
নিউজ ডেস্ক:অন্নপূর্ণা যোজনার আর্থিক সহায়তা নিয়ে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। বৃহস্পতিবারের পর শুক্রবারও রাজ্যের একাধিক জেলায় এই প্রকল্পের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ দেখালেন মহিলারা। কোথাও প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ, কোথাও পুরসভার সামনে অবস্থান, আবার কোথাও জাতীয় সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ—দিনভর একাধিক জায়গায় বিক্ষোভের ছবি দেখা গিয়েছে। বিরাটিতেও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে মহিলাদের রেল অবরোধের খবর সামনে এসেছে।
পশ্চিম মেদিনীপুরে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরাসরি বিক্ষোভকারী মহিলাদের সঙ্গে কথা বলেন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। জেলার প্রশাসনিক ভবনে একটি বৈঠকে যোগ দিতে গিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় সেখানে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়া নিয়ে অভিযোগ জানাতে হাজির হন একদল মহিলা। তাঁদের দেখে বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে কথা বলেন মন্ত্রী। মহিলাদের অভিযোগ শোনার পাশাপাশি দ্রুত সমস্যার সমাধানের আশ্বাসও দেন তিনি।
অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে মূল অভিযোগ, যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বহু আবেদনকারীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এখনও আর্থিক সহায়তার টাকা জমা পড়েনি। রাজ্য সরকারের তরফে ১৭ অগস্ট থেকে এই মাসের টাকা উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বলে জানানো হয়। ২০ অগস্টের মধ্যে যোগ্য উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও বহু মহিলার অ্যাকাউন্টে টাকা না আসায় শুরু হয় ক্ষোভ।
পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রশাসনিক ভবনে মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় একের পর এক অভিযোগ তুলে ধরেন মহিলারা। তাঁদের বক্তব্য, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন বা সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তাঁদের একাধিক সরকারি দফতরে ঘুরতে হচ্ছে। পুরসভায় গেলে এসডিও অফিসে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আবার এসডিও অফিসে গেলে পুরসভায় যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের টাকা কেন আটকে রয়েছে, সেই বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের।
মহিলাদের অভিযোগ শুনে অগ্নিমিত্রা তাঁদের এসডিও অথবা বিডিও অফিসে গিয়ে নিজেদের নাম, ফোন নম্বর এবং এনরোলমেন্ট নম্বর জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন। মন্ত্রী জানান, অভিযোগগুলি প্রশাসনের কাছে জমা পড়লে সেগুলি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে। শুধু তাই নয়, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলার জন্যই তিনি বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসেছেন বলেও জানান মন্ত্রী।
আলোচনার সময়ই পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক বীজিন কৃষ্ণাকে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা সংক্রান্ত সমস্যা দেখার জন্য একজন নোডাল অফিসার নিয়োগের নির্দেশ দেন অগ্নিমিত্রা। এর ফলে যাঁদের টাকা এখনও পৌঁছয়নি, তাঁদের অভিযোগ আলাদা ভাবে খতিয়ে দেখে সমস্যা চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে শুধু পশ্চিম মেদিনীপুর নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তেই একই অভিযোগে বিক্ষোভের ছবি সামনে এসেছে।
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে শুক্রবার জলপাইগুড়ি জেলাতেও বিক্ষোভ দেখান কয়েকশো মহিলা। ময়নাগুড়ি থেকে চালসাগামী ৭১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের একাধিক জায়গায় বিক্ষোভ হয়। মৌলানি এবং লাটাগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত দফতরের সামনেও মহিলারা অবস্থানে বসেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে জাতীয় সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ।
দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটেও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মহিলারা। তাঁদের অভিযোগ, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের করা সার্ভেতে গাফিলতির কারণেই তাঁদের আবেদন বাতিল হয়েছে। শুক্রবার সকালে ময়ামারি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের এক কর্মীকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় মহিলারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ওই কর্মীকে কেন্দ্রের ভিতরে তালাবন্দি করে রাখার অভিযোগও ওঠে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় বালুরঘাট থানার পুলিশ।
বিক্ষোভকারী মহিলাদের অভিযোগ, তাঁদের বাড়িতে গিয়ে সঠিক ভাবে সার্ভে করা হয়নি। ফলে প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা প্রশাসনিক তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
হুগলির তারকেশ্বরেও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে পুরসভার সামনে বিক্ষোভ দেখান মহিলারা। প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে প্রতিবাদ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। পরে পুর প্রতিনিধি এবং পুলিশের তরফে সমস্যা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হলে বিক্ষোভ তুলে নেন মহিলারা।
পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন ব্লকেও একই দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। একাধিক জায়গায় জাতীয় সড়ক এবং রাজ্য সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানান মহিলারা। রাস্তা অবরোধের জেরে যান চলাচল ব্যাহত হয়। বিক্ষোভকারীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ ও প্রশাসনকে সমস্যায় পড়তে হয়।
হাওড়ার বাগনান ২ নম্বর ব্লকেও শুক্রবার অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ দেখান মহিলারা। সেখানে রাস্তা অবরোধও করা হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, সরকারি নিয়ম মেনে তাঁরা আবেদন করেছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা পড়েনি। শুধু তাই নয়, তাঁদের আবেদনের বর্তমান স্ট্যাটাস কী, সেটিও পরিষ্কার ভাবে জানতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
ফলে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়ে জেলায় জেলায় যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা শুক্রবারও অব্যাহত রইল। একদিকে প্রশাসনের তরফে অভিযোগ খতিয়ে দেখে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে দ্রুত টাকা পাওয়ার দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন বহু মহিলা। এখন প্রশাসনিক স্তরে অভিযোগগুলি কী ভাবে যাচাই করা হয় এবং যাঁরা প্রকল্পের জন্য যোগ্য, তাঁদের অ্যাকাউন্টে কবে টাকা পৌঁছয়—সেদিকেই নজর থাকবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments