Homeজেলারাজপথে নামল খুদে ‘সবুজ যোদ্ধা’রা! প্লাস্টিক বর্জনের ডাকে রানাঘাটে পৌরসভার মেগা র‍্যালি

রাজপথে নামল খুদে ‘সবুজ যোদ্ধা’রা! প্লাস্টিক বর্জনের ডাকে রানাঘাটে পৌরসভার মেগা র‍্যালি

নিউজ ডেস্ক: কংক্রিটের জঙ্গল আর যান্ত্রিক সভ্যতার দাপটে যখন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির সবুজ রূপ, চারপাশ ঢাকছে দূষণের কালো চাদরে, ঠিক তখনই এক বুক টাটকা বাতাস নিয়ে শহরের
rghat

নিউজ ডেস্ক: কংক্রিটের জঙ্গল আর যান্ত্রিক সভ্যতার দাপটে যখন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির সবুজ রূপ, চারপাশ ঢাকছে দূষণের কালো চাদরে, ঠিক তখনই এক বুক টাটকা বাতাস নিয়ে শহরের রাজপথে নামল একঝাঁক কচি মুখ। হাতে রংবেরঙের প্ল্যাকার্ড, কণ্ঠে দৃপ্ত স্লোগান— ‘গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান’। শনিবার সকালে নদীয়া জেলার ঐতিহ্যবাহী রানাঘাট শহর সাক্ষী থাকল এমনই এক অভূতপূর্ব, বর্ণাঢ্য ও প্রাণোচ্ছল পরিবেশ সচেতনতামূলক র‍্যালির। রানাঘাট পৌরসভার ঐকান্তিক উদ্যোগে এবং ‘স্বচ্ছতায় ই-সেবা’ প্রকল্পের সুনিপুণ পরিচালনায় এই মেগা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য একটাই— পরিবেশ সুরক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতার অত্যন্ত জরুরি বার্তা সমাজের প্রতিটি স্তরের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। আর সমাজ বদলের এই মহতী কাজে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিল শহরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীরা, যারা আক্ষরিক অর্থেই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

শনিবার সকাল থেকেই রানাঘাট শহরের রাজপথে ছিল এক উৎসব ও সাজসাজ রব। ছুটির দিনের আলস্যকে দূরে সরিয়ে রেখে সকাল সকাল ইউনিফর্ম গায়ে নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হয়েছিল পড়ুয়ারা। তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে দিল, পরিবেশ রক্ষায় বড়দের চেয়ে মানসিকতায় কোনও অংশে পিছিয়ে নেই তারা। নির্দিষ্ট সময় মেনে শুরু হওয়া এই সুদীর্ঘ র‍্যালিটি রানাঘাট শহরের প্রধান প্রধান পথ, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলি পরিক্রমা করে। খুদেদের হাতে ধরা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারে লেখা ছিল প্লাস্টিক বর্জনের কড়া বার্তা। ‘প্লাস্টিক হঠাও, পরিবেশ বাঁচাও’, ‘যত্রতত্র ময়লা ফেলবেন না’, ‘শহরকে সবুজ রাখুন’— এমন নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। পথচলতি সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে যানজটে আটকে থাকা যাত্রীরাও কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে খুদে পড়ুয়াদের এই অভিনব উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান।

বর্তমান সময়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়াবহ সংকট যখন গোটা মানবজাতির অস্তিত্বের সামনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে, তখন স্থানীয় স্তরে এমন সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। রানাঘাট পৌরসভার আধিকারিকরা দীর্ঘদিন ধরেই শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে নানা ধরনের আধুনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছেন। তবে তাঁদের মতে, শুধুমাত্র প্রশাসনিক ফতোয়া বা জরিমানার ভয় দেখিয়ে পরিবেশ বাঁচানো সম্ভব নয়, যদি না সাধারণ মানুষের মধ্যে ভেতর থেকে পরিবেশবোধ তৈরি হয়। আর সেই সচেতনতার বীজ যদি শিশু বয়স থেকেই বপন করা যায়, তবে তার ফল হবে সুদূরপ্রসারী। সেই সুগভীর ভাবনা থেকেই ‘স্বচ্ছতায় ই-সেবা’ প্রকল্পের মাধ্যমে এই দিনটিতে শিশু ও কিশোরদের বেছে নেওয়া হয়েছিল পরিবেশ সচেতনতার প্রধান দূত বা অ্যাম্বাসাডর হিসেবে।

দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষে র‍্যালিটি ফিরে আসে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। তবে সমাজ গড়ার কর্মসূচির এখানেই শেষ ছিল না। র‍্যালি শেষে স্কুল চত্বরে আয়োজন করা হয় এক বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানের। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রানাঘাট পৌরসভার একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি, আধিকারিক এবং বিদ্যালয়ের সম্মানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তাঁদের সকলের উপস্থিতিতে স্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় এক মেগা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং কংক্রিটের শহরে সবুজের আচ্ছাদন আরও বাড়িয়ে তুলতে বেশ কিছু প্রজাতির ছায়াদার ও ফলজ গাছের চারা পরম যত্নে রোপণ করা হয়। মাটির বুকে নতুন প্রাণের সঞ্চার করার এই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। উপস্থিত অতিথিরা পড়ুয়াদের বুঝিয়ে বলেন, একটি গাছ কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে সারা জীবন মানুষকে অক্সিজেন, ছায়া ও ফল দিয়ে মানবজাতিকে রক্ষা করে চলেছে।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্বটি ছিল ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে চারা গাছ তুলে দেওয়া। পৌরসভার মূল লক্ষ্য কেবল এক দিনের জন্য গাছ লাগানো নয়, বরং এই শিশুদের আগামী দিনের প্রকৃত “সবুজ যোদ্ধা” বা ‘গ্রিন ওয়ারিয়র’ হিসেবে গড়ে তোলা। সেই উদ্দেশ্যেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি করে সতেজ চারা গাছ। নিজস্ব একটি গাছ হাতে পেয়ে খুদে পড়ুয়াদের চোখেমুখে যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা দেখা গিয়েছে, তা ছিল সত্যিই দেখার মতো। উপস্থিত সকলের সামনে তারা দৃঢ়কণ্ঠে প্রতিজ্ঞা করে, কেবল গাছ নিয়ে বাড়ি ফেরাই নয়, প্রতিদিন নিয়ম করে জল দিয়ে, সঠিক পরিচর্যা করে নিজেদের সন্তানের মতো এই চারাগাছগুলিকে তারা মহীরুহ হিসেবে বড় করে তুলবে। শিশুদের এই শপথ বাক্য যেন এক সবুজতর আগামীর উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেল।

এই বিশাল কর্মসূচির শেষে রানাঘাট পৌরসভার পদস্থ কর্মকর্তারা জানান, শহরকে বাসযোগ্য করে তুলতে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ রেখে যেতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। প্রশাসনের একার পক্ষে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পূর্ণ করা কখনওই সম্ভব নয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে, বিশেষ করে যুবসমাজ ও ছাত্রছাত্রীদের এই পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে শামিল করতেই ‘স্বচ্ছতায় ই-সেবা’ প্রকল্পের এমন উদ্ভাবনী রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। আগামী দিনেও রানাঘাট শহরকে জঞ্জালমুক্ত, প্লাস্টিকবিহীন এবং সবুজে মোড়া এক আদর্শ শহর হিসেবে গড়ে তুলতে পৌরসভার পক্ষ থেকে এই ধরনের বহুমুখী সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে জারি থাকবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

No Comments

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved