
নিউজ ডেস্ক; দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা পুরুলিয়ার ছড়রা এয়ারস্ট্রিপে এ বার বিমান চলাচলের উদ্যোগ শুরু হতে চলেছে। রবিবার পুরুলিয়া সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক বৈঠকের পর এমনই ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, ছড়রায় বিমান নামানোর প্রক্রিয়া এগোচ্ছে এবং আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে চুক্তি বা মউ স্বাক্ষর হবে। বিমানবন্দর চালু হলে জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি পর্যটন ও শিল্পক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক বৈঠকে জেলার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। বন, পর্যটন, পূর্ত এবং পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতরের আধিকারিকদের পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের পদস্থ কর্তাদের উপস্থিতিতে পরিকাঠামো, পর্যটন, শিল্প এবং কর্মসংস্থান নিয়ে একাধিক বিষয় উঠে আসে।
পুরুলিয়া শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ছড়রায় রয়েছে ঐতিহাসিক এয়ারস্ট্রিপটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক প্রয়োজনে এই বিমানঘাঁটি তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে সেটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে ছড়রা এয়ারস্ট্রিপকে আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহারের দাবি বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।
জেলার বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা নেপাল মাহাতো জানিয়েছেন, ২০০১ সালে তিনি প্রথম বিধানসভায় ছড়রায় বিমানবন্দর তৈরির দাবি তুলেছিলেন। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে একাধিক বার আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য বাজেটেও ছড়রা বিমানবন্দর তৈরির উদ্যোগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় সেই দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা নতুন গতি পেল বলে প্রশাসনিক মহলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর মউ স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। বিমানবন্দরের জন্য অসামরিক বিমান পরিবহণ সংক্রান্ত প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিমানবন্দরের পাশাপাশি পুরুলিয়ার পর্যটন সম্ভাবনা নিয়েও একাধিক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। জঙ্গলকে কেন্দ্র করে পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি বন দফতরের অতিথি আবাসগুলির পরিকাঠামো উন্নত করার কথা বলা হয়েছে।
পুরুলিয়ার ধর্মীয় পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রশাসনিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। অযোধ্যা পাহাড়, জঙ্গল, জলাধার এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানকে কেন্দ্র করে জেলার পর্যটনকে আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
কোটশিলা বনাঞ্চলকে ঘিরে অভয়ারণ্য তৈরির যে প্রস্তাব জেলা প্রশাসনের তরফে পাঠানো হয়েছে, সেটিও অনুমোদনের দিকে এগোচ্ছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুরুলিয়ার জঙ্গলভিত্তিক পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
পুরুলিয়া শহরের উপকণ্ঠে সুরুলিয়া মিনি-জ়ু নিয়েও প্রশাসনিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। চিড়িয়াখানাটির পরিকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে সুরুলিয়া মিনি-জ়ুতে চিতাবাঘ আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, নিরাপত্তা এবং বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত বিধি মেনে প্রস্তুতি নিতে হবে।
পর্যটন ও বন্যপ্রাণ—দুই ক্ষেত্রকে পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাই পুরুলিয়ার জন্য নেওয়া হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
পর্যটনের পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রেও বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, আগামী দিনে পুরুলিয়ায় প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ আসতে পারে।
পুরুলিয়ার শিল্প পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ এবং জমি-সহ প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে প্রশাসনিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। রঘুনাথপুর শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করেও ইতিমধ্যে একাধিক প্রকল্পের কথা সামনে এসেছে।
জেলায় বিমানবন্দর চালু হলে শিল্পের পাশাপাশি পর্যটন ব্যবসাতেও গতি আসতে পারে বলে প্রশাসনিক মহলের একাংশ মনে করছে। যদিও ঘোষিত বিনিয়োগ বাস্তবে কতটা এবং কোন কোন প্রকল্পে রূপ পাবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী প্রশাসনিক ও শিল্প সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার উপর।
রবিবার কড়াডির সভামঞ্চ থেকেও জঙ্গলমহলের শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও মজুরি নিয়ে একাধিক ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। ‘বিকশিত ভারত জি রাম জি’ প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী ছয় মাসে প্রতি অঞ্চলে ৫০ লক্ষ টাকার কাজ করার কথা বলেন তিনি।
এ ছাড়াও ১২৫ দিনের কাজ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রতিদিন ৩০০ টাকা মজুরি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। জঙ্গলমহলের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের—এমনই বক্তব্য তাঁর।
তবে এই প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন, কাজের পরিমাণ এবং মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশিকা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত হবে।
ছড়রা বিমানবন্দর, জঙ্গলভিত্তিক পর্যটন, অভয়ারণ্য, সুরুলিয়া মিনি-জ়ু, শিল্প বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান—একাধিক বিষয়কে একই উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে রাখার বার্তা মিলেছে রবিবারের প্রশাসনিক বৈঠকে।
দীর্ঘদিন ধরে পুরুলিয়ার অন্যতম সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে যোগাযোগ পরিকাঠামো। জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে দ্রুত পৌঁছনোর পাশাপাশি শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও উন্নত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকে ছড়রায় বিমান পরিষেবা চালুর উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এখন নজর ২৮ সেপ্টেম্বরের দিকে। নির্ধারিত দিনে মউ স্বাক্ষর হলে ছড়রা বিমানবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এগোবে। এরপর বিমানবন্দর তৈরির কারিগরি কাজ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং পরিষেবা চালুর সময়সীমা কী হয়, সেদিকেই নজর থাকবে পুরুলিয়াবাসীর।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments