Homeকলকাতানবান্ন বা রাইটার্স নয়, এবার নিউটাউনেই মাথা তুলছে ৫৪ দপ্তরের অত্যাধুনিক মহা-সচিবালয়!

নবান্ন বা রাইটার্স নয়, এবার নিউটাউনেই মাথা তুলছে ৫৪ দপ্তরের অত্যাধুনিক মহা-সচিবালয়!

নিউজ ডেস্ক: রাজ্য প্রশাসনের ভরকেন্দ্র ফের একবার স্থানান্তরিত হতে চলেছে। না, হাওড়ার শিবপুরের নবান্ন নয়, কিংবা কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক
new town

নিউজ ডেস্ক: রাজ্য প্রশাসনের ভরকেন্দ্র ফের একবার স্থানান্তরিত হতে চলেছে। না, হাওড়ার শিবপুরের নবান্ন নয়, কিংবা কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংসও (মহাকরণ) নয়। রাজ্যের নতুন প্রশাসনিক সদর দপ্তর মাথা তুলে দাঁড়াতে চলেছে অত্যাধুনিক উপনগরী নিউটাউনে। বর্তমান রাজ্য সরকারের এমনই এক সুদূরপ্রসারী এবং যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা এবার সামনে এল। নতুন এই সদর দপ্তর চালু হলে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর আর শহরের এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে না। জানা গিয়েছে, রাজ্য প্রশাসনের মোট ৫৪টি দপ্তরকেই এবার এক ছাতার নীচে নিয়ে আসার মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আর এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই প্রশাসনিক মহলে একটি বিষয় কার্যত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, রাজ্যের সদর দপ্তর নবান্ন থেকে পুনরায় রাইটার্স বিল্ডিংসে ফেরানোর আর কোনো রকম সম্ভাবনা বা পরিকল্পনা বর্তমান বিজেপি সরকারের নেই।

Table of Contents

    এক ছাদের তলায় সমস্ত দপ্তরকে নিয়ে আসার মূল উদ্দেশ্য হল প্রশাসনিক কাজে অভূতপূর্ব গতি আনা এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা বা লাল ফিতের ফাঁস দূর করা। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশ্বমানের পরিকাঠামো সম্পন্ন এই নতুন সদর কার্যালয় গড়ে তোলা হবে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। কিন্তু নিউটাউনের ঠিক কোথায় মাথা তুলে দাঁড়াবে এই বিশাল আকৃতির নয়া সচিবালয়? নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, এর জন্য প্রাথমিক ভাবে নজরুলতীর্থ মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন ১৭.২৮ একর একটি সুপরিসর এবং প্রাইম লোকেশনের জমির কথা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে রাজ্য সরকার। উল্লেখ্য, পূর্বতন সরকারের আমলে এই নির্দিষ্ট জমিতেই আড়ম্বর করে ‘দুর্গাঙ্গন’ গড়ে তোলার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার সেই জমিতেই এবার রাজ্যের মূল প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের ছক কষছে। যদিও এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিলমোহর পড়ার আগে বিকল্প হিসেবে আরও দু’-একটি জমিও খতিয়ে দেখা হতে পারে। প্রশাসন চাইছে, আগামী তিন বছরের মধ্যে এই নয়া সচিবালয় নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করতে। সেই কড়া টার্গেট মাথায় রেখেই জমি চিহ্নিত করার কাজ খুব দ্রুত শেষ করা হবে বলে প্রশাসনিক কর্তারা মনে করছেন।

    রাজ্যের প্রশাসনিক ভবনের ঠিকানার এই পালাবদল বাংলার রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। একটু পিছনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্যবাহী মহাকরণের লাল বাড়ি থেকে রাজ্য প্রশাসনের ঠিকানা বদলে গিয়েছিল গত দশকে। ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসনিক সদর দপ্তর সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন গঙ্গার ওপাড়ের হাওড়ার বহুতল নবান্নে। এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে বড়সড় পটপরিবর্তন হয়েছে। নির্বাচনে বিপুল জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রথম থেকেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি নবান্ন থেকে সরকার পরিচালনা করতে খুব একটা ইচ্ছুক নন। এরপরই রাজ্যজুড়ে জোর জল্পনা শুরু হয় যে, সম্ভবত রাজ্যের প্রশাসনিক কার্যালয় ফের তার পুরনো ঠিকানা, অর্থাৎ ডালহৌসি চত্বরের রাইটার্স বিল্ডিংসে স্থানান্তরিত হতে চলেছে। এই জল্পনাকে উসকে দিয়ে রাইটার্সে মুখ্যমন্ত্রীর বসার জন্য তড়িঘড়ি দু’টি ঘর প্রস্তুতও করে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা আর হয়নি। আপাতত সেই নবনির্মিত ঘর দু’টি তালাবন্ধ অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে।

    বর্তমানে রাইটার্স বিল্ডিংসে কান পাতলে শুধুই সংস্কারের শব্দ। অন্যান্য অংশে মেরামতির কাজের জন্য চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে নির্মাণ সামগ্রী। যদিও স্বরাষ্ট্র, প্রশাসনিক ও কর্মিবর্গ দপ্তরের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শাখার কাজ এখনও সেখান থেকেই চলছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে ওয়াকিবহাল মহলের দৃঢ় ধারণা, রাইটার্স বিল্ডিংসে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে রাজ্য চালানোর কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আর অবশিষ্ট নেই। বদলে তারা চাইছে আধুনিক পরিকাঠামো যুক্ত এক নতুন এবং কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ভবন, যা আগামী কয়েক দশকের প্রশাসনিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে।

    নবান্ন থেকে সরে আসার নেপথ্যে বেশ কিছু বাস্তব সমস্যাও অনুঘটকের কাজ করেছে। ২০১৩ সালে যখন মহাকরণ থেকে নবান্নে প্রশাসনিক সদর দপ্তর সরে আসে, তখন মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি-র কার্যালয় থেকে শুরু করে অর্থ, কৃষি, বিপর্যয় মোকাবিলা, পূর্ত, তথ্য ও সংস্কৃতি, প্রশাসনিক ও কর্মিবর্গ, এবং সংখ্যালঘু উন্নয়নের মতো একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর সেখানে স্থানান্তরিত হয়। এমনকি পুলিশ ডাইরেক্টরেটের মতো অতি সংবেদনশীল কার্যালয়ও হাওড়ার এই বহুতলে চলে আসে। কিন্তু অচিরেই সমস্যা দেখা দেয় জায়গার অভাব নিয়ে। এই দপ্তরগুলির বেশ কিছু শাখা এবং অন্যান্য একাধিক দপ্তরের অফিসের জন্য নবান্নে পর্যাপ্ত জায়গা মেলা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বাধ্য হয়েই নব মহাকরণ এবং খাদ্যভবন থেকে বেশ কিছু দপ্তর পরিচালনা করতে হচ্ছিল সরকারকে।

    শুধু তাই নয়, পঞ্চায়েত, মৎস্য, সমাজকল্যাণ, স্কুল ও উচ্চশিক্ষার মতো অত্যন্ত বড় এবং জনগুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলির রাজ্য কার্যালয় বর্তমানে রয়ে গিয়েছে সল্টলেকে। ফলে প্রশাসনিক প্রয়োজনে বা জরুরি বৈঠকে সল্টলেকের এই অফিসগুলি থেকে আধিকারিকদের নবান্নে যাতায়াত করতেই রোজ অনেকটা মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। ৫৪টি দপ্তর নিউটাউনের এক ছাদের তলায় এলে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

    এর পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই পরিকল্পনার নেপথ্যে কাজ করছে। ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাসের পর আগামী দিনে রাজ্যে বিধানসভার আসন ও বিধায়কের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই ইতিমধ্যে নিউটাউনে এক সুবিশাল এবং আধুনিক নয়া বিধানসভা ভবন তৈরির কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আর সেই বিধানসভা ভবন নির্মাণের ঘোষণার পর থেকেই রাজ্য প্রশাসনের সদর দপ্তরটিও নিউটাউনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার এই মেগা পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। বিধানসভা এবং সচিবালয় কাছাকাছি থাকলে রাজ্যের সার্বিক প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা আরও অনেক বেশি সুবিধাজনক হবে, এমনটাই আশা করা হচ্ছে।

    No Comments

    তাজা খবর