Homeনদিয়ামায়াপুরভক্তিরসে মাতোয়ারা মায়াপুর! রাজবেশে দর্শন দিলেন রাধারাণী, সাড়ম্বরে পালিত রাধাষ্টমী

ভক্তিরসে মাতোয়ারা মায়াপুর! রাজবেশে দর্শন দিলেন রাধারাণী, সাড়ম্বরে পালিত রাধাষ্টমী

নিউজ ডেস্ক: ভাদ্রের মেঘলা আকাশ আর শরতের আগমনী বার্তার মাঝেই এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক পরিবেশের সাক্ষী থাকল নদীয়ার শ্রীধাম মায়াপুর। শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর ঠিক পনেরো দিন পর, ভাদ্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে
iskon

নিউজ ডেস্ক: ভাদ্রের মেঘলা আকাশ আর শরতের আগমনী বার্তার মাঝেই এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক পরিবেশের সাক্ষী থাকল নদীয়ার শ্রীধাম মায়াপুর। শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর ঠিক পনেরো দিন পর, ভাদ্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পুণ্যার্থীর উপস্থিতিতে এবং তীব্র ভক্তিভাবের মধ্য দিয়ে পালিত হলো শ্রীমতী রাধারাণীর শুভ আবির্ভাব তিথি বা ‘রাধাষ্টমী’। ইস্কন (ISKCON) শ্রীমায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দিরে প্রতি বছরের মতো এবারও এই পুণ্যতিথি ঘিরে দেখা গেল এক অভূতপূর্ব উৎসবের আমেজ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং ভৌগোলিক সীমারেখার গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র মন্দির প্রাঙ্গণ কার্যত পরিণত হয়েছিল এক মহামিলনক্ষেত্রে। খোল-করতাল, শঙ্খধ্বনি আর সহস্র কণ্ঠের হরিনাম সংকীর্তনে সকাল থেকেই মুখরিত হয়ে ওঠে মায়াপুরের আকাশ-বাতাস।

বৈষ্ণব দর্শন অনুযায়ী, শ্রীমতী রাধারাণী হলেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি বা আনন্দদায়িনী সত্তা। ভক্তি ও প্রেমের মূর্ত প্রতীক হিসেবে তাঁকে আরাধনা করা হয়। সেই পরম আরাধ্যা দেবীর জন্মতিথি উপলক্ষে মায়াপুরের ইস্কন মন্দিরকে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল এক মায়াবী রূপকথার মতো করে। উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় একেবারে সাতসকালে। ঊষালগ্নে বিশেষ মঙ্গল আরতি, জপ ও ধ্যানের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচির সূত্রপাত ঘটে। এ দিন শ্রীশ্রী রাধা-মাধব এবং রাধারাণীকে এক অপূর্ব এবং নয়নাভিরাম রাজবেশে সজ্জিত করা হয়েছিল। দেশ-বিদেশ থেকে আনা বহুমূল্য রেশম বস্ত্র, মণিমুক্তোর অলংকার এবং নানাবিধ সুগন্ধি পুষ্পের সুনিপুণ গাঁথনিতে সেজে উঠেছিলেন আরাধ্য দেব-দেবী। গোটা মন্দির প্রাঙ্গণ এবং বেদির চারপাশে ছিল রঙিন আলপনা এবং দেশি-বিদেশি দুর্লভ ফুলের নজরকাড়া সাজসজ্জা। সকালবেলা মন্দিরের দরজা খোলামাত্রই সেই স্বর্গীয় রূপ চাক্ষুষ করতে এবং দেবীর কৃপালাভের আশায় হাজার হাজার ভক্তের ঢল নামে মন্দির চত্বরে। দর্শনার্থীদের ভিড় সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের।

রাধাষ্টমী উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল দুপুরের বহু প্রতীক্ষিত ‘মহাভিষেক’ অনুষ্ঠান। দুপুরের দিকে যখন এই বিশেষ পর্বের সূচনা হয়, তখন সমগ্র মায়াপুর ধামে এক পরম আধ্যাত্মিক শিহরণের সৃষ্টি হয়। নিরবচ্ছিন্ন বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, গুরুগম্ভীর শঙ্খধ্বনি এবং উদ্দাম হরিনাম সংকীর্তনের উন্মাদনার মাঝেই মূল বিগ্রহের অভিষেক পর্ব সম্পন্ন হয়। ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি ও বৈদিক শাস্ত্রবিধি মেনে দুধ, দই, খাঁটি ঘি, মধু, রকমারি ফলের রস, সুবাসিত জল এবং তীর্থসলিল দিয়ে পরম যত্নে স্নান করানো হয় রাধারাণীকে। এ সময় উপস্থিত দেশি-বিদেশি অগণিত ভক্তের কণ্ঠে সমস্বরে উচ্চারিত হতে থাকে মহামন্ত্র। খোল ও করতাল বাদনের তালে তালে আবেগে আত্মহারা হয়ে নৃত্য করতে দেখা যায় বহু পুণ্যার্থীকে। ভক্তির এই প্রবল জলোচ্ছ্বাসে যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি।

মহাভিষেকের পবিত্র আচার সমাপ্ত হওয়ার পর শুরু হয় আরেক মহাযজ্ঞ— অন্নকূট বা ভোগ নিবেদন পর্ব। শ্রীমতী রাধারাণীর উদ্দেশে পরম নিষ্ঠার সঙ্গে ৫৬ ভোগ সহ শত শত রকমের সুস্বাদু নিরামিষ ব্যঞ্জন নিবেদন করা হয়। মন্দিরের নিজস্ব রন্ধনশালায় দেশ-বিদেশের ভক্তদের সেবায় প্রস্তুত করা হয়েছিল নানাবিধ মিষ্টান্ন, মালপোয়া, ক্ষীর, পায়েস এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী পদ। ভোগ নিবেদনের পর সেই প্রসাদ ‘মহাপ্রসাদ’ হিসেবে আগত সর্বস্তরের দর্শনার্থী ও ভক্তদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। ধনী-দরিদ্র, জাতপাত নির্বিশেষে একাসনে বসে সেই মহাপ্রসাদ গ্রহণের দৃশ্য আরও একবার প্রমাণ করে দেয় মায়াপুরের সাম্য ও সম্প্রীতির শ্বাশ্বত বাণীকে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই মায়াপুরের ইস্কন মন্দির প্রাঙ্গণ এবং সুসজ্জিত প্রেক্ষাগৃহে শুরু হয় এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত স্বনামধন্য শিল্পীদের পরিবেশনায় বৈষ্ণব পদাবলী, ভজন, এবং শাস্ত্রীয় নৃত্যের আসর বসে। রাধাকৃষ্ণের অমর প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা উপস্থিত দর্শকদের মন জয় করে নেয়। গানের সুরে এবং নৃত্যের ছন্দে যেন মূর্ত হয়ে ওঠে বৃন্দাবনের আধ্যাত্মিক আবেশ।

পরম পবিত্র এই রাধাষ্টমী উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং শ্রীধাম মায়াপুরের তরফে বিশ্ববাসীর প্রতি এক গভীর বার্তা প্রেরণের দিন। হিংসা ও দ্বেষের পৃথিবীতে প্রেম, নিঃস্বার্থ ভক্তি ও পারস্পরিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার যে মূল মন্ত্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দিয়ে গিয়েছিলেন, রাধাষ্টমীর এই বিশাল আয়োজন যেন তারই এক বাস্তব প্রতিফলন। গভীর রাতে বিশেষ আরতি এবং উদ্দাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় সারাদিনব্যাপী এই মহোৎসব। ভক্তদের চোখেমুখে তখন শুধুই পরম তৃপ্তি আর ভক্তিরসের স্নিগ্ধ আভা।

No Comments

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved