Homeনদিয়াধানতলাগিনেস বুকের লক্ষ্যে ১১২টি প্রতিমা! অতীত ব্যর্থতা ভুলে বিশ্বজয়ের পথে নদিয়ার কামালপুর

গিনেস বুকের লক্ষ্যে ১১২টি প্রতিমা! অতীত ব্যর্থতা ভুলে বিশ্বজয়ের পথে নদিয়ার কামালপুর

pratima

নিউজ ডেস্ক: বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব শারদীয়া দুর্গাপুজো মানেই থিমের চমক, অভিনব মণ্ডপসজ্জার প্রতিযোগিতা আর দর্শকদের তাক লাগিয়ে দেওয়ার এক অলিখিত লড়াই। একসময় পুজোর এই মেগা লড়াই মূলত কলকাতা ও তার শহরতলিকেন্দ্রিক হলেও, বিগত এক দশক ধরে জেলাগুলির পুজোও রীতিমতো পাল্লা দিচ্ছে মহানগরীর তাবড় তাবড় বাজেটের পুজোগুলির সঙ্গে। আর সেই প্রতিযোগিতার ময়দানে এবার এক অভাবনীয় এবং ঐতিহাসিক চমক নিয়ে হাজির হতে চলেছে নদিয়া জেলার ধানতলা থানার অন্তর্গত কামালপুর দুর্গোৎসব। অতীতের সমস্ত বিতর্ক, ব্যর্থতার গ্লানি এবং না-পাওয়ার আক্ষেপকে চিরতরে পেছনে ফেলে এবার এক নতুন ইতিহাস গড়ার পথে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে এই পুজো কমিটি। বিশ্বের দরবারে নিজেদের এলাকার নাম সগৌরবে খোদাই করতে চলতি বছর তাদের পুজো মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে ১১২টি প্রতিমার এক অভূতপূর্ব ও চোখধাঁধানো সমন্বয়। উদ্যোক্তাদের এবার একটাই পাখির চোখ— যেকোনো মূল্যে ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’ (Guinness Book of World Records)-এর পাতায় নিজেদের নাম চিরস্থায়ীভাবে স্থান করে নেওয়া।

কামালপুরের এই পুজোর বর্তমান পথচলা কিন্তু কখনোই খুব একটা মসৃণ বা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। আজকের এই বিশাল আয়োজনের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে চরম লড়াই, বাধা-বিপত্তি এবং ফিরে আসার এক অদম্য কাহিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নানা ধরনের অনভিপ্রেত প্রতিকূলতা, অভ্যন্তরীণ বিতর্ক এবং প্রশাসনিক বা আর্থিক টানাপোড়েনের মুখে পড়ে গত ২০২৪ সালে সম্পূর্ণ পুজোই বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন ক্লাবের সদস্যরা। সেই বছর পুজোর উৎসবমুখর দিনগুলোতে এলাকার আপামর মানুষের মনে যে চরম হতাশা ও বিষাদের কালো ছায়া নেমে এসেছিল, তা আক্ষরিক অর্থেই ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কিন্তু বাঙালির পুজো মানে তো শুধু একটা সাধারণ উৎসব নয়, এ হলো এক গভীর নাড়ির টান। তাই ২০২৫ সালে দ্বিগুণ জেদ আর প্রবল উদ্যম নিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করে কামালপুর দুর্গোৎসব কমিটি। দর্শনার্থীদের চরম চমক দিতে সেই বছর তারা নির্মাণ করেছিল ১১২ ফুট উচ্চতার এক বিশালাকার দেবীপ্রতিমা, যা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লক্ষাধিক মানুষের ঢল নেমেছিল। কিন্তু এত বড় উদ্যোগ এবং অভাবনীয় জনজোয়ার সত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত মেলেনি সেই বহুকাঙ্ক্ষিত বিশ্বজনীন স্বীকৃতি।

তবে প্রবাদে আছে, ‘ব্যর্থতাই সাফল্যের আসল চাবিকাঠি’। পরপর দুই বছরের এই চরম ধাক্কা ও হতাশা কামালপুরের উদ্যোক্তাদের মানসিক বলকে এতটুকুও ভেঙে দিতে পারেনি, বরং তাদের জেদকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আর সেই জেদের বশবর্তী হয়েই ২০২৬ সালের শারদোৎসবে বিশ্বজয়ের এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ময়দানে নেমেছেন তাঁরা। এবার আর উচ্চতায় নয়, বরং সংখ্যা, বৈচিত্র্য ও শিল্পের এক মহাজাগতিক মেলবন্ধনে চমক দিতে চলেছেন তাঁরা। আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গোটা পুজো মণ্ডপজুড়ে স্থাপন করা হবে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১১২টি প্রতিমা। মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় প্রতিটি প্রতিমাতেই থাকবে আলাদা আলাদা থিম, রঙের বৈচিত্র্য এবং অভিনব দর্শনের ছোঁয়া। একসাথে এতগুলো দুর্গাপ্রতিমার সমাহার বিশ্বের পুজো ইতিহাসে যে এক বিরল ও রেকর্ড গড়া ঘটনা হতে চলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এত বড় একটি মেগা প্রজেক্ট বা মহাযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করা কোনো একক মানুষের কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ, লোকবল এবং প্রশাসনিক সমর্থন। তবে সুখবর হলো, কামালপুরের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের শুরু থেকেই তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন রানাঘাট উত্তর-পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক অসীম সরকার। একজন জনপ্রতিনিধির এই নিঃশর্ত সমর্থন পুজো কমিটির সদস্যদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। পুজো কমিটির অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা সুজয় বিশ্বাস বর্তমান প্রস্তুতি নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী। সাধারণ মানুষের ও সংবাদমাধ্যমের কৌতূহল মেটাতে তিনি জানিয়েছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই একটি বিশেষ সাংবাদিক সম্মেলন করে পুজোর থিম, প্রতিমার রূপরেখা এবং গিনেস বুকে নাম তোলার আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।

পুজো আসতে আর খুব বেশি দিন বাকি নেই। অন্যদিকে, প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় মাঝে মাঝেই চোখ রাঙাচ্ছে প্রতিকূল আবহাওয়া ও অকাল বৃষ্টি। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক বাধাকে কার্যত তোয়াক্কা না করেই মণ্ডপসজ্জা এবং ১১২টি প্রতিমা নির্মাণের কাজ এই মুহূর্তে চলছে একেবারে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। বাঁশ, কাপড় আর ফাইবার-মাটির কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে রাতদিন এক করে ঘাম ঝরাচ্ছেন শয়ে শয়ে শিল্পী ও কারিগর। শত বাধা, বিতর্ক আর অতীতের ব্যর্থতা পেরিয়ে কামালপুরের এই ঐতিহাসিক পুজো ঘিরে এখন শুধু নদিয়া নয়, বরং গোটা বাংলাজুড়েই এক তুমুল উৎসাহ ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ দর্শনার্থী থেকে শুরু করে শিল্পবোদ্ধা— সকলেই এখন মুখিয়ে আছেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য, যেদিন কামালপুর দুর্গোৎসবের মণ্ডপের পর্দা উঠবে এবং বিশ্বের দরবারে নদিয়ার নাম আরও একবার স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved