Homeঅন্যান্যবাংলা সাহিত্যের তালিকায় ব্রাত্য, তবু ১৪০ বছর ধরে জনপ্রিয়! কাশীপুরের ‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’-এর অজানা ইতিহাস

বাংলা সাহিত্যের তালিকায় ব্রাত্য, তবু ১৪০ বছর ধরে জনপ্রিয়! কাশীপুরের ‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’-এর অজানা ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক; বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যের ইতিহাসে বহু পরিচিত নাম রয়েছে। মনসামঙ্গলও সেই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা। কিন্তু সেই দীর্ঘ তালিকার বাইরে, রাঢ় বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি
resizeplus_Screenshot 2026-09-14 130814_edited

নিউজ ডেস্ক; বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যের ইতিহাসে বহু পরিচিত নাম রয়েছে। মনসামঙ্গলও সেই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা। কিন্তু সেই দীর্ঘ তালিকার বাইরে, রাঢ় বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মঙ্গলকাব্য আজও টিকে রয়েছে প্রায় দেড়শো বছরের কাছাকাছি সময় ধরে। অবিভক্ত মানভূমের কাশীপুরে রচিত ‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’ এখনও গবেষকদের আগ্রহের বিষয়। অথচ বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত মনসামঙ্গল কাব্যের তালিকায় তার রচয়িতা চৈতন্যদাস মণ্ডলের নামই নেই।

গবেষকদের দাবি, আঠারো শতক নয়, কাব্যের নিজস্ব কালজ্ঞাপক শ্লোক বিশ্লেষণ করলে এর রচনাকাল খ্রিস্টীয় ১৮৭৯ সাল বলে উঠে আসে। সেই সময় পঞ্চকোট রাজত্বে মহারাজা নীলমণি সিংদেওয়ের সময়কাল। আর সেই সময়েই বনকাটি গ্রামের বাসিন্দা চৈতন্যদাস মণ্ডল দেবী মনসার প্রতি ভক্তি থেকে রচনা করেছিলেন এই দীর্ঘ কাব্য।

‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’-এর রচয়িতা হিসেবে পুঁথিতে নিজের পরিচয়ও দিয়েছেন চৈতন্যদাস। তাঁর ঠিকানা ছিল বনকাটি গ্রাম, তৎকালীন গৌরাঙ্গডি থানা। বর্তমান প্রশাসনিক মানচিত্রে জায়গাটি কাশীপুর এলাকার অন্তর্গত। বনকাটি গ্রাম আবার আদ্রা-মেদিনীপুর রেলপথের সিরজাম রেলস্টেশনের কাছেই। অর্থাৎ রাঢ় বাংলার সেই প্রত্যন্ত জনপদেই বসে সৃষ্টি হয়েছিল এই বিস্তৃত মঙ্গলকাব্য।

কাব্যটি মূলত পয়ার ছন্দে লেখা। তবে কয়েকটি অধ্যায়ে লঘু ত্রিপদী এবং দীর্ঘ ত্রিপদী ছন্দেরও ব্যবহার রয়েছে। ভাষার মধ্যে রয়েছে গ্রামবাংলার সহজ-সরল প্রকাশভঙ্গি। সেই কারণেই সম্ভবত জঙ্গলমহল এবং বৃহত্তর রাঢ় বঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে কাব্যটি দীর্ঘদিন ধরে আপন হয়ে থেকেছে।

গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চৈতন্যদাস ছিলেন দেবী মনসার একনিষ্ঠ ভক্ত। প্রতিদিন সকালে স্নান সেরে বাড়ির পাশের সরস্বতী মন্দিরে বসতেন তিনি। সেখানেই নিজের কাব্য রচনার কাজ করতেন। তাঁর লেখার মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি তৎকালীন গ্রামীণ সমাজ ও লোকজ সংস্কৃতির নানা উপাদানের প্রতিফলন পাওয়া যায় বলেও মনে করেন গবেষকেরা।

তবে এই কাব্যের রচনাকাল নিয়েই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য। জেলার বিশিষ্ট পুঁথি গবেষক প্রবীর সরকার জানিয়েছেন, চৈতন্যদাস নিজেই তাঁর কাব্যের শেষে একটি কালজ্ঞাপক শ্লোক রেখে গিয়েছেন। সেই শ্লোকের সাংকেতিক সংখ্যাগুলি বিশ্লেষণ করেই রচনাকাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।

শ্লোকে বলা হয়েছে—

“জনরব শাস্ত্র আদি অন্বেষণ করে
রচিল চৈতন্যদাস মনসার বরে।
দিক পৃষ্ঠে বসু ইন্দু শক নিরূপণ
কোষ পৃষ্ঠে বারমাস সালের গণন।
মিথুন রাশির মাসে তৃতীয় দিনেতে
আদিত্য তনয় বারে সপ্তমী তিথিতে।
সমাপ্ত হৈল গ্রন্থ তৃতীয় প্রহরে।”

এই শ্লোকের মধ্যেই কাব্য রচনার সময় সম্পর্কে সাংকেতিক ইঙ্গিত রয়েছে বলে গবেষকদের ব্যাখ্যা। প্রবীর সরকারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘দিক’ বলতে ১০, ‘বসু’ বলতে ৮ এবং ‘ইন্দু’ বলতে ১ বোঝানো হয়েছে। ফলে পাওয়া যায় ১০৮১। ‘অঙ্কস্য বামাগতি’র নিয়মে সেই সংখ্যাকে উল্টো করলে দাঁড়ায় ১৮০১ শকাব্দ। শকাব্দের সঙ্গে ৭৮ যোগ করলে পাওয়া যায় খ্রিস্টাব্দ। সেই হিসাবেই কাব্যের রচনাকাল ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দ।

অর্থাৎ এই কাব্য কোনও সাম্প্রতিক লোকসাহিত্য নয়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মানভূমের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশে বসেই চৈতন্যদাস তাঁর এই দীর্ঘ সৃষ্টি সম্পূর্ণ করেছিলেন।

চৈতন্যদাসের সময় পঞ্চকোট রাজত্বে রাজা ছিলেন মহারাজা নীলমণি সিংদেও। ইতিহাসের পাতাতেও তাঁর নাম গুরুত্বপূর্ণ। সিপাহি বিদ্রোহের সময় পুরুলিয়া ট্রেজারি লুঠ, নীলকুঠি পোড়ানো এবং জেল ভেঙে বন্দিদের মুক্ত করার পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে বলে ইতিহাসচর্চায় উল্লেখ পাওয়া যায়। নীলমণি সিংদেওয়ের দীর্ঘ রাজত্বকালেই চৈতন্যদাসের ‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’ রচিত হয়েছিল।

এই কাব্যের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর পাণ্ডুলিপি ও মুদ্রিত সংস্করণের ইতিহাস। পুরুলিয়া শহরের বাসিন্দা স্বরূপ দত্ত জানিয়েছেন, ২১১ পৃষ্ঠার অখণ্ড ‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’ প্রকাশ করেছিলেন তাঁদের পূর্বপুরুষ দোলগোবিন্দ দত্ত। তাঁর দাবি, বনকাটি গ্রামে গিয়ে তাঁরা জানতে পেরেছেন, চৈতন্যদাসের ছেলে অর্থের বিনিময়ে কাব্যের মূল পাণ্ডুলিপিটি দোলগোবিন্দের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

দোলগোবিন্দ দত্ত শুধু বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তৎকালীন মানভূমে প্রকাশনার কাজেও তাঁর ভূমিকা ছিল। তাঁর উদ্যোগেই পুঁথির লেখা মুদ্রিত বইয়ের রূপ পায়। এরপর বছরের পর বছর ধরে বইটির পুনর্মুদ্রণ হয়েছে। প্রায় ১৪০ বছর ধরে কোনও একটি আঞ্চলিক মঙ্গলকাব্যের পুনর্মুদ্রণ চলা তার জনপ্রিয়তারই প্রমাণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবু বিস্ময়ের বিষয়, বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যের প্রচলিত তালিকায় ‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’-এর উল্লেখ নেই। দুই বাংলায় এখনও পর্যন্ত ৭৮ জন মনসামঙ্গল রচয়িতার নাম জানা যায় বলে গবেষকদের একাংশের দাবি। কিন্তু সেই তালিকায় চৈতন্যদাস মণ্ডল অনুপস্থিত।

এই অনুপস্থিতিই সম্ভবত ‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’-কে ঘিরে গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কেন এত দীর্ঘ ও দীর্ঘকাল জনপ্রিয় একটি কাব্য মূলধারার সাহিত্য-ইতিহাসে জায়গা পেল না? আঞ্চলিক সাহিত্য বলে কি তার পরিচিতি সীমাবদ্ধ থেকে গেল? নাকি পুঁথিটির পর্যাপ্ত গবেষণা ও সংরক্ষণ না হওয়ার কারণে চৈতন্যদাসের নাম বৃহত্তর সাহিত্যচর্চায় পৌঁছতে পারেনি? গবেষকদের কাছে এখন সেই প্রশ্নগুলিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে মূলধারার তালিকায় নাম না থাকলেও স্থানীয় মানুষের কাছে কাব্যটির গুরুত্ব কমেনি। জঙ্গলমহল ও রাঢ় বাংলার লোকজ সংস্কৃতির ধারায় এটি এখনও একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি। লোকভাষা, ধর্মীয় বিশ্বাস, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং তৎকালীন সমাজজীবনের নানা উপাদান মিলিয়ে ‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’ আঞ্চলিক ইতিহাসেরও একটি মূল্যবান দলিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

এই গুরুত্বের কথা মাথায় রেখেই পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ তাদের পাঠ্যক্রমে এই মঙ্গলকাব্যের কয়েকটি পালা অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে যে চৈতন্যদাস দীর্ঘদিন বাংলা সাহিত্যের মূল তালিকায় ব্রাত্য ছিলেন, তাঁর রচনার অংশ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে জায়গা পেয়েছে।

একদিকে সাহিত্যের প্রচলিত ইতিহাসে অনুপস্থিতি, অন্য দিকে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাশীপুরের ‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’। প্রায় ১৪০ বছর ধরে পুনর্মুদ্রিত হওয়া সেই কাব্যই যেন মনে করিয়ে দেয়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস শুধু বিখ্যাত কবি ও বহুলপঠিত গ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামবাংলার কোনও এক মন্দিরের পাশে বসে লেখা পুঁথিও সময় পেরিয়ে এক দিন গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে।

বনকাটির সেই কবি চৈতন্যদাস মণ্ডল হয়তো তাঁর সময়ে জানতেন না, তাঁর লেখা কাব্য এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও মানুষের কৌতূহলের কারণ হবে। মূলধারার তালিকায় নাম না থাকলেও তাঁর ‘বৃহৎ মনসামঙ্গল’ আজ নতুন করে আলোচনায়। আর সেই আলোচনার মধ্য দিয়েই মানভূমের লোকসাহিত্যের এক বিস্মৃত অধ্যায় ফের সামনে আসছে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved