Last updated: August 21st, 2026 at 02:00 pm

নিউজ ডেস্ক: শুক্রবার কাকভোরে যখন নিউটাউনের প্রশস্ত রাস্তাগুলি প্রাতর্ভ্রমণকারীদের পদচারণায় সবে মুখর হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই ঘটল এক শিউরে ওঠার মতো ঘটনা। সাতসকালে মত্ত অবস্থায় বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে কার্যত মৃত্যুর ফাঁদ তৈরি করল তিন যুবক। একের পর এক জায়গায় ধাক্কা, গাড়ির সামনের অংশ মারাত্মকভাবে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া, এমনকি চলন্ত অবস্থায় একটি চাকা সম্পূর্ণ খুলে যাওয়ার পরেও শুধু লোহার রিংয়ের ওপর ভর করে ছুটল তাঁদের চারচাকা গাড়ি! নিউটাউনের বুকে শুক্রবার ভোরের এই হাড়হিম করা ঘটনায় ইতিমধ্যেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা এলাকায়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ভয়াবহ কাণ্ড ঘটানোর অভিযোগে দুর্ঘটনাগ্রস্ত ওই গাড়িতে থাকা তিন যুবককে ইতিমধ্যেই আটক করেছে নিউটাউন থানার পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং সরকারি ও সাধারণ সম্পত্তির বিপুল ক্ষতি করার অভিযোগ উঠেছে।
ঠিক কী ঘটেছিল এদিন ভোরে? পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, শুক্রবার ভোরবেলা নিউটাউনের বলাকা মোড়ের দিক থেকে একটি চারচাকা গাড়ি প্রবল গতিতে ছুটে আসছিল বিশ্ববাংলা গেটের দিকে। গাড়ির গতিবেগ এতটাই বেশি ছিল যে, চালক একপ্রকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বলাকা মোড় থেকে বিশ্ববাংলা গেট পর্যন্ত যাওয়ার এই দীর্ঘ রাস্তায় একাধিক জায়গায় সজোরে ধাক্কা মারে গাড়িটি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, এতগুলো জায়গায় ধাক্কা খাওয়ার পরেও চালক গাড়ি থামানোর কোনও নূন্যতম চেষ্টাই করেননি। বরং সেই দুমড়ানো-মোচড়ানো গাড়ি নিয়েই রীতিমতো এঁকেবেঁকে, সমস্ত ট্রাফিক নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলতে থাকে তারা। অভিযোগ, সেই সময় গাড়ির ভিতরে তারস্বরে গান বাজছিল এবং ওই তিন যুবক মত্ত অবস্থায় প্রবল হুল্লোড়ে মেতে ছিল। বাইরের পৃথিবীতে তাদের কারণে যে কী ভয়াবহ বিপদ ঘটতে চলেছে, সেদিকে তাদের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ ছিল না।
গাড়ির এই উন্মত্ত তাণ্ডবের সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটি দেখা যায় নিউটাউন গেটের কাছাকাছি আসার পর। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এবং পুলিশের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, এতগুলো জায়গায় ধাক্কা মারার ফলে গাড়ির যান্ত্রিক কাঠামো আগেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। প্রবল গতির কারণে আচমকাই চলন্ত গাড়িটির একটি চাকা সম্পূর্ণ খুলে বেরিয়ে যায়। সাধারণ পরিস্থিতিতে এমনটা ঘটলে যে কোনও সুস্থ মস্তিষ্কের চালক ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে দেন। কিন্তু মত্ত যুবকদের কাণ্ডকারখানা ছিল সমস্ত স্বাভাবিক চিন্তাভাবনার বাইরে। চাকা খুলে যাওয়ার পর, রাস্তার পিচের ওপর সরাসরি গাড়ির ওই অংশের লোহার রিং ঘষটে ঘষটে চলতে থাকে। লোহার সঙ্গে পিচের ঘর্ষণে ফুলকি উড়তে থাকলেও, সেই অবস্থাতেই গাড়িটি তীব্র গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এই দৃশ্য দেখে রাস্তায় থাকা অল্প কয়েকজন মানুষ রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকেই প্রাণভয়ে রাস্তা থেকে সরে যান।
অবশেষে এই গতির তাণ্ডব গিয়ে শেষ হয় বিশ্ববাংলা গেটের ঠিক সামনে। লোহার রিংয়ের ওপর ভর করে চলতে চলতে গাড়িটি আর ভারসাম্য ধরে রাখতে পারেনি। সোজা গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারে বিশ্ববাংলা গেটের সামনের একটি কংক্রিটের গার্ডওয়ালে। ধাক্কার অভিঘাত এতটাই বেশি ছিল যে, গাড়ির সামনের অংশ কার্যত চুরমার হয়ে যায় এবং ইঞ্জিন বিকল হয়ে সেখানেই গাড়িটি চিরতরে আটকে পড়ে। সৌভাগ্যবশত, এত বড় দুর্ঘটনার পরেও ওই যুবকদের বড় কোনও শারীরিক ক্ষতি হয়নি। তবে এই দুর্ঘটনা যদি আর কিছুক্ষণ পরে ঘটত, যখন রাস্তায় স্কুল বাস, অফিসযাত্রী এবং সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে, তাহলে যে কত বড় মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারত, তা ভেবেই শিউরে উঠছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে তড়িঘড়ি ছুটে আসে নিউটাউন থানার পুলিশের টহলদারি ভ্যান। পুলিশ কর্মীরা দ্রুত ওই তিন যুবককে গাড়ি থেকে উদ্ধার করেন এবং আটক করে থানায় নিয়ে যান। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটিকেও ক্রেন দিয়ে সরিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। নিউটাউন থানার পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় আটক ওই তিন যুবক মত্ত অবস্থায় থাকার কথা এবং রাস্তায় একাধিক জায়গায় ধাক্কা মারার বিষয়টি কার্যত স্বীকার করে নিয়েছে। তবে তাদের কথায় অনেক অসংলগ্নতা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রের খবর।
বর্তমানে গোটা ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করেছে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের নিউটাউন থানার পুলিশ। ঠিক কী কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। প্রথমত, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির প্রকৃত গতিবেগ কত ছিল? দ্বিতীয়ত, গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে ওই তিনজনের মধ্যে ঠিক কে বসেছিল এবং তার কাছে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল কি না। তৃতীয়ত, এই তিন যুবক ছাড়া গাড়িতে বা তাদের সঙ্গে অন্য কোনও বাইকে আর কেউ ছিল কি না। এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতিমধ্যেই ওই রাস্তার সমস্ত সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আটক যুবকদের ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হচ্ছে, যাতে তাদের রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা ঠিক কতটা ছিল, তা আইনগতভাবে প্রমাণ করা যায়।
নিউটাউনের প্রশস্ত ও মসৃণ রাস্তায় এমন বেপরোয়া গতির তাণ্ডব অবশ্য নতুন কোনও ঘটনা নয়। এর আগেও রাতের অন্ধকারে বা ভোরের আলো ফোটার আগে ফাঁকা রাস্তার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির যুবককে গাড়ি বা বাইক নিয়ে রেস করতে দেখা গিয়েছে। এর ফলে একাধিকবার প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে বিভিন্ন জায়গায় নাকা চেকিং এবং স্পিড ব্রেকার বসানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, উইকএন্ড বা ছুটির দিনের আগে এই ধরনের ঘটনা যেন একটা রীতিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে প্রাতর্ভ্রমণকারী, সাইকেল আরোহী এবং সাফাইকর্মীদের জন্য এই বেপরোয়া গাড়িগুলি আক্ষরিক অর্থেই যমদূত হয়ে উঠছে। আগামী দিনে এই ধরনের ঘটনা রুখতে পুলিশকে আরও কড়া পদক্ষেপ করতে হবে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments