Last updated: September 18th, 2026 at 11:13 pm

নিউজ ডেস্ক: কারখানার ভোঁপু, যন্ত্রপাতির ঝনঝনানি আর আকাশে উড়তে থাকা রংবেরঙের ঘুড়ির ভিড়ে যখন গোটা বাংলা মেতে উঠেছে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনায়, তখন একরাশ বিষাদ আর শ্মশানের নীরবতা গ্রাস করেছে শান্তিপুরের বিএসএনএল (BSNL) অফিস চত্বরকে। প্রতি বছর এই বিশেষ দিনটিতে যন্ত্রের দেবতার চরণে নিবেদন করা হতো একটাই করুণ প্রার্থনা— ‘মৃতপ্রায় রাষ্ট্রায়ত্ত এই টেলিকম সংস্থা যেন আবার ঘুরে দাঁড়ায়, পুরনো গৌরব ফিরে পায়।’ কিন্তু কালের নিয়মে আর চরম প্রশাসনিক বঞ্চনায় সেই প্রার্থনা জানানোর জায়গাটুকুও আজ শেষ। দীর্ঘ প্রায় ২৭-২৮ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যে ইতি টেনে এ বছর শান্তিপুরের বিএসএনএল অফিসে আর অনুষ্ঠিত হলো না বিশ্বকর্মা পুজো। উৎসবের আনন্দের বদলে কর্মী-আধিকারিকদের শূন্যতায় গোটা প্রাঙ্গণ জুড়ে এখন কেবলই হাহাকার। ডবল ইঞ্জিনের সরকারের আমলে যেখানে রুগ্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার পুনরুজ্জীবনের বড় বড় স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, সেখানে মাঠপর্যায়ে পুজোর সামান্য আয়োজনটুকুও টিকিয়ে রাখতে না পারার আক্ষেপ আর যন্ত্রণা কুরে কুরে খাচ্ছে কর্মরত ক্যাজুয়াল বা অস্থায়ী কর্মীদের।
স্থানীয় ও কর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শান্তিপুরের এই বিএসএনএল অফিসে বিশ্বকর্মা পুজোর সূচনা হয়েছিল সেই ১৯৯৭ সালে। তখন সংস্থার রমরমা বাজার। ঘরে ঘরে ল্যান্ডলাইন ফোনের কদর, পাড়ায় পাড়ায় এসটিডি বুথের লম্বা লাইন। সেই স্বর্ণযুগে অত্যন্ত নিষ্ঠা, জাঁকজমক ও উৎসবের মেজাজে পালিত হতো এই পুজো। স্থায়ী কর্মী, ক্যাজুয়াল কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে পুজোর দিনটি পরিণত হতো এক মহামিলনমেলায়। এলাহি খাওয়াদাওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর আড্ডায় মেতে উঠতেন সকলে। এমনকি যাঁরা অবসর গ্রহণ করে চলে যেতেন, তাঁরাও এই দিনটির টানে অফিসে ছুটে আসতেন পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আনন্দঘন ছবিটা ফিকে হতে শুরু করে। কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। একের পর এক স্থায়ী কর্মী অবসর নিতে শুরু করেন। জানা গিয়েছে, ২০২২ সালের মধ্যেই এই অফিসের শেষ স্থায়ী কর্মীরা অবসর গ্রহণ করেন। এরপর থেকে শান্তিপুর সাব-ডিভিশনের এই বিশাল পরিকাঠামো এবং পরিষেবা টিকিয়ে রাখার গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে হাতেগোনা মাত্র কয়েক জন ক্যাজুয়াল কর্মীর কাঁধে।
এ বছর পুজোর প্রস্তুতি কেন থমকে গেল? এর নেপথ্যে রয়েছে চরম আর্থিক অনটন এবং লোকবলের অভাব। বিগত বছরগুলিতে মূল উদ্যোক্তা হিসেবে যাঁরা সামনের সারিতে থাকতেন, সেই অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের অনেকেই এখন বার্ধক্যজনিত কারণে শয্যাশায়ী বা শারীরিকভাবে অসুস্থ। শেষ মুহূর্তে পুজোর বিশাল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার মতো কোনও মানুষই আর অবশিষ্ট নেই। তার চেয়েও বড় কথা, পুজো করতে যে বিপুল খরচের প্রয়োজন, তা বহন করা এই নামমাত্র বেতনে কর্মরত ক্যাজুয়াল কর্মীদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। মাসের শেষে নিজেদের সংসার চালাতেই যাঁদের কালঘাম ছুটে যায়, যাঁরা নিজেদের চাকরি বেঁচে থাকা নিয়ে প্রতি মুহূর্তে চরম অনিশ্চয়তায় ভোগেন, তাঁরা কীভাবে চাঁদা তুলে এত বড় পুজোর আয়োজন করবেন? সামগ্রিক এই সমন্বয়হীনতা এবং আর্থিক অনটনের জোড়া ফলায় শেষ পর্যন্ত বন্ধই করে দিতে হলো তিন দশকের কাছাকাছি সময় ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের এই উৎসবকে।
পুজোর আয়োজনের মতোই রুগ্ণ দশা এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার পরিষেবার এবং অফিস ভবনের। কর্মীরা অত্যন্ত হতাশার সুরে জানাচ্ছেন, যে ভবনে বসে তাঁরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন, তার অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক। দীর্ঘদিন ধরে কোনও রকম মেরামতি বা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের দেওয়াল জীর্ণ, ছাদ থেকে মাঝেমধ্যেই খসে পড়ছে পলেস্তারা ও চাঙড়। বর্ষার মরসুমে সামান্য বৃষ্টি হলেই ভগ্নপ্রায় ছাদ চুঁইয়ে ঘরের ভেতরে জল পড়ে, যার ফলে মূল্যবান সরকারি নথিপত্র এবং সার্ভারের যন্ত্রপাতির প্রবল ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে সবসময়। এক সময়ের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ল্যান্ডফোন পরিষেবা আজ ইতিহাস, তা বহু আগেই কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে শান্তিপুর, দিগনগর ও গোবিন্দপুর— এই বিস্তীর্ণ গ্রামীণ ও শহরতলি এলাকা মিলিয়ে কেবল অপটিক্যাল ফাইবার কেবল (OFC) লাইন এবং কয়েকটি মোবাইল টাওয়ার নজরদারির সামান্য ও সীমিত কাজকর্মেই নিযুক্ত রয়েছেন ওই গুটিকয়েক ক্যাজুয়াল কর্মীরা। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে গ্রাহক পরিষেবাও তলানিতে এসে ঠেকেছে।
পরিস্থিতি এমন এক তলানিতে এসে ঠেকেছে যে, কর্মীদের ক্ষোভ এখন চরমে। তাঁদের অভিযোগ, মুখে কেন্দ্রীয় প্যাকেজ, পুনরুজ্জীবনের ব্লুপ্রিন্ট এবং ‘আচ্ছে দিন’-এর নানা গালভরা আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনও প্রতিফলন নেই। পে-কমিশনের ন্যয্য সুবিধা থেকে বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত হয়ে আসছেন কর্মীরা। অন্যদিকে, সরকারি নীতি নিয়ে তাঁদের সরাসরি অভিযোগ, সুকৌশলে দেশের একসময়ের এক নম্বর রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম সংস্থাকে পঙ্গু করে দিয়ে বেসরকারি পুঁজিপতি ও টেলিকম সংস্থাগুলিকে একচেটিয়া ব্যবসার সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফোর-জি (4G) বা ফাইভ-জি (5G) পরিষেবা চালুর ক্ষেত্রে বারবার অদৃশ্য কারণে পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে সংস্থাকে। আর সেই নীতির বলি হতে হচ্ছে হাজার হাজার সাধারণ কর্মীকে। সংস্থাটি আজ ধ্বংসের একেবারে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে।
দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একসময়ের জমজমাট এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের সংশয় আরও তীব্র হয়েছে। যে সংস্থা একসময় ছিল গোটা দেশের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ভরসা, আজ তার নিজেরই যোগাযোগের তার ছিঁড়ে গিয়েছে। ক্যাজুয়াল কর্মীদের মনে একটাই আক্ষেপ— দেবতার কাছে নিজেদের অসহায়তার কথা জানানোর সেই মঞ্চটুকুও আজ তাঁদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল নিষ্ঠুর সময় আর চরম অবহেলা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments