Homeউত্তর ২৪ পরগনাবনগাঁপণের দাবিতে স্ত্রীর মৃত্যু, হোমগার্ড স্বামী ধৃত

পণের দাবিতে স্ত্রীর মৃত্যু, হোমগার্ড স্বামী ধৃত

নিউজ ডেস্ক: বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই অতিরিক্ত পণের দাবিতে গৃহবধূর উপর অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছিল। এ বার সেই নির্যাতনের জেরেই
পণের দাবিতে

নিউজ ডেস্ক:

বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই অতিরিক্ত পণের দাবিতে গৃহবধূর উপর অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছিল। এ বার সেই নির্যাতনের জেরেই ২৪ বছরের এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। অভিযোগের তির তাঁর স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে। গোপালনগর থানার শুল্ক দুর্গাপুর গ্রামের এই ঘটনায় মৃতার মায়ের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর স্বামীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতের নাম প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী। তাঁর বয়স ৩২ বছর। তিনি চুক্তিভিত্তিক হোমগার্ডের কাজ করতেন বলে পরিবারের দাবি।

মৃতার নাম সুপ্রিয়া ঘোষাল। তাঁর বাপের বাড়ি গোপালনগরের ভাণ্ডারখোলা এলাকায়। প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রসেনজিতের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দম্পতির তিন বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর প্রথম দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বছর দুয়েক পর থেকেই পণের জন্য চাপ দিতে শুরু করেন স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। বাপের বাড়ি থেকে টাকা এনে দেওয়ার জন্য সুপ্রিয়ার উপর নিয়মিত চাপ তৈরি করা হত বলেও অভিযোগ।

পরিবারের দাবি, টাকা দিতে না পারলে সুপ্রিয়াকে শারীরিক এবং মানসিক ভাবে হেনস্থা করা হত। মেয়ের সংসার যাতে ভেঙে না যায়, সেই কারণে তাঁর বাবা দিলীপ ঘোষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কয়েক বার টাকা দিয়েছিলেন বলেও পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে। পেশায় ভ্যানচালক দিলীপের পক্ষে বার বার টাকা দেওয়া সম্ভব ছিল না। তার উপর প্রায় দু’বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর আর বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনার বিষয়ে রাজি হননি সুপ্রিয়া। অভিযোগ, তার পর থেকেই তাঁর উপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, বুধবার রাতে ফের টাকা চাওয়া নিয়ে সুপ্রিয়ার শ্বশুরবাড়িতে অশান্তি শুরু হয়। সেই সময় স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির কয়েক জন সদস্য মিলে সুপ্রিয়াকে মারধর করেন বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, তাঁকে জোর করে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোরও অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বাপের বাড়ির লোকজনকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের।

তবে কোনও ভাবে বিষয়টি জানতে পেরে সুপ্রিয়ার মা অপর্ণা ঘোষাল মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। একাধিক বার ফোন করা হলেও সুপ্রিয়া কিংবা তাঁর স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না বলে পরিবারের দাবি। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সুপ্রিয়াকে বনগাঁ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে কলকাতার এনআরএস হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। সেই মতো অ্যাম্বুল্যান্সে করে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, সেই সময়ও সুপ্রিয়াকে মারধর করা হয়েছিল। অ্যাম্বুল্যান্স চালকের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পারেন সুপ্রিয়ার আত্মীয়েরা বলে দাবি পরিবারের।

অবশেষে কলকাতায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার পথেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পরে এনআরএস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুপ্রিয়ার মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবর পৌঁছতেই বাপের বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। মাত্র ২৪ বছর বয়সে মেয়ের এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্যেরা।

এর পরেই গোপালনগর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন মৃতার মা। অভিযোগে প্রসেনজিৎ-সহ মোট ছ’জনের নাম রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ এবং প্রসেনজিৎকে গ্রেফতার করা হয়। বাকি অভিযুক্তদের এখনও সন্ধান চলছে।

শুক্রবার ধৃতকে বনগাঁ আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁকে সাত দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তদন্তকারীদের উদ্দেশ্য, ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সম্পূর্ণ ক্রমটি জানার পাশাপাশি বাকি অভিযুক্তদের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।

মৃতার ভাই সুমন ঘোষালের দাবি, বিয়ের আগে প্রসেনজিৎ নিজেকে পুলিশকর্মী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। পরে পরিবার জানতে পারে, তিনি চুক্তিভিত্তিক হোমগার্ডের কাজ করেন। তাঁর অভিযোগ, পণের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে দিদির উপর অত্যাচার চলছিল।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও পণের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ, সুপ্রিয়াকে কী ভাবে এবং কখন ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল, তাঁর উপর কী ধরনের নির্যাতন হয়েছিল এবং ঘটনায় আরও কারা জড়িত—সবই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

ঘটনার নেপথ্যে আর কোনও কারণ ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বক্তব্য এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্রও তদন্তের আওতায় আসবে। ময়নাতদন্ত-সহ অন্যান্য তদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর সুপ্রিয়ার মৃত্যুর সঠিক কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে।

এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিন ধরে যদি পণের জন্য নির্যাতনের অভিযোগ সত্যি হয়ে থাকে, তা হলে কেন সেই পরিস্থিতি থেকে সুপ্রিয়াকে বের করে আনা গেল না। পরিবারের অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে পণপ্রথা এবং গার্হস্থ্য নির্যাতনের মতো গুরুতর সামাজিক সমস্যার আরও একটি ভয়াবহ দিক সামনে আসবে।

অন্য দিকে, মৃতার তিন বছরের সন্তানকে ঘিরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মায়ের মৃত্যুর পর শিশুটির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্নও উঠছে পরিবারের মধ্যে। আপাতত পুলিশের হাতে গ্রেফতার প্রসেনজিৎ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার নেপথ্যের পুরো রহস্য সামনে আনার চেষ্টা চলছে। বাকি অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা যায় কি না, এবং তদন্তে আরও কী তথ্য উঠে আসে, এখন সেদিকেই নজর।

No Comments

তাজা খবর