
নিউজ ডেস্ক; রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়াল পশ্চিম বর্ধমানের মানকর গ্রামীণ হাসপাতালে। চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলে শনিবার গভীর রাতে হাসপাতালে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠল মৃতের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। জরুরি বিভাগের চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে হাসপাতালের আসবাবপত্র, ওষুধ—ভাঙচুরের হাত থেকে কিছুই রেহাই পায়নি বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, প্রাণ বাঁচাতে চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কয়েক জন হাসপাতালের একটি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন বলে জানা গিয়েছে।
অন্য দিকে, হাসপাতালে ভর্তি থাকা কয়েক জন রোগীও আতঙ্কে নিজেদের শয্যা ছেড়ে বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নেন। তাঁদের কারও হাতে তখনও স্যালাইনের বোতল ছিল বলে দাবি এক রোগীর। খবর পেয়ে বুদবুদ থানার পুলিশ হাসপাতালে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত রোগীর নাম বুধন বাউড়ি (৫৪)। তাঁর দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ঠিক কী কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই স্পষ্ট হবে। তবে ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার রাত প্রায় ১টা নাগাদ বুধন বাউড়িকে মানকর গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। বুধনের বুকে ব্যথা হচ্ছিল বলে পরিবার সূত্রে দাবি। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, চিকিৎসার পর রোগী নিজেকে তুলনামূলক ভাবে সুস্থ বোধ করছিলেন। সেই পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে কিছুটা দূর যাওয়ার পরেই ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন বুধন।
পরিবারের দাবি, বাড়ি ফেরার পথেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাস্তাতেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। এরপর ক্ষুব্ধ পরিবারের সদস্যরা তাঁকে আবার মানকর গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে বুধনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এর পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ।
পরিবারের তরফে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগ, বুধনকে আরও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখা হলে অথবা হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করা হলে এই পরিণতি হত না।
এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ শুরু হয়। অভিযোগ, এক পর্যায়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। চিকিৎসার বিভিন্ন সরঞ্জাম নষ্ট করার পাশাপাশি প্রচুর ওষুধও নষ্ট হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। ভাঙা হয় আসবাবপত্রও।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কয়েক জনকেও মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ। নিরাপত্তার জন্য তাঁরা হাসপাতালের একটি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। বেশ কিছুক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয় তাঁদের।
হাসপাতালের ভিতরে তখন চিকিৎসাধীন ছিলেন অন্যান্য রোগীরাও। আচমকা ভাঙচুর ও গোলমালের ঘটনায় তাঁরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগী উত্তম লোহার বলেন, ‘‘অনেক লোক এসে হাসপাতালে ভাঙচুর শুরু করায় ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভয়ে স্যালাইনের বোতল নিয়েই আমরা কয়েক জন রোগী হাসপাতালের বাথরুমে গিয়ে লুকিয়েছিলাম। পুলিশ এসে আমাদের বের করে।’’
এই ঘটনায় হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা এবং রোগীদের নিরাপত্তা—দুই বিষয় নিয়েই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভাঙচুরের জেরে জরুরি বিভাগের বেশ কিছু সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী সময়ে রোগীদের পরিষেবা দিতে সমস্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালের এক নার্সের কথায়, এর আগেও মানকর হাসপাতালে গোলমাল হয়েছে। কিন্তু শনিবার রাতের মতো পরিস্থিতি আগে কখনও তৈরি হয়নি।
ওই নার্স বলেন, ‘‘এর আগেও হাসপাতালে গন্ডগোল হয়েছে। কিন্তু শনিবার রাতে যা হয়েছে, তা অতীতে কখনও হয়নি। হাসপাতালের যে দশা হয়েছে, তাতে এখন কোনও রোগীর চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। সুগার, প্রেশার মাপার মেশিন-সহ অনেক কিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রাতের ডিউটিতে আমাদের নিরাপত্তা চাই।’’
স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশের দাবি, রাতের ডিউটিতে হাসপাতালের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। চিকিৎসক এবং নার্সদের উপর হামলার অভিযোগে তাঁরা আতঙ্কিত। রোগীর পরিবারের ক্ষোভ বা অভিযোগ থাকতেই পারে, কিন্তু তার জন্য হাসপাতালের সম্পত্তি নষ্ট করা বা স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর হামলা কোনও ভাবেই সমাধান নয় বলেও তাঁদের বক্তব্য।
মানকর গ্রামীণ হাসপাতালের সুপার সপ্তর্ষি কোনার চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বুধনকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। রোগী সুস্থ বোধ করায় তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সপ্তর্ষি কোনার বলেন, ‘‘আমরা যথাযথ চিকিৎসা করেছিলাম। রোগী সুস্থ বোধ করায় তাঁকে ছেড়ে দিই। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ৮০০ মিটার গিয়েছিলেন রোগী। তার পরে তাঁর মৃত্যু হয়।’’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং পরিবারের অভিযোগ—দুই ভিন্ন দাবির মধ্যে এখন ময়নাতদন্তের রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বুধনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্তের পরেই পরিষ্কার ছবি পাওয়া যেতে পারে।
মৃতের পরিবারের সদস্য রাহুল বাউড়ির দাবি, বুধনকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে না দিয়ে আরও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখা বা হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত।
রাহুলের অভিযোগ, ‘‘রোগীকে আর কিছুক্ষণ রেখে দিলে বা হাসপাতালে ভর্তি করে নিলে এমন পরিণতি হতো না। চিকিৎসকদের গাফিলতির জন্য মৃত্যু হয়েছে রোগীর।’’
অন্য দিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগ মানতে নারাজ। ফলে বুধনের চিকিৎসার সময় কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছিল, তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত কী ভাবে নেওয়া হয়েছিল—এই বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে উঠেছে।
শনিবার রাতের ঘটনার পর রবিবার সকালেই নিরাপত্তার দাবিতে অবস্থানে বসেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশ। তাঁদের দাবি, কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে রাতের ডিউটি করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ঘটনার পর বুদবুদ থানার পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও হাসপাতাল চত্বরে এখনও আতঙ্কের আবহ রয়েছে। রোগীর মৃত্যু ঘিরে পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং ভাঙচুরের ঘটনায় তদন্ত—সব মিলিয়ে এখন নজর পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
বুধন বাউড়ির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের রিপোর্টে কী উঠে আসে, চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগের কোনও ভিত্তি রয়েছে কি না এবং হাসপাতাল ভাঙচুর ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিগ্রহের ঘটনায় কারা জড়িত—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments