
নিউজ ডেস্ক; পুজোর ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? অনলাইনে হোটেল বা রিসর্ট বুক করার আগে এ বার ‘এআই’-এর সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে পুলিশ। শুনতে কিছুটা অদ্ভুত লাগলেও সাইবার প্রতারণার বাড়বাড়ন্তের মধ্যে এমনই পরামর্শ পুলিশের। কারণ, ইন্টারনেটে আকর্ষণীয় ছবি, কম দামের প্যাকেজ এবং ভুয়ো ফোন নম্বর দিয়ে পর্যটকদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ ক্রমেই সামনে আসছে। বুকিংয়ের সময় অগ্রিম টাকা দেওয়ার পর গন্তব্যে পৌঁছে অনেকেই জানতে পারছেন, যে হোটেলের জন্য টাকা দিয়েছিলেন, বাস্তবে সেই নামে কোনও হোটেলই নেই!
সাইবার প্রতারণা ঠেকাতে সাধারণ মানুষকে অপরিচিত লিঙ্কে ক্লিক না করা, অজানা নম্বরে ব্যক্তিগত তথ্য না দেওয়া কিংবা যাচাই না করে অনলাইনে টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকতে বারবার সতর্ক করছে পুলিশ। অথচ সেই পুলিশই এ বার নির্দিষ্ট একটি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—পুজোর মরসুমে বেড়াতে গিয়ে যেন পর্যটকদের অনলাইন বুকিংয়ের নামে সর্বস্বান্ত হতে না হয়।
পুজোর ছুটি সামনে আসতেই বহু মানুষ পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। কেউ পাহাড়ে, কেউ সমুদ্রের ধারে, আবার কেউ দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ট্র্যাভেল এজেন্টদের প্যাকেজ অনেক সময় তুলনামূলক ভাবে বেশি হওয়ায় বহু পর্যটক নিজেরাই ইন্টারনেটে হোটেল, রিসর্ট এবং গাড়ি বুক করার চেষ্টা করেন। আর এই জায়গাতেই সুযোগ নিচ্ছে প্রতারকেরা।
অনলাইনে হোটেল খুঁজতে গিয়ে পর্যটকদের সামনে চলে আসছে একাধিক ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়া পেজ। ঝকঝকে ঘর, সুইমিং পুল, পাহাড় বা সমুদ্রের অসাধারণ দৃশ্য—নানা ছবি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতার আবহ। তার সঙ্গে দেওয়া থাকছে ফোন নম্বর এবং বুকিংয়ের জন্য বিশেষ ছাড়ের প্রলোভন। কম দামে ভালো ঘর পাওয়ার আশায় অনেকেই ফোন করে বুকিং নিশ্চিত করছেন।
এর পরেই আসছে অগ্রিম টাকা পাঠানোর পালা। অনেক হোটেলেই বুকিং নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা অগ্রিম দিতে হয়। বাকি টাকা গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ থাকে। প্রতারকদের তৈরি করা ভুয়ো হোটেল সাইটেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে পুলিশের দাবি। পর্যটক টাকা পাঠানোর পরই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পরে গন্তব্যে পৌঁছে বোঝা যাচ্ছে, পুরো বুকিংটাই ছিল ভুয়ো।
পুলিশের কাছে এমন ঘটনার নজির আগেও এসেছে। বেড়াতে যাওয়ার কয়েক দিন আগে অনলাইনে হোটেল বুক করে অগ্রিম টাকা দেওয়ার পর পর্যটকেরা যখন সংশ্লিষ্ট শহরে পৌঁছেছেন, তখন তাঁরা জানতে পেরেছেন ওই নামে কোনও হোটেল বা রিসর্টই নেই। ফলে শেষ মুহূর্তে থাকার জায়গা খুঁজতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। বাধ্য হয়ে চড়া দামে অন্য হোটেল বুক করতে হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি আরও বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই পুলিশের পরামর্শ, শুধু অনলাইনে ছবি দেখে কিংবা ফোনে কথা বলে কোনও হোটেলকে বিশ্বাস করা উচিত নয়। কোনও সাইটে আকর্ষণীয় ছবি বা অফার চোখে পড়লে প্রথমেই সেটির সত্যতা যাচাই করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের লিঙ্ক, ফোন নম্বর এবং হোটেলের ছবি এআই প্ল্যাটফর্মে দিয়ে প্রাথমিক ভাবে সেটি ভুয়ো কি না, সে বিষয়ে তথ্য নেওয়া যেতে পারে।
পুলিশের বক্তব্য, কোনও ওয়েবসাইট বা ছবির মধ্যে অসঙ্গতি, সন্দেহজনক তথ্য কিংবা ভুয়ো পরিচয়ের লক্ষণ থাকলে এআই-ভিত্তিক পরিষেবা তা শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু এআইয়ের উত্তরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে নিজেদের তরফেও অতিরিক্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
পুলিশের পরামর্শ অনুযায়ী, যে শহরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, সেখানে অন্য হোটেল বা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ফোন করেও যাচাই করা যেতে পারে সংশ্লিষ্ট নামে সত্যিই কোনও হোটেল বা রিসর্ট রয়েছে কি না। প্রয়োজনে গুগল ম্যাপ বা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য অনলাইন পরিষেবাতেও ঠিকানা মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। একই নামের কোনও হোটেল থাকলেও সেটি যে অনলাইনে দেওয়া নম্বর বা ওয়েবসাইটটির সঙ্গে যুক্ত, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ—সম্ভব হলে সরাসরি হোটেলের সঙ্গে কথা বলে বুকিংয়ের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর স্পটে গিয়ে বুকিং করা নিরাপদ। বিশেষ করে কোনও অচেনা ওয়েবসাইট যদি বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে ঘর দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, তা হলে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
সল্টলেকের বাসিন্দা সুতপা মৌলিক এ বার পরিবারের সঙ্গে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর কথাতেও উঠে এসেছে অনলাইন বুকিং নিয়ে সংশয়ের বিষয়টি। তিনি জানিয়েছেন, সরাসরি হোটেল বুক করা হবে, না কি ট্র্যাভেল এজেন্টের মাধ্যমে গোটা ব্যবস্থা করা হবে—তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কলকাতার এক এজেন্টের মাধ্যমে হোটেল এবং ঘোরার জন্য গাড়ি বুক করেছেন তাঁরা। কোনও সমস্যা হলে এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে, সেটিকেই তুলনামূলক নিরাপদ বলে মনে হয়েছে তাঁদের।
পুলিশের একাংশের অভিজ্ঞতা বলছে, ছোটখাটো অনলাইন প্রতারণার ঘটনা ঘটলেও বহু ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন না ভুক্তভোগীরা। কেউ অল্প টাকা হারিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান, আবার কেউ অভিযোগ জানাতে গিয়ে সময় নষ্ট করতে চান না। ফলে রাজ্যজুড়ে এমন ঘটনা ঘটলেও তার প্রকৃত সংখ্যা কত, তা নির্দিষ্ট ভাবে বলা কঠিন।
কলকাতা পুলিশের এক প্রাক্তন কর্তার অভিজ্ঞতাও বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে। কিছু দিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় খদ্দরের একটি ফুলহাতা জামার বিজ্ঞাপন তাঁর চোখে পড়ে। দাম দেখানো হয়েছিল মাত্র ২৯০ টাকা। পুজোর আগে ছাড়ের বিজ্ঞাপন দেখে জামাটি তাঁর পছন্দও হয়। কিন্তু অর্ডার করার আগে এক বার ওয়েবসাইটটি যাচাই করে নেওয়ার কথা মনে হয় তাঁর।
এর পর ওয়েবসাইটের লিঙ্ক এবং সংশ্লিষ্ট ছবি এআই প্ল্যাটফর্মে দিয়ে যাচাই করার চেষ্টা করেন তিনি। সেখানেই সন্দেহ আরও জোরালো হয়। প্রাথমিক যাচাইয়ে দেখা যায়, সাইটটি বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং দেওয়া ফোন নম্বরটিরও অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে অর্ডার না করেই প্রতারণার সম্ভাবনা থেকে বেঁচে যান তিনি।
পুলিশের মতে, এই ধরনের সতর্কতা শুধু পুজোর আগে কয়েক দিন প্রচার করলেই হবে না। উৎসবের আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় সচেতনতামূলক বার্তা দেওয়া হলেও বছরের বাকি সময়ে সেই প্রচার অনেকটাই কমে যায়। ফলে কিছু দিন পর মানুষ সতর্কতার কথা ভুলে গিয়ে ফের পুরনো অভ্যাসে ফিরে যান। আর সেই সুযোগেই প্রতারকেরা নতুন নতুন কৌশলে জাল বিছিয়ে বসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই কোনও জাদুকাঠি নয়। কোনও লিঙ্ক বা ছবি আসল না ভুয়ো, তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এটি একটি সহায়ক মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেনের আগে একাধিক স্বাধীন সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
পুজোর ছুটিতে ভ্রমণের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। ট্রেন, বিমান, হোটেল—সব কিছুর বুকিং নিয়েই ব্যস্ত পর্যটকেরা। সেই সুযোগে সাইবার প্রতারকেরাও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তাই পুলিশের বার্তা স্পষ্ট—অনলাইনে পাওয়া কোনও অফার দেখে তাড়াহুড়ো করে টাকা পাঠাবেন না। হোটেলের ছবি সুন্দর হলেই সেটি আসল ধরে নেবেন না। ফোন নম্বর, ওয়েবসাইট, ঠিকানা এবং হোটেলের অস্তিত্ব যাচাই করুন। প্রয়োজনে এআইয়ের সাহায্য নিন, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে নিজেরাও নিশ্চিত হয়ে নিন।
কারণ, কয়েক মিনিটের সতর্কতা যেমন একটি বুকিং বাঁচাতে পারে, তেমনই অসতর্ক হয়ে একটি ভুল লিঙ্কে টাকা পাঠালে পুজোর আনন্দের বদলে শুরু হতে পারে প্রতারণার যন্ত্রণা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments