Homeজেলা‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’! বিশ্ব পর্যটন দিবসে মাজদিয়ায় রবি-স্মৃতি ও শিবনিবাসের ইতিহাস ছুঁল স্কুলপড়ুয়ারা

‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’! বিশ্ব পর্যটন দিবসে মাজদিয়ায় রবি-স্মৃতি ও শিবনিবাসের ইতিহাস ছুঁল স্কুলপড়ুয়ারা

school

নিউজ ডেস্ক: ভ্রমণ মানেই কি কেবল দূর দিগন্তের হাতছানি? বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া কিংবা উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের খোঁজে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দেওয়াই কি পর্যটনের একমাত্র সংজ্ঞা? বিশ্বায়নের এই যুগে দাঁড়িয়ে যখন পর্যটন শিল্প বিশ্বজুড়ে এক বিপুল অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যম হয়ে উঠেছে, তখন ঘরের কাছের অবহেলিত ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এক অভিনব এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিল নদীয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ সুরেশ মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউট। ২৭ সেপ্টেম্বর, ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’ বা ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম ডে (World Tourism Day) উপলক্ষে এই বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে পড়েছিল এক অন্যরকম ভ্রমণে। যে ভ্রমণের উদ্দেশ্য নিছক আনন্দ নয়, বরং নিজেদের শেকড় এবং আঞ্চলিক ইতিহাসকে স্বচক্ষে দেখা ও উপলব্ধি করা।

পর্যটনকে একটি আন্তর্জাতিক শিল্পের মর্যাদা দিতে এবং এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করতে প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়। উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালের ঠিক এই দিনটিতেই রাষ্ট্রসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (UNWTO) গঠনতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছিল। পরবর্তীকালে, ১৯৮০ সাল থেকে এই দিনটি আন্তর্জাতিক স্তরে পর্যটন দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। কিন্তু এই বিশ্বজনীন উদযাপনের আবহে দাঁড়িয়ে আমরা কি নিজেদের মাটির ইতিহাসকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিই? বিশ্বকবির সেই অমোঘ বাণী— “বহু দিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।/ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশিরবিন্দু।”— এই দর্শনকেই পাথেয় করে বিশ্ব পর্যটন দিবসে নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জ সুরেশ মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউটের শিক্ষকমণ্ডলী তাঁদের পড়ুয়াদের নিয়ে আয়োজন করেছিলেন এক বিশেষ ঐতিহ্য ও ইতিহাস অন্বেষণ পর্বের।

এই শিক্ষামূলক ভ্রমণের অন্যতম প্রধান গন্তব্য ছিল নদীয়া জেলার ঐতিহাসিক শিবনিবাস। বাংলার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় একসময় এই শিবনিবাসকে ‘দ্বিতীয় কাশী’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এখানকার রাজরাজেশ্বর মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এক বিশালাকার শিবলিঙ্গ, যা এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শিবলিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃত। বইয়ের পাতায় পড়া ইতিহাস যখন চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে, তখন শিখন প্রক্রিয়া আরও জীবন্ত হয়। সুবিশাল এই শিবলিঙ্গ এবং প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী দেখে রীতিমতো বিস্মিত ও অভিভূত হয়ে পড়ে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। বাংলার নিজস্ব মন্দির স্থাপত্য এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার এক গৌরবময় অতীত যেন তাদের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। শিক্ষকরা পড়ুয়াদের বুঝিয়ে বলেন যে, ভিনরাজ্যের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর চেয়ে আমাদের রাজ্যের এই ঐতিহাসিক স্থানগুলো কোনো অংশেই কম আকর্ষণীয় নয়, প্রয়োজন শুধু সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচারের।

ঐতিহাসিক স্থাপত্য দর্শনের পর পড়ুয়াদের গন্তব্য ছিল প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি— চূর্ণী, মাথাভাঙা এবং ইছামতী নদীর ঐতিহাসিক মিলনস্থল। নদীমাতৃক বাংলার অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং যাতায়াত ব্যবস্থায় এই নদীগুলির অবদান অনস্বীকার্য। তিন নদীর এই ত্রিবেণী সঙ্গমে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা কেবল প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যই উপভোগ করেনি, বরং বাংলার নদীব্যবস্থার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত গুরুত্বও অনুধাবন করেছে। একসময় এই নদীপথেই চলত বাংলার সমৃদ্ধ বাণিজ্য। নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে অতীত বাংলার সেই নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার কথা স্মরণ করে তারা।

তবে এই ভ্রমণের সবচেয়ে আবেগঘন এবং আকর্ষণীয় পর্বটি অপেক্ষা করে ছিল মাজদিয়া রেলওয়ে স্টেশনে। যে স্টেশনের সঙ্গে পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে খোদ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি। মাজদিয়া স্টেশনের ওয়েটিং রুমে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে একটি প্রাচীন কাঠের আরামকেদারা। ইতিহাস বলছে, জমিদারি পরিদর্শনে এবং সাহিত্য রচনার তাগিদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন শিলাইদহের (বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত) কুঠিবাড়িতে যেতেন, তখন তিনি এই পথটিই ব্যবহার করতেন। কলকাতা থেকে ঢাকা মেইলে চেপে তিনি মাজদিয়া স্টেশনে এসে নামতেন। এরপর ট্রেনের ক্লান্তি দূর করতে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে থাকা এই নির্দিষ্ট আরামকেদারাটিতে বসেই বিশ্রাম নিতেন বিশ্বকবি। পরবর্তীকালে এই মাজদিয়া থেকেই নদীপথে নৌকায় চেপে তিনি রওনা দিতেন শিলাইদহের উদ্দেশে।

বিশ্ব পর্যটন দিবসে সেই স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক আরামকেদারার সামনে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করে স্কুলপড়ুয়ারা। যে কবির কবিতা আর গান তারা প্রতিদিন পড়ে, সেই মানুষটির স্পর্শ লেগে থাকা একটি জিনিস চোখের সামনে দেখতে পাওয়া তাদের কাছে ছিল এক পরম প্রাপ্তি। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা মিলে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেন। বিশ্বকবির স্মৃতির প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি এক বিনম্র স্বীকৃতি।

ভ্রমণ শেষে কৃষ্ণগঞ্জ সুরেশ মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউটের শিক্ষকমহাশয়রা জানান, পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি এই ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতা বা ‘ফিল্ড ট্রিপ’ ছাত্রছাত্রীদের মানসিক বিকাশে অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পর্যটন দিবসের মতো একটি দিনে ঘরের কাছের এই সমৃদ্ধ ইতিহাস ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পেয়ে শিক্ষার্থীরা যেভাবে উৎসাহিত হয়েছে, তা আগামী দিনে তাদের নিজেদের এলাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করবে। পর্যটন মানে শুধু দূরের অজানা দেশে পাড়ি দেওয়া নয়, বরং নিজের জন্মভূমির ধুলোমাখা ইতিহাসকে নতুন করে চেনা এবং সম্মান জানানোও পর্যটনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ— বিশ্ব পর্যটন দিবসে রানাঘাট ও কৃষ্ণগঞ্জের পড়ুয়ারা বাংলার সমাজকে সেই শিক্ষাই দিয়ে গেল।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved