Last updated: September 19th, 2026 at 09:35 pm

নিউজ ডেস্ক: মানুষের পায়ের তলা থেকে যখন হঠাৎ করে আক্ষরিক অর্থেই মাটি সরে যায়, তখন তার সামনে দুটো রাস্তা খোলা থাকে। এক, অন্ধকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বাকি জীবনটা অন্যের করুণার পাত্র হয়ে কাটিয়ে দেওয়া। আর দুই, সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছাইখাঁদ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে উড়ে ওঠা। রানাঘাটের হিজুলির বাসিন্দা সুদীপ দাস দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছেন। শারীরিক ভাবে তাঁর দুটি পা আজ আর নেই, কিন্তু মনের জোর আর ইস্পাতকঠিন ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে তিনি জীবনের যে দৌড় শুরু করেছেন, তা সমাজের হাজার হাজার সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের কাছে এক চরম বিস্ময় এবং বিরাট অনুপ্রেরণা। ভয়কে জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার যে অদম্য জেদ সুদীপ দেখিয়েছেন, তা হার মানাবে যে কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যকেও।
সময়টা ২০২১ সাল। আর পাঁচটা সাধারণ কিশোরের মতোই সুদীপের জীবনও চলছিল নিজস্ব ছন্দে। সে সময় তিনি হিজুলি শিক্ষা নিকেতনের নবম শ্রেণির ছাত্র। খেলাধুলোয় অত্যন্ত উৎসাহী। বিশেষ করে ক্রিকেটের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল টান। কিন্তু এক লহমায় পাল্টে গেল সবকিছু। সে বছর আছড়ে পড়েছিল এক বিধ্বংসী টর্নেডো। একটি বিকেলের ঘটনা। বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ব্যাট-বল নিয়ে মেতে ছিল সুদীপ। আচমকাই আকাশ কালো করে ধেয়ে আসে প্রলয়ংকরী ঝড়। প্রাণ বাঁচাতে একটি আস্তানার নিচে আশ্রয় নিয়েছিল সে। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররোষ থেকে রেহাই মেলেনি। চোখের নিমেষে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে একটি বাড়ির দেওয়াল। সোজা সুদীপের শরীরের ওপর। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় তরতাজা একটি কিশোর।
ঘটনার পর স্থানীয়রা প্রবল আতঙ্কে ছুটে আসেন। রক্তাপ্লুত ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় সুদীপকে উদ্ধার করে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালে। কিন্তু তাঁর শরীরের নিম্নাঙ্গের অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে, চিকিৎসকরা আর ঝুঁকি নিতে চাননি। সেখান থেকে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় কল্যাণী জেএনএম হাসপাতালে এবং পরে কলকাতার এক প্রথম সারির হাসপাতালে। শুরু হয় যমে-মানুষে টানাটানি। টানা কয়েক মাস ধরে চলে চরম স্নায়ুর লড়াই আর একের পর এক অস্ত্রোপচার। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় সুদীপ প্রাণে তো বাঁচল, কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় মূল্যটা তাঁকে চোকাতে হলো। চিরতরে অকেজো হয়ে গেল তাঁর দুটি পা। চিকিৎসকরা জানিয়ে দিলেন, সুদীপ আর কোনও দিন নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে পারবে না। নবম শ্রেণিতে পড়া এক দুরন্ত কিশোরের কাছে এই খবরটা ছিল মৃত্যুদণ্ডের চেয়েও ভয়ংকর।
সুদীপের পারিবারিক অবস্থাও খুব একটা সচ্ছল নয়। বাবা শম্ভু দাস পেশায় একজন সামান্য মাছ ব্যবসায়ী। দিন আনা দিন খাওয়া সংসার। মা মৌমিতা দাস সাধারণ গৃহবধূ। সুদীপের এক দিদিও রয়েছেন, তবে তাঁর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। নিম্নবিত্ত এই পরিবারের একমাত্র ছেলের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে কার্যত আকাশ ভেঙে পড়েছিল বাবা-মায়ের মাথায়। চিকিৎসার বিপুল খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবারটি আর্থিকভাবে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল। এমন অবস্থায় পঙ্গু ছেলেকে নিয়ে অথৈ জলে পড়েছিলেন শম্ভু ও মৌমিতা।
কিন্তু যাঁকে আঘাত করে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছিল নিয়তি, তিনি যে ভেতরে ভেতরে এক অন্য ধাতুতে গড়া। সুদীপ ছোটবেলা থেকেই ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির একনিষ্ঠ ভক্ত। ধোনির ‘ক্যাপ্টেন কুল’ মানসিকতা, চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রেখে ম্যাচ বের করে আনার যে জাদুকরী ক্ষমতা, তা সুদীপের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। নিজের জীবনের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে সুদীপ যেন ধোনির সেই মন্ত্রকেই নিজের পাথেয় করে তুলল। সে ঠিক করল, হুইলচেয়ার বা বিছানায় বন্দি হয়ে সে অন্যের বোঝা হয়ে থাকবে না। মনের জোরকে হাতিয়ার করে সে আবার ঘুরে দাঁড়াবেই।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে তুচ্ছ করে সে কাজ খুঁজতে শুরু করে। প্রথমে কলকাতার একটি জায়গায় কাজ জোগাড়ও করে ফেলে। কিন্তু দুটি পা না থাকার কারণে রানাঘাট থেকে প্রতিদিন ট্রেন ও বাসে ভিড় ঠেলে কলকাতা যাতায়াত করাটা তাঁর জন্য এক অমানবিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লোকাল ট্রেনের ভিড়ে, উঁচু-নিচু প্ল্যাটফর্মে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধীর প্রতিদিনের লড়াইটা যে কতটা মর্মান্তিক, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। কিন্তু এত শারীরিক কষ্ট সহ্য করেও সে হাল ছাড়েনি। অবশেষে নিজের জেদ ও অধ্যাবসায়ের জোরে সুদীপ রানাঘাটেই একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ পেয়ে যায়। গত সাত মাস ধরে সে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সেই কোম্পানিতে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছে।
সুদীপের এই ফিরে আসার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় যে মানুষটির অবদান, তিনি হলেন তাঁর মা মৌমিতা দাস। সুদীপ নিজে স্বীকার করে, তার সমস্ত শক্তির উৎস তার মা। বিপদের দিনে মা যখন ছায়ার মতো তার পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জুগিয়েছেন, তখনই সে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে। এখন সুদীপের চোখে একটাই স্বপ্ন। নিজে রোজগার করে, নিজের পায়ে (মানসিকভাবে) দাঁড়িয়ে বাবা-মায়ের জন্য একটা সুন্দর বাড়ি তৈরি করা। যে ছেলের দু’টো পা নেই, সে আজ নিজের কাঁধে আস্ত একটা পরিবারের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে। সুদীপ প্রমাণ করে দিয়েছে, মানুষ আসলে হাঁটে তার পায়ের জোরে নয়, মানুষ হাঁটে তার মনের জোরে। হিজুলির সুদীপ দাস আজ শুধু রানাঘাটের নয়, গোটা রাজ্যের যুবসমাজের কাছে এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা— হাজারো বিপদ এলেও, জীবনযুদ্ধে হার না মানার এক উজ্জ্বল রূপকথা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments