
নিউজ ডেস্ক: ট্রেনে দুই নৃত্যশিল্পীকে হেনস্থার অভিযোগে অবশেষে গ্রেপ্তার হলেন টিকিট পরীক্ষক বা TTE। ঘটনাটি উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর। অভিযোগ, নাচের প্রশিক্ষণে যাওয়ার পথে ট্রেনে ওঠা দুই তরুণীকে ভেন্ডার কামরায় যাত্রা করার জন্য আটকান কর্তব্যরত টিকিট পরীক্ষক। এরপর তাঁদের সঙ্গে অশালীন ভাষায় কথা বলা, মানসিক ভাবে হেনস্থা করা এবং অভিভাবকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে ওই রেলকর্মীর বিরুদ্ধে। ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর বুধবার রাতে সোনারপুর জিআরপি এলাকা থেকে অভিযুক্ত TTE প্রশান্ত নাথকে গ্রেপ্তার করেছে বনগাঁ জিআরপি।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পকসো আইনের ১২ নম্বর ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার তাঁকে বনগাঁ মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়েছে। ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ঘটনাটি গত ১৮ জুলাইয়ের। অভিযোগকারীদের দাবি অনুযায়ী, ওই দিন এক তরুণী এবং তাঁর সঙ্গে থাকা এক নাবালিকা নাচের প্রশিক্ষণে যোগ দিতে রানাঘাটের দিকে যাচ্ছিলেন। তাঁরা গোবরডাঙা স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠেন। তাড়াহুড়োর কারণে সাধারণ কামরার পরিবর্তে ভেন্ডার কামরায় উঠে পড়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
যাত্রীদের কাছে বৈধ টিকিট থাকলেও ভেন্ডার কামরায় ওঠার বিষয়টি নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কর্তব্যরত TTE-র কথা কাটাকাটি শুরু হয় বলে অভিযোগ। ট্রেনটি বনগাঁ স্টেশনে পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। অভিযোগ, TTE প্রশান্ত নাথ তাঁদের আলাদা জায়গায় নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখেন এবং বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করেন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, তাঁদের সঙ্গে আপত্তিকর এবং অশালীন ভাষায় কথা বলা হয়েছিল। এমনকি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ফোন করেও দুর্ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ। ঘটনার জেরে দুই তরুণীর নাচের ক্লাসেও পৌঁছতে দেরি হয়।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কথাবার্তার সময় অভিযুক্ত TTE তাঁদের উদ্দেশে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এমন একটি মন্তব্য নিয়েই পরে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়ায়। অভিযোগ, এক জনকে বিয়ে করার এবং অন্য জনকে সারারাত নাচানোর মতো অশালীন মন্তব্য করেছিলেন ওই রেলকর্মী।
অভিযোগের এই অংশ সামনে আসার পরেই বিষয়টি নিয়ে নৃত্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং দুই তরুণীর পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। তাঁদের অভিযোগ, রেলকর্মীর মতো দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এমন আচরণ কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শুধু দুই শিল্পীর সঙ্গেই নয়, তাঁদের অভিভাবকদের সঙ্গেও ফোনে দুর্ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। নাচের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের এক শিক্ষিকা দুই তরুণীর ক্লাসে না পৌঁছনোর কারণ জানতে ফোন করেছিলেন। অভিযোগ, তাঁর সঙ্গেও আপত্তিকর ভাষায় কথা বলা হয়।
ঘটনার পরই বনগাঁ জিআরপি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। দুই তরুণীর পরিবারের সদস্য এবং তাঁদের নৃত্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও বিষয়টি নিয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হন।
অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে বনগাঁ জিআরপি। ঘটনাটির গুরুত্ব বুঝে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগকারীদের বক্তব্যও নথিভুক্ত করা হয় বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত TTE-র ভূমিকা এবং ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে শুরু করেন তদন্তকারীরা।
ঘটনার প্রতিবাদে পরে বনগাঁ জিআরপি থানার সামনে বিক্ষোভও দেখান নৃত্যশিল্পী, তাঁদের অভিভাবক এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। শতাধিক নৃত্যশিল্পী হাতে অভিযুক্ত TTE-র ছবি নিয়ে শাস্তির দাবিতে থানার সামনে জমায়েত হন বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার পর অভিযুক্ত TTE-র বিরুদ্ধে রেলের তরফেও পদক্ষেপ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল বলে খবর। তবে পুলিশের তদন্ত চলছিল। অভিযোগের প্রকৃতি এবং তদন্তে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেয় বনগাঁ জিআরপি।
পুলিশ সূত্রে খবর, প্রশান্ত নাথের বাড়ি বিড়া এলাকায়। বুধবার রাতে সোনারপুর জিআরপি এলাকার কাছ থেকে তাঁকে আটক করা হয়। এরপর তাঁকে বনগাঁয় নিয়ে এসে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পরই গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে।
এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন বনগাঁ জিআরপি থানার ওসি নয়ন মৈত্র। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, অভিযোগের প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কোনও তথ্য বা প্রমাণ জড়িত রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।
অভিযুক্ত TTE-র বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১২৭ (২), ৭৪, ৭৬, ৭৯ এবং ১৯৬ ধারায় মামলা রুজু হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি পকসো আইনের ১২ নম্বর ধারাও মামলায় যুক্ত করা হয়েছে।
তবে মামলার ধারাগুলি প্রয়োগের পাশাপাশি অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে। পুলিশের তরফে সব দিক খোলা রেখে তদন্ত চালানো হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, ট্রেনে যাত্রার সময় কোনও নিয়ম সংক্রান্ত সমস্যা থাকলেও তার সমাধান করার নির্দিষ্ট প্রশাসনিক পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের সঙ্গে অশালীন বা অপমানজনক আচরণ করা যায় না। বিশেষ করে এক জন নাবালিকা উপস্থিত থাকা অবস্থায় এই ধরনের অভিযোগ আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত বলেই দাবি তাঁদের।
বুধবার রাতে গ্রেপ্তারের পর বৃহস্পতিবার অভিযুক্ত TTE-কে বনগাঁ মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়েছে। এখন আদালতে মামলার পরবর্তী গতিপ্রকৃতি কী হয়, সে দিকেই নজর রয়েছে।
অন্য দিকে, ঘটনার তদন্তে পুলিশ কী কী তথ্য পায় এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্যের সঙ্গে সেগুলির কতটা মিল রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রেলকর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে রেলের অভ্যন্তরীণ তদন্তের বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।
একটি ট্রেনে যাত্রীদের সঙ্গে রেলকর্মীদের আচরণ নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। তবে এই ঘটনায় অভিযোগের ধরন আলাদা মাত্রা পেয়েছে, কারণ দুই তরুণী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অশালীন ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে নাবালিকা থাকার বিষয়টিও তদন্তকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
এই মুহূর্তে অভিযুক্ত TTE পুলিশের হেফাজতে। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা আদালতের বিচার ও তদন্তের পরই চূড়ান্ত ভাবে বলা সম্ভব। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের ঘটনায় বনগাঁর এই ঘটনা ফের রেলযাত্রীদের নিরাপত্তা এবং যাত্রীদের সঙ্গে রেলকর্মীদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments