও এলোমেলো কথা বলতে শুরু করে। বয়ানে অসঙ্গতি এবং তার ঘামতে থাকা মুখ দেখে পুলিশের সন্দেহ আরও জোরালো হয়।
কালবিলম্ব না করে পুলিশকর্মীরা ওই কিশোরকে তার ব্যাগ দুটি খুলতে নির্দেশ দেন। আর সেই ব্যাগ খুলতেই পুলিশের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। দেখা যায়, একটি ব্যাগের ভেতর সন্তর্পণে লুকিয়ে রাখা হয়েছে ৬৫ বোতল এবং অপর একটি ব্যাগে রাখা রয়েছে ৬২ বোতল নিষিদ্ধ ফেনসিডিল কাফ সিরাপ। সব মিলিয়ে মোট ১২৭ বোতল বেআইনি কাফ সিরাপ উদ্ধার হয় ওই নাবালকের কাছ থেকে, মাদক বাজারে যার বর্তমান মূল্য বেশ কয়েক হাজার টাকা। ঘটনাস্থল থেকেই নিষিদ্ধ কাফ সিরাপগুলি বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি ওই কিশোরকে আটক করে সোজা কৃষ্ণগঞ্জ থানায় নিয়ে যান তদন্তকারীরা।
থানায় নিয়ে গিয়ে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করার পর যে তথ্য উঠে আসে, তা সমাজের কাছে এক চরম অশনিসংকেত বলেই মনে করছেন সমাজতত্ত্ববিদ ও পুলিশ কর্তারা। পুলিশের জেরার মুখে ভেঙে পড়ে ১৭ বছর বয়সী ওই ধৃত কিশোর স্বীকার করে নেয় যে, সে আদতে কোনও স্কুলপড়ুয়া নয়। বেশ কিছুদিন আগেই তার প্রথাগত পড়াশোনার পাট চিরতরে চুকে গিয়েছে। অভাবের তাড়নায় হোক বা অন্য কোনও প্রলোভনে পড়ে, সে পড়াশোনা ছেড়ে পাচারকারীদের খাতায় নাম লিখিয়েছে। আর এখানেই উঠে আসছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি। তবে কি পুলিশের চোখে ধুলো দিতে এবং নজরদারি এড়াতেই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের স্কুল ব্যাগের ছদ্মবেশে পাচারের কাজে ব্যবহার করছে মাদক মাফিয়ারা?
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, নদিয়া জেলাটি ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, কারণ এর একটি বিস্তীর্ণ অংশ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রতিবেশী দেশে এই ফেনসিডিলের বিপুল চাহিদা রয়েছে এবং সেখানে এটি নেশার মাদক হিসেবে অত্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হয়। তাই সীমান্ত পেরিয়ে এই কাফ সিরাপ পাচার করাটা চোরাকারবারিদের কাছে এক অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। কিন্তু সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) এবং রাজ্য পুলিশের কড়া নজরদারির কারণে এখন প্রাপ্তবয়স্ক পাচারকারীরা সহজেই ধরা পড়ে যাচ্ছে। সেই ঝুঁকি এড়াতেই এবার উঠতি বয়সের কিশোর, বিশেষ করে যারা স্কুলছুট বা যাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল, তাদের টাকার টোপ দিয়ে এই বেআইনি কাজে ব্যবহার করছে পাচার চক্রের পান্ডারা। একজন স্কুলপড়ুয়ার ছদ্মবেশ ধারণ করলে সাধারণত তাকে কেউ সন্দেহ করবে না, এমনটা ধরে নিয়েই এই অভিনব কৌশল ফেঁদেছে মাফিয়ারা।
কৃষ্ণগঞ্জ থানার পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেহেতু অভিযুক্ত কিশোরের বয়স ১৭ বছর এবং সে আইনত একজন নাবালক, তাই প্রচলিত নিয়ম ও শিশু সুরক্ষা আইন অনুযায়ী তাকে জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের (Juvenile Court) সামনে হাজির করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে পুলিশ এই ঘটনাকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন পাচার হিসেবে দেখছে না। এই কিশোর যে আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাজ্য কোনও এক বিশাল চোরাচালান চক্রের হাতের পুতুল মাত্র, সে বিষয়ে একপ্রকার নিশ্চিত তদন্তকারীরা। এখন পুলিশের মূল লক্ষ্য হলো, এই চক্রের আসল শিকড় উপড়ে ফেলা। এত বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ফেনসিডিল কোথা থেকে ওই কিশোরের হাতে এল? কে বা কারা তাকে এই ঝুঁকি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল? এই লাখ টাকার চালানের আসল মালিক বা মাস্টারমাইন্ড কে? এবং ঠিক কোথায় বা কার কাছে এই ১২৭ বোতল কাফ সিরাপ পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জোরদার তদন্ত শুরু করেছে কৃষ্ণগঞ্জ থানার পুলিশ। একইসঙ্গে, নদিয়া জেলার সীমান্ত ঘেঁষা এলাকাগুলিতে নজরদারি আরও কড়া করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক শীর্ষ স্তরের পক্ষ থেকে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments