
নিউজ ডেস্ক; পুজো এলেই হঠাৎ করে মনে পড়ে ধনেখালির তাঁতিদের কথা। পুজোর বাজারে শাড়ির চাহিদা বাড়ে, দোকানের তাক ভরে ওঠে ধনেখালির তাঁতের নাম করে। সংবাদমাধ্যমেও তখন উঠে আসে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই হস্তশিল্পের কথা। কিন্তু উৎসবের মরসুম পেরিয়ে গেলেই ফের নিস্তব্ধতা। তাঁতঘরে আর আগের মতো শোনা যায় না মাকুর খটখট শব্দ। একের পর এক তাঁত গুটিয়ে রাখা হচ্ছে। পেশা বদলাচ্ছেন তাঁতিরা। আর নতুন প্রজন্মের বড় অংশই এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
ধনেখালির কয়েকজন প্রবীণ তাঁতির কথায়, ‘‘পুজো এলেই আপনারা আমাদের কথা মনে করেন। কাজ শেষ হয়ে গেলে সারা বছর আর কেউ খোঁজ নেন না। তাই আমরাও এখন নিজেদের সমস্যার কথা বলতে চাই না।’’
কথার মধ্যে অভিমান থাকলেও তার পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের এক বাস্তবতা। একসময় ধনেখালির বহু গ্রামের ঘরে ঘরে ছিল তাঁত। আলা, মামুদপুর, হারপুর, বৃন্দাবনপুর, ঘনরাজপুর, মির্জানগর-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলত হস্তচালিত তাঁত। বাড়ির উঠোন কিংবা ঘরের এক কোণে বসেই পরিবারের একাধিক সদস্য যুক্ত থাকতেন শাড়ি তৈরির কাজে। তাঁতের মাকুর শব্দই যেন বলে দিত, গ্রাম জেগে রয়েছে, কর্মচাঞ্চল্য চলছে।
আজ সেই ছবি অনেকটাই বদলে গিয়েছে।
বাপ্পান দাস, অনুপ দাস, কৃপাসিন্ধু দে-র মতো প্রবীণ তাঁতিদের স্মৃতিতে এখনও সেই দিনগুলি স্পষ্ট। তাঁদের কথায়, কয়েক দশক আগেও ধনেখালিতে প্রায় ২ হাজার পরিবার তাঁত বুনে জীবিকা নির্বাহ করত। হস্তচালিত তাঁত ছিল বহু পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। ধনেখালির তাঁতের কাপড়ের গুণমান, স্থায়িত্ব এবং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও এর চাহিদা ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাজার। আধুনিক যন্ত্রচালিত তাঁত, দ্রুত উৎপাদন এবং সিন্থেটিক সুতোর ব্যবহার হস্তচালিত তাঁতশিল্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কম সময়ে বেশি কাপড় তৈরি হওয়ায় মেশিনে উৎপাদিত পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে ধনেখালির তাঁতিদের পক্ষে।
তার উপর রয়েছে উৎপাদন খরচ এবং মজুরির হিসাব। একটি শাড়ি তৈরি করতে অনেক সময় দুই থেকে আড়াই দিন পর্যন্ত লেগে যায়। শুধু একজনের শ্রমে কাজ শেষ হয় না। অন্তত দু’-তিন জনকে কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত থাকতে হয়। অথচ সেই পরিশ্রমের তুলনায় তাঁতিদের হাতে যে অর্থ আসে, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন বলেই দাবি প্রবীণদের।
প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁত বুনছেন মোহনলাল দত্ত। সোমসপুর ইউনিয়ন উইভার্স কোঅপারেটিভ সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত এই প্রবীণ তাঁতির কথায়, একটি শাড়ি তৈরি করতে দিনের পর দিন পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু সেই শ্রমের উপযুক্ত মূল্য সবসময় পাওয়া যায় না। তাঁর বক্তব্য, কোথাও ৪০০ টাকা, কোথাও আবার ৯০০ টাকার মতো মজুরি মিললেও সময় ও শ্রমের তুলনায় সেই আয় অত্যন্ত কম।
এই কারণেই নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁত আর আকর্ষণীয় পেশা হয়ে উঠছে না। মোহনলালের পরিবারের ছেলেরাও আর তাঁত চালাতে চান না। তাঁর কথায়, ‘‘কেনই বা চালাবে? অন্য কাজে একই সময়ের তুলনায় বেশি আয় করা সম্ভব হলে কেউ দিনের পর দিন তাঁতের সামনে বসে থাকতে চাইবে কেন?’’
তাঁতিদের এই বক্তব্যের মধ্যেই ধরা পড়ছে প্রজন্ম বদলের কঠিন বাস্তবতা। যাঁরা যৌবনে প্রথম মাকু ধরেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখনও কোনও রকমে পেশাটিকে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু তাঁদের সন্তানদের অধিকাংশই অন্য পেশার দিকে চলে গিয়েছেন। কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ কারখানায় কাজ খুঁজছেন, কেউ আবার অন্য কোনও পেশায় যুক্ত হয়েছেন। ফলে পুরনো তাঁতঘরে নতুন করে মাকু ধরার মানুষ কমছে।
শুধু বাজারের প্রতিযোগিতা নয়, কাঁচামালের সমস্যাও তাঁতিদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। ধনেখালির কয়েকটি সমবায় সূত্রে জানা গিয়েছে, সরকারি সংস্থার মাধ্যমে পাওয়া সুতোর মান নিয়েও তাঁতিদের একাংশের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, অনেক সময় সুতো জট পাকিয়ে যায়। রং করার সময়ও সমস্যা দেখা দেয়। তাঁত বোনার সময়ে সুতো ছিঁড়ে গেলে কাজ থেমে যায়। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং বাড়ে সময় ও শ্রমের অপচয়।
তাঁতিদের অভিযোগ, সরকারি ব্যবস্থার বাইরে থেকে সুতো কেনার সুযোগ বা সামর্থ্য সবসময় থাকে না। ফলে মান নিয়ে সমস্যা থাকলেও সেই সুতো দিয়েই কাজ চালাতে হয়। এর প্রভাব পড়ে তৈরি কাপড়ের মানেও।
ধনেখালি বিধানসভা এলাকায় বর্তমানে তিনটি তাঁত সমবায় রয়েছে। দু’টি ধনেখালিতে এবং একটি গুড়াপে। সোমসপুর ইউনিয়ন উইভার্স কোঅপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের কর্মীদের বক্তব্য, সরকারি নথিতে এখনও বহু তন্তুবায়ের নাম রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের অর্ধেকেরও কম বর্তমানে নিয়মিত তাঁত চালান। অর্থাৎ খাতায় যে সংখ্যা দেখা যায়, বাস্তবের তাঁতঘরে তার প্রতিফলন নেই।
একসময় যে শিল্প হাজার হাজার মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেই শিল্প এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। প্রবীণ তাঁতিরা বলছেন, শুধু ঐতিহ্যের কথা বলে এই পেশাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো সুযোগ, উন্নত মানের কাঁচামাল, ন্যায্য মজুরি এবং নতুন প্রজন্মকে এই পেশায় আনার মতো বাস্তব উদ্যোগ প্রয়োজন।
ধনেখালির তাঁত শুধু একটি শাড়ি তৈরির পদ্ধতি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পরিবারের ইতিহাস, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং বাংলার হস্তশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য। একসময় যে মাকুর শব্দে গ্রামের সকাল শুরু হত, আজ সেই শব্দ অনেক ঘরেই থেমে গিয়েছে। কোথাও তাঁত ঢাকা পড়েছে ধুলোয়, কোথাও কাঠামো পড়ে রয়েছে অব্যবহৃত অবস্থায়।
পুজোর বাজারে ধনেখালির তাঁতের শাড়ি যখন নতুন করে নজর কাড়ে, তখন হয়তো ক্রেতার চোখে দেখা যায় রং, নকশা আর বুননের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই শাড়ির প্রতিটি সুতোয় মিশে থাকে একজন তাঁতির বহু ঘণ্টার পরিশ্রম। সেই শ্রমের মূল্য যদি তাঁতঘর পর্যন্ত না পৌঁছয়, তবে উৎসবের মরসুমের চাহিদা দিয়েই এই শিল্পকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা কঠিন।
তাই ধনেখালির তাঁতিদের প্রশ্নটা শুধু পুজোর সময়ের নয়। প্রশ্নটা সারা বছরের। মাকুর খটখট শব্দ কি আবার ফিরবে ধনেখালির প্রতিটি তাঁতঘরে? নাকি প্রবীণ তাঁতিদের হাতেই শেষ হয়ে যাবে কয়েক প্রজন্মের পুরনো এই পেশার উত্তরাধিকার—উত্তর খুঁজছে ধনেখালির গ্রামগুলি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments