
নিউজ ডেস্ক: আকাশের মুখ ভার হওয়া মানেই আড়ংঘাটাবাসীর কপালে আতঙ্কের গভীর ভাঁজ। গ্রীষ্মের দহনজ্বালা জুড়োতে বৃষ্টির আগমন যেখানে সাধারণ মানুষের কাছে স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে, সেখানে নদীয়া জেলার এই ঐতিহ্যবাহী জনপদে তা আক্ষরিক অর্থেই এক দুঃস্বপ্নের নাম। কয়েক পশলা সাধারণ বৃষ্টিতেই আড়ংঘাটার বিস্তীর্ণ এলাকার রাস্তাঘাট আস্ত নদীর চেহারা নিচ্ছে। বর্ষা কিংবা অকালবর্ষণ— যখনই আকাশ ভেঙে দু’ফোঁটা জল পড়ে, তখনই জলযন্ত্রণা ও পথচলতি মানুষের চরম দুর্ভোগ যেন আড়ংঘাটার মানুষের নিত্যদিনের অচ্ছেদ্য সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। বেহাল নিকাশি ব্যবস্থার কারণে জল জমার এই মারণ সমস্যা আজ নতুন নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় সাধারণ মানুষকে এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করে যেতে হচ্ছে। বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনও সুরাহা না মেলায় এবার ক্ষোভের বাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গিয়ে যে ভয়ংকর জল-যন্ত্রণার ছবি ধরা পড়েছে, তা যে কোনও সভ্য সমাজ ও আধুনিক পঞ্চায়েত ব্যবস্থার পক্ষেই চরম লজ্জাজনক। আড়ংঘাটা পিএনবি (PNB) ব্যাংক মোড় থেকে শুরু করে এলাকার অত্যন্ত ব্যস্ত পিয়াসী মোড়— সব জায়গাতেই এখন এক হাঁটু নোংরা ও পচা জলের রাজত্ব। এর পাশাপাশি আড়ংঘাটা গার্লস স্কুল সংলগ্ন রাস্তা, সর্বদা যাত্রীদের ভিড়ে গমগম করতে থাকা রেলওয়ে স্টেশন চত্বর এবং হাটপাড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকাগুলিতে সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে পরিস্থিতি কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা হলো, বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর ঘণ্টা পেরিয়ে দিন গড়ালেও এই জমা জল নামার কোনও সামান্যতম লক্ষণ দেখা যায় না। নিকাশি নালাগুলো এতটাই অবরুদ্ধ, জঞ্জালে পূর্ণ এবং বেহাল যে, জল বেরিয়ে যাওয়ার কোনও পথই আর অবশিষ্ট নেই। ড্রেনের পচা জলের সঙ্গে বৃষ্টির জল মিশে গোটা এলাকা এক দুর্গন্ধযুক্ত ডোবায় পরিণত হচ্ছে।
এই জমা জলের কারণে দৈনন্দিন জীবনে যে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে আগামী প্রজন্মের স্কুলপড়ুয়াদের। বিশেষ করে আড়ংঘাটা গার্লস স্কুল সংলগ্ন এলাকার জলজট ছাত্রীদের জন্য এক নিদারুণ আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিঠে ভারী স্কুলব্যাগ নিয়ে, স্কুলের পোশাক গুটিয়ে, নোংরা ও পচা কাদাজল ডিঙিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের রোজ স্কুলে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এই দূষিত জল থেকে ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া থেকে শুরু করে নানা রকম ভয়ংকর চর্মরোগ এবং জলবাহিত পেটের রোগের মারাত্মক আশঙ্কা প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে অভিভাবকদের। বর্ষার মরসুমে ডেঙ্গির চোখরাঙানি যখন গোটা রাজ্যেই উদ্বেগের কারণ, তখন আড়ংঘাটার এই জমা জল যেন আক্ষরিক অর্থেই মশার আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে।
শুধু স্কুলপড়ুয়ারাই নয়, এই পথ দিয়েই প্রতিদিন অফিসে যান হাজার হাজার নিত্যযাত্রী, বাজারে কেনাকাটা করতে আসেন পার্শ্ববর্তী গ্রামের সাধারণ মানুষ। তাঁদের সকলকেই এই নোংরা জলের নরককুণ্ড পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে। সাইকেল, বাইক বা স্কুটি নিয়ে জমা জলের ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে অনেকেই রাস্তার খানাখন্দের আন্দাজ না পেয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। যাতায়াতের এই চরম অচলাবস্থা আড়ংঘাটার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে আনন্দনগর এবং রাধাকান্তপুরগামী রাস্তার বেহাল দশা এবং মাত্রাতিরিক্ত জলজটের কারণে ওই রুটে যান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অটো, টোটো বা ভ্যানের মতো ছোট যাত্রীবাহী গাড়িগুলি অনেক সময় জলমগ্ন রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও কার্যত এক অসম্ভব লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ব্যবসাতেও এই জলজটের কারণে ব্যাপক মন্দা দেখা দিচ্ছে, কারণ নোংরা জল ডিঙিয়ে ক্রেতারা আর দোকানে বা বাজারে আসতে চাইছেন না।
এই সীমাহীন দুর্ভোগের জন্য স্থানীয় প্রশাসন এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নকেই সরাসরি কাঠগড়ায় তুলছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তাঁদের স্পষ্ট অভিযোগ, পঞ্চায়েত বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাস্তা মেরামতির নামে যে কাজ হয়, তা আসলে লোকদেখানো প্রহসন মাত্র। খানাখন্দে ভরা রাস্তার ওপর কেবল তড়িঘড়ি পিচ বা কংক্রিটের প্রলেপ দিয়ে দিলেই এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান হবে না। রাস্তার উচ্চতা বাড়লেও পাশ দিয়ে বয়ে চলা নিকাশি নালা বা ড্রেনগুলি বছরের পর বছর ধরে সংস্কার না হওয়ায় মাটি ও প্লাস্টিক জঞ্জালে কার্যত বুজে গিয়েছে। কোথাও কোথাও নর্দমার ওপর বেআইনি অবৈধ দখলদারিও গড়ে উঠেছে। ড্রেন পরিষ্কার করে জলের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কোনও বিজ্ঞানসম্মত ও পরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান আজ পর্যন্ত ব্লক প্রশাসন বা পঞ্চায়েতের তরফে গ্রহণ করা হয়নি।
এলাকাবাসীর এখন একটাই স্পষ্ট দাবি— শুধু রাস্তা সারাইয়ের নামে সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ করে, অবিলম্বে একটি সঠিক, আধুনিক ও সুপরিকল্পিত নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিকাশি সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আড়ংঘাটাবাসীকে এই জল-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া কোনওভাবেই সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ধরে, প্রতি বর্ষাতেই যদি সাধারণ মানুষকে একই দুর্ভোগের ছবি দেখতে হয়, তবে উন্নয়নের গালভরা প্রতিশ্রুতির মূল্য কোথায়? কবে এই জরাজীর্ণ নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ হবে? কবে মিলবে স্থায়ী সমাধান? পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের কাছে এখন সরাসরি এই প্রশ্নগুলোই ছুড়ে দিচ্ছেন আড়ংঘাটার সাধারণ নাগরিকেরা। দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হলে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভুক্তভোগী মানুষজন।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments