
নিউজ ডেস্ক; ঘরের জানলা দিয়ে ঢুকে একসঙ্গে ছ’টি মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, সোনার বালা এবং জামাকাপড় নিয়ে চম্পট দিয়েছিল চোর। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরনোর আগে মোবাইলগুলির সিমকার্ড খুলে ফেলেছিল সে। সেই সিমকার্ডগুলিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল পুলিশের কাছে খবর পৌঁছনোর মাধ্যম! সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির উঠোন ও আশপাশে পড়ে থাকা সিমকার্ড কুড়িয়ে নিয়ে অন্য একটি মোবাইলে সেগুলি ভরে থানায় খবর দিলেন গৃহকর্তা।
রবিবার সকালে এই অদ্ভুত চুরির ঘটনা সামনে এসেছে ময়নাগুড়ি পুরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে। ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পরিবারের দাবি, বাড়ির সদস্যেরা ঘুমিয়ে থাকার সুযোগেই জানলা দিয়ে ঢুকে পড়েছিল চোর। অথচ চুরি হওয়ার সময় কোনও শব্দ বা সন্দেহজনক নড়াচড়া তাঁদের কানে পৌঁছয়নি। ফলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগে পর্যন্ত বাড়ির কেউ টেরই পাননি যে তাঁদের ঘরে চুরি হয়ে গিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার এলাকায় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। সেই অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগ দিতে গিয়েছিলেন বাড়ির কর্তা জয়ন্ত বিশ্বাস। অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফিরতে রাত প্রায় আড়াইটে হয়ে যায়। রাত অনেকটা হয়ে যাওয়ায় পরিবারের সকলে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন।
তখন গরমও ছিল যথেষ্ট। সেই কারণে ঘরের একটি জানলা খোলা রেখেই ঘুমিয়েছিলেন তাঁরা। পরে জানা যায়, ওই জানলায় কোনও লোহার রড বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ওই খোলা জানলাটিই চোরের প্রবেশের পথ হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যেরা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই কোনও এক সময়ে জানলা দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ে চোর। ঘরের মধ্যে থাকা একাধিক জিনিসপত্র তছনছ করে সে। এরপর ছ’টি মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, একটি সোনার বালা এবং বেশ কিছু জামাকাপড় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এত বড় চুরি হয়ে গেলেও ঘুমন্ত পরিবারের কেউ তা টের পাননি। জয়ন্ত বিশ্বাসের দাবি, তাঁরা এমন গভীর ঘুমে ছিলেন যে বাড়িতে কেউ ঢুকেছে বা জিনিসপত্র সরানো হচ্ছে, তার সামান্যতম আঁচও পাননি।
সকালে আরও একটি সমস্যার কারণে তাঁদের ঘুম ভাঙতেও দেরি হয়। প্রতিদিন তাড়াতাড়ি ওঠার জন্য মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রাখেন পরিবারের সদস্যেরা। কিন্তু চোর সব ক’টি মোবাইল নিয়ে চলে যাওয়ায় সেই অ্যালার্মও আর বাজেনি। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশ কিছুটা দেরিতে ঘুম ভাঙে জয়ন্তদের।
ঘুম থেকে উঠে ঘরের অবস্থা দেখে প্রথমে তাঁরা হতভম্ব হয়ে যান। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। আলমারি ও অন্যান্য জায়গাতেও হাত পড়েছে বলে বুঝতে পারেন তাঁরা। খোঁজাখুঁজি শুরু করতেই দেখা যায়, বাড়ির একাধিক মোবাইল ফোন নেই। পাশাপাশি নগদ টাকা, সোনার বালা এবং জামাকাপড়ও উধাও।
এর পরেই নজরে আসে আরও একটি অদ্ভুত বিষয়। ঘরের মেঝেতে পড়ে রয়েছে একটি সিমকার্ড। প্রথমে বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি তাঁরা। পরে বাড়ির উঠোনে গিয়ে আরও একটি সিমকার্ড পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাড়ির বাইরে তাকিয়ে আরও কয়েকটি সিমকার্ডের হদিস মেলে।
পরিবারের অনুমান, চোর মোবাইলগুলির সিমকার্ড খুলে আলাদা করে ফেলে দিয়েছিল। সম্ভবত চুরি করা ফোনগুলির মাধ্যমে নিজের পরিচয় বা অবস্থান সম্পর্কে কোনও সূত্র যাতে না পাওয়া যায়, সেই কারণেই সিমগুলি খুলে নেওয়া হয়েছিল। যদিও কেন সেগুলি বাড়ির উঠোন এবং আশপাশেই ফেলে যাওয়া হল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে চোরের ফেলে যাওয়া সেই সিমকার্ডই শেষ পর্যন্ত বিপদের সময়ে পরিবারের কাজে আসে। বাড়ির সব মোবাইল চুরি হয়ে যাওয়ায় সরাসরি ফোন করার মতো কোনও যন্ত্র তাঁদের হাতে ছিল না। তখন পড়ে থাকা সিমকার্ডগুলির মধ্যে একটি কুড়িয়ে নেন তাঁরা। এরপর কোনও ভাবে একটি মোবাইল ফোনের ব্যবস্থা করে সেই সিমকার্ড তাতে লাগানো হয়।
সেই ফোন থেকেই ময়নাগুড়ি থানায় খবর দেন জয়ন্তরা। খবর পেয়ে পুলিশ ওই বাড়িতে পৌঁছয়। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে চুরির পদ্ধতি এবং চোরের প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য পথ খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে।
পুলিশের তদন্তে এখন বেশ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। খোলা জানলা দিয়ে কী ভাবে বাড়িতে ঢুকল চোর? পরিবারের কেউ কেন কোনও শব্দ শুনতে পেলেন না? চুরি করা ছ’টি মোবাইল নিয়ে যাওয়ার আগে সেগুলির সব ক’টির সিমকার্ড কেন খুলে ফেলা হল? আর সেই সিমকার্ডগুলিই বা বাড়ির ঘর, উঠোন এবং বাইরের অংশে কী ভাবে ছড়িয়ে পড়ল—এই সব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
জয়ন্ত বিশ্বাস পেশায় একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী। তাঁর কথায়, পরিবারের প্রায় সকলের মোবাইলই চুরি হয়ে যাওয়ায় দৈনন্দিন যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে জরুরি সময়ে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। শেষ পর্যন্ত চোরের ফেলে যাওয়া সিমকার্ড দিয়েই থানায় খবর দিতে হয়েছে তাঁদের।
ঘটনার পর এলাকায় নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাড়ির জানলায় কোনও গ্রিল বা রড না থাকায় সেটি চোরের কাছে সহজ প্রবেশপথ হয়ে উঠেছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, রাতের দিকে বাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
অন্য দিকে, চুরির ঘটনায় কোনও পরিচিত ব্যক্তি জড়িত কি না, নাকি বাইরে থেকে আসা কোনও চোর এই কাণ্ড ঘটিয়েছে, তা এখনও জানা যায়নি। বাড়ির আশপাশে কোনও সন্দেহজনক গতিবিধি হয়েছিল কি না, সেই তথ্যও সংগ্রহ করছে পুলিশ। চুরি যাওয়া মোবাইল ফোনগুলির অবস্থান শনাক্ত করা যায় কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এক রাতের চুরিতে সর্বস্বান্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সামনে এখন নতুন করে মোবাইল ও প্রয়োজনীয় নথি সংক্রান্ত সমস্যাও তৈরি হয়েছে। তবে আপাতত তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় বিস্ময়—যে চোর এত নিঃশব্দে ছ’টি মোবাইল-সহ একাধিক জিনিস নিয়ে পালাল, সেই চোরই আবার সমস্ত সিমকার্ড খুলে বাড়ির আশপাশে ফেলে গেল কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্ত শুরু করেছে ময়নাগুড়ি থানার পুলিশ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments