
নিউজ ডেস্ক: শ্রাবণের তৃতীয় সোমবার শিবের মাথায় জল ঢালতে গিয়ে মর্মান্তিক পরিণতি। বিহারের লখিসরাই জেলার অশোকধাম মন্দিরে সোমবার সকালে বিপুল ভিড়ের মধ্যে পদপিষ্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে মৃত্যু হল অন্তত সাত জনের। মৃতদের সকলেই মহিলা পুণ্যার্থী বলে সর্বশেষ কয়েকটি প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে। আহত হয়েছেন ১২-র বেশি মানুষ। তাঁদের মধ্যে কয়েক জনের অবস্থা গুরুতর বলে খবর। ঘটনাকে কেন্দ্র করে মন্দির চত্বর এবং হাসপাতাল এলাকায় চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
সোমবার শ্রাবণ মাসের তৃতীয় সোমবার। সেই উপলক্ষে সকাল থেকেই অশোকধাম মন্দিরে ভক্তদের ঢল নেমেছিল। শিবলিঙ্গে জলাভিষেক করার জন্য দীর্ঘক্ষণ ধরে লাইনে অপেক্ষা করছিলেন পুণ্যার্থীরা। সময় যত গড়ায়, ভিড়ও তত বাড়তে থাকে। প্রশাসনের তরফে আগে থেকেই ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন লখিসরাইয়ের জেলাশাসক শৈলেন্দ্র কুমার। কিন্তু সোমবার সকালের ভিড় প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই বেশি হয়ে যায়।
প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৬টা থেকে পৌনে ৭টার মধ্যে পর পর দু’টি ট্রেন সেখানে পৌঁছয়। ওই ট্রেনগুলিতে আসা বহু পুণ্যার্থী একসঙ্গে মন্দিরের দিকে এগিয়ে যান। ফলে ইতিমধ্যেই জমে থাকা ভিড়ের সঙ্গে আরও বহু মানুষ যোগ দেন। মন্দিরের প্রবেশপথের কাছে আচমকাই ভিড়ের চাপ বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামলাতে ব্যবহৃত ব্যারিকেডের একটি অংশ ভেঙে পড়ে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। তার পরেই শুরু হয় হুড়োহুড়ি।
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে এখনও সব তথ্য এক জায়গায় এসে পৌঁছয়নি। প্রাথমিক ভাবে একটি বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে যাওয়ার কথা সামনে এসেছে। সেই খুঁটির কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বা এলাকায় বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন রিপোর্টে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। পুলিশ আধিকারিকরাও জানিয়েছেন, খুঁটি পড়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রাথমিক ভাবে জানা গেলেও সেটিই দুর্ঘটনার নিশ্চিত কারণ কি না, তা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে।
লখিসরাইয়ের এসডিপিও শিবম কুমারের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি পড়ে যাওয়ার পর কয়েক জন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে থাকতে পারেন বলে প্রাথমিক ভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে। তার পরেই ভিড়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পদপিষ্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে পুলিশ এখনও ঘটনাটির প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করেনি। ফলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কোনও ঘটনা ঘটেছিল কি না এবং সেটির সঙ্গে পদপিষ্ট হওয়ার সরাসরি যোগ ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়।
অন্য দিকে, লখিসরাইয়ের জেলাশাসক শৈলেন্দ্র কুমার ভিড়ের অস্বাভাবিক চাপের কথাও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ মন্দিরের দিকে চলে আসায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ব্যারিকেড ভেঙে যাওয়ার পর একে অপরের উপর পড়ে যান কয়েক জন পুণ্যার্থী। প্রশাসনের তরফে দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েক জনের বক্তব্যেও মন্দিরের প্রবেশপথের কাছে অতিরিক্ত ভিড় এবং ব্যারিকেড ভেঙে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের সব দাবি স্বাধীন ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট ক্রম সম্পর্কে তদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কোনও একটি কারণকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে না।
সোমবার সকালেই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উদ্ধারকাজ শুরু করে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা সাত। India Today-র প্রতিবেদনে মৃত সাত জনের মধ্যে চার জনের নাম—হেমলতা দেবী, ললিতা দেবী, রিঙ্কু দেবী এবং মনমালা দেবী—উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি তিন জনের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
আহতের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে ১২-র বেশি মানুষের আহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। কয়েক জনকে গুরুতর অবস্থায় উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর খবরও রয়েছে। আহতদের মধ্যে যাঁদের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক, তাঁদের চিকিৎসার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার পর মন্দির চত্বরের পাশাপাশি স্থানীয় হাসপাতালেও ভিড় জমে যায়। আহতদের পরিজনেরা হাসপাতালে পৌঁছন। প্রশাসনের আধিকারিকেরা পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজও শুরু হয়েছে।
অশোকধাম মন্দিরে শ্রাবণ মাসে বিশেষ করে সোমবারগুলিতে বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থী সমাগম করেন। এ দিনও সকাল থেকে ভক্তদের দীর্ঘ লাইন ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত সংখ্যক মানুষ মন্দিরের দিকে চলে আসায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে বলে প্রশাসনের বক্তব্য।
দু’টি ট্রেন পর পর এসে পৌঁছনোর বিষয়টিও দুর্ঘটনার পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সকাল ৬টা ৩০ মিনিট থেকে ৬টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে ট্রেন দু’টির আগমন ঘটে বলে জেলাশাসক জানিয়েছেন। এর ফলে মন্দিরমুখী ভিড়ে আচমকা বড়সড় বৃদ্ধি হয়। ব্যারিকেড ভেঙে পড়ার পর সেই ভিড়ের চাপ আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
এই ঘটনায় মন্দিরে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে প্রশাসনের তরফে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে। এখন তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে, সেই ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিল কি না এবং বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থী একসঙ্গে মন্দিরের দিকে আসার পরিস্থিতি সামলানোর জন্য অতিরিক্ত কোনও ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল কি না।
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন এটাই। একটি বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে যাওয়ার পর আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল বলে প্রাথমিক ভাবে খবর। আবার প্রশাসনের বক্তব্যে অস্বাভাবিক ভিড়, পর পর দু’টি ট্রেনের আগমন এবং ব্যারিকেড ভেঙে পড়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। ফলে দুর্ঘটনার পেছনে একটি মাত্র কারণ ছিল, নাকি একাধিক পরিস্থিতি একসঙ্গে কাজ করেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, সব তথ্য যাচাই করার পরেই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তাই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে, নাকি মূলত ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে—এই মুহূর্তে কোনও একটি ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
শ্রাবণের পবিত্র সোমবারে পুজো দিতে গিয়ে এমন মর্মান্তিক ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই শোকের ছায়া নেমেছে লখিসরাইয়ের অশোকধাম মন্দিরে। সাত পুণ্যার্থীর মৃত্যু এবং একাধিক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনায় শোকস্তব্ধ তাঁদের পরিবার। প্রশাসনের তরফে উদ্ধার ও চিকিৎসার কাজ চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনা নিয়ে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments