Last updated: August 17th, 2026 at 10:33 am

নিউজ ডেস্ক: দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে দুর্যোগের ঘনঘটা অব্যাহত। রাতভর মুষলধারে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির জেরে কার্যত ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। আকাশের মুখ ভার, আর সেই সঙ্গে অবিরাম বারিধারা জনজীবনকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে। হলদিয়া, নন্দীগ্রাম, চণ্ডীপুর থেকে শুরু করে ময়না, ভগবানপুর ও পটাশপুরের মতো একাধিক ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পুরোপুরি জলমগ্ন। বৃষ্টির দাপটে বহু সাধারণ মানুষের বসতবাড়িতে হু হু করে জল ঢুকে পড়েছে। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে গ্রামের পর গ্রাম, রাস্তাঘাট, স্থানীয় হাটবাজার এবং জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমগুলি। ঘরবন্দি হয়ে চরম দুর্গতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। তবে শুধু বৃষ্টির জলই নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের রাতের ঘুম সবচেয়ে বেশি কেড়ে নিয়েছে ফুঁসতে থাকা নদী।
টানা এই ভারী বর্ষণের জেরে পূর্ব মেদিনীপুরের অন্যতম প্রধান নদী কেলেঘাইয়ের জলস্তর অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে এবং দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই জলস্ফীতিই নতুন করে চরম আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে গোটা জেলা জুড়ে। বিশেষ করে ভগবানপুর এবং পটাশপুর ব্লকের নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা নদীবাঁধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রীতিমতো প্রহর গুনছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেভাবে একটানা বৃষ্টি হয়ে চলেছে, তাতে নদীবাঁধের ওপর জলের চাপ প্রতি মুহূর্তে মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কোনও মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে প্লাবনের আশঙ্কায় রাতের ঘুম উড়েছে নদীপাড়ের মানুষদের।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে ইতিমধ্যেই ময়দানে নেমেছে জেলা প্রশাসন। হলদিয়া পুরসভা এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। পুরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে চালু করা হয়েছে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের বিশেষ ক্যাম্প। জলবন্দি এবং বিপন্ন বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যেতে ইতিমধ্যেই নামানো হয়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফ (NDRF)। মহকুমা পুলিশের পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে জানানো হয়েছে যে, যে কোনও জরুরি প্রয়োজনে ৭৯৮০০২০৯৩৮— এই হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করলেই এনডিআরএফ টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাবে এবং উদ্ধারকাজ চালাবে। অন্যদিকে, নন্দীগ্রাম ও চণ্ডীপুরের একাধিক নিচু এলাকায় রাতভর বৃষ্টির জল ঢোকার কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ময়না ব্লকেও পথঘাট ও বাজারহাট সম্পূর্ণ জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত নজরদারি এবং উদ্ধারকাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো হবে।
তবে প্রশাসনের কপালে সবচেয়ে বেশি চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে পটাশপুর-১ ব্লকের আমগেছিয়া এবং তার সংলগ্ন তালছিটকিনি এলাকা। ভৌগোলিক কারণে কেলেঘাই নদীর জলস্তর বাড়লেই সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয় এই নির্দিষ্ট অংশে। নদীর একটি বড়সড় বাঁক থাকার কারণে জলের তোড় সরাসরি এসে আঘাত করে এই অংশের নদীবাঁধের ওপর। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্মৃতিতে এখনও দগদগে হয়ে রয়েছে ২০২১ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি। ওই বছর ১৭ সেপ্টেম্বর ঠিক এই তালছিটকিনি গ্রামেই কেলেঘাই নদীর দুর্বল বাঁধ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে গোটা পটাশপুর ও ভগবানপুর ব্লক ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয়েছিল। জলের তলায় চলে গিয়েছিল হাজার হাজার হেক্টর চাষের জমি, ভেসে গিয়েছিল গবাদি পশু থেকে শুরু করে মানুষের শেষ সম্বলটুকু। ঘটনার ঠিক পাঁচ বছর পর ফের একবার সেই আমগেছিয়া ও তালছিটকিনি এলাকার নদীবাঁধ নিয়ে চরম উদ্বেগে পড়েছে জেলা প্রশাসন ও রাজ্যের সেচদপ্তর।
সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই আমগেছিয়ায় সেচদপ্তরের অফিসে একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সেখানে ২৪ ঘণ্টা নজরদারির জন্য সেচদপ্তরের এসডিও (SDO) তানভীর আলমকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝলে যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তার জন্য সবরকম প্রস্তুতি সেরে রাখা হয়েছে। এদিকে, জলের তোড়ে গ্রামীণ যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে। কেলেঘাই নদীর ওপর থাকা একাধিক বাঁশ ও কাঠের সাঁকো প্রবল জলের তোড়ে সম্পূর্ণ ভেসে গিয়েছে। রবিবার ময়নার আসনান থেকে ভগবানপুরের গুড়গ্রামের মধ্যে যোগাযোগকারী একমাত্র বাঁশের সাঁকোটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে যাওয়ায় দুই এলাকার মধ্যে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। এর ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নিত্যযাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি, আমড়াখালি এবং চারুবাবুর খেয়াঘাটেও পারাপার এবং যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
বিপর্যয় এড়াতে আমগেছিয়া, বাড়মক্ষল, লক্ষ্মীরচক, জাতকাটা বাজার-সহ বিভিন্ন বিপজ্জনক এলাকায় নদীবাঁধ মেরামতের কাজ অত্যন্ত জোরকদমে চলছে। বালির বস্তা ফেলে বাঁধ মজবুত করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন সেচদপ্তরের কর্মীরা। পরিস্থিতির ওপর রাতদিন কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। শনিবার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সেচদপ্তরের কাঁথির এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার কৌশিক মণ্ডল বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পরিদর্শন করেন। রবিবার খোদ রাজ্যের সেচমন্ত্রী স্পিডবোটে করে নদীপথে নৈপুর, গোকুলপুর, মহেশপুর, অমরপুর-সহ কেলেঘাই নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন এবং বাঁধের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। পরিদর্শন শেষে তিনি আমগেছিয়ায় সেচদপ্তরের উচ্চপদস্থ ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক করেন। ওই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এগরার মহকুমা শাসক এবং পটাশপুরের বিডিও উপস্থিত ছিলেন। ওই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকেই আমগেছিয়া ও তালছিটকিনি এলাকার সংবেদনশীল নদীবাঁধের ওপর ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি রাখার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের শীর্ষ মহল থেকে। আপাতত বরুণদেবের কৃপাদৃষ্টির দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুরের বানভাসি মানুষ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments