
নিউজ ডেস্ক; এক তরুণীকে নিজের মেসে ডেকে এনে খুনের অভিযোগে অমিত মাহাতো নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার গভীর রাতে বলরামপুর এলাকায় নাকা চেকিংয়ের সময় তাঁকে আটক করা হয়। রবিবার পুরুলিয়া আদালতে তোলা হলে বিচারক অমিতকে ৯ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে গ্রেফতারির পরেও এই খুনের ঘটনায় একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে তরুণী কখন নিজের মেস থেকে বেরিয়েছিলেন, অমিতের মেসে পৌঁছনোর আগে কোথায় ছিলেন, খুনের পর অমিত কী ভাবে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের বলরামপুরে পৌঁছলেন এবং তাঁর সঙ্গে উদ্ধার হওয়া দেহটি নিয়ে কী ভাবে বিভিন্ন থানা এলাকা পেরিয়ে গেলেন—এসব বিষয় তদন্তকারীদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিহত তরুণীর পরিবারের অবশ্য অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁদের দাবি, শুধু খুন নয়, তরুণীকে ধর্ষণও করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের সন্দেহ, এই ঘটনায় ধৃত অমিত একা জড়িত নন। আরও এক বা একাধিক ব্যক্তি এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন বলে তাঁদের আশঙ্কা। নিহতের বাবা দাবি করেছেন, তাঁর মেয়ের উপর যৌন নির্যাতন করা হয়েছে এবং ঘটনার পিছনে আরও কয়েক জনের ভূমিকা থাকতে পারে। এমনকী অন্য কোনও তরুণীও ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। পরিবারের তরফে অভিযুক্তদের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
তবে তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না, কিংবা ঘটনায় অমিত ছাড়া অন্য কেউ জড়িত কি না—এখনও তা তদন্তসাপেক্ষ। সেই কারণেই অমিতের মেস থেকে ফরেন্সিক নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ঘটনাস্থলে এমন কোনও প্রমাণ রয়েছে কি না, যা যৌন নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সাহায্য করতে পারে।
পাশাপাশি, তরুণীকে যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলায় আঘাত করে খুন করা হয়েছে বলে পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, সেটিও এখনও উদ্ধার হয়নি। ওই অস্ত্রের সন্ধানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধার হলে খুনের ধরন এবং ঘটনার সঙ্গে অভিযুক্তের যোগসূত্র সম্পর্কে তদন্তকারীদের হাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আসতে পারে।
ঘটনার সময়ের হিসাব নিয়েও তৈরি হয়েছে বেশ কিছু প্রশ্ন। নিহত তরুণীর বাবা জানিয়েছেন, শনিবার সন্ধ্যার দিকে তিনি মেয়ের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু ফোনটি বন্ধ পান। ওই দিন দুপুরে মেয়ের সঙ্গে শেষ বার কথা হয়েছিল তাঁর মায়ের। প্রথমে পরিবারের সদস্যদের ধারণা হয়, হয়তো মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেও ফোন বন্ধ থাকায় সন্দেহ তৈরি হয়।
এর পর তরুণীর বাবা যোগাযোগ করেন তাঁর মেস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। সেখান থেকে জানতে পারেন, শনিবার দুপুর প্রায় ১টা নাগাদ লাঞ্চ করার পর তরুণী মেস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তার পর থেকে তাঁর সঙ্গে মেসের আর কোনও যোগাযোগ হয়নি।
তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার কিছু পরে অমিতের মেসে পৌঁছেছিলেন ওই তরুণী। দু’জনের মেসের মধ্যে দূরত্ব আনুমানিক দেড় কিলোমিটার। ফলে তদন্তে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, দুপুর ১টার সময় নিজের মেস থেকে বেরনোর পর বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ অমিতের মেসে পৌঁছনোর আগের প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা তরুণী কোথায় ছিলেন?
এই সময়সীমাই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ওই সময় তিনি কারও সঙ্গে দেখা করেছিলেন কি না, কোথাও গিয়েছিলেন কি না, তাঁর মোবাইলের অবস্থান কোথায় ছিল—এই সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হতে পারে। একই সঙ্গে তরুণীর ফোনের কল রেকর্ড এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অমিতের মেসের আবাসিকদের বক্তব্যও তদন্তে নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। মেসের আবাসিক রোহিত মাঝি জানিয়েছেন, প্রায় পাঁচ মাস আগে অমিত ওই দোতলা মেসে উঠেছিলেন। তিনি এক রুমমেটের সঙ্গে থাকতেন। শনিবার দুপুর ১টার দিকে অমিতের রুমমেট বাড়ি চলে যান।
রোহিতের বক্তব্য অনুযায়ী, বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ মেসের বেশ কয়েক জন আবাসিক ফুটবল খেলতে মাঠে চলে যান। তাঁরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ মেসে ফেরেন। তখন অমিতকে দেখতে পাননি তাঁরা। কিন্তু দোতলার সিঁড়িতে রক্তের দাগ দেখতে পান। তাতেই তাঁদের সন্দেহ হয়।
মেসের ঘরটি খোলা অবস্থায় ছিল বলে জানিয়েছেন ওই আবাসিক। ঘরের ভিতরে একটি তীব্র গন্ধও পাওয়া গিয়েছিল বলে তাঁর দাবি। তাঁর মনে হয়েছিল, ঘরের মেঝে জল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাঁরা দ্রুত পুলিশকে খবর দেন।
এর পরেই তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তল্লাশি শুরু করেন। কিন্তু ততক্ষণে অমিত সেখানে ছিলেন না। পরে জানা যায়, মেস থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বলরামপুর এলাকায় নাকা চেকিংয়ের সময় রাতে তাঁকে আটক করা হয়েছে। সময় তখন শনিবার রাত সাড়ে ১২টা।
এই জায়গাতেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের হিসাব। মেস থেকে মোটরবাইকে বলরামপুর পৌঁছতে সাধারণ পরিস্থিতিতে আনুমানিক ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। ফলে মেস থেকে অমিত বেরোনোর পর নাকা চেকিংয়ে ধরা পড়ার আগের সময়টুকু নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তিনি মাঝের ওই সময়ে কোথায় ছিলেন, কী করেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে কারও যোগাযোগ হয়েছিল কি না—সবই এখন তদন্তের বিষয়।
আরও একটি প্রশ্ন ঘুরছে যাতায়াতের পথকে কেন্দ্র করে। অমিতের মেস থেকে বলরামপুরের নাকা চেকিং পয়েন্টে যেতে যে পথ ব্যবহার করার কথা, সেই রুটে টামনা এবং তার পরে আড়শা থানা এলাকা পড়ে। পুলিশের সন্দেহ অনুযায়ী যদি অমিত মোটরবাইকে দেহ নিয়ে ওই পথ দিয়ে গিয়ে থাকেন, তা হলে এতটা পথ অতিক্রম করার সময় বিষয়টি কারও নজরে এল না কেন—সেই প্রশ্নও উঠেছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এই প্রশ্নগুলির কোনওটিরই নিশ্চিত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। অমিত ঠিক কোন পথ ব্যবহার করেছিলেন, তাঁর মোটরবাইকে কী ছিল, দেহ কী ভাবে পরিবহণ করা হয়েছিল এবং কোন সময়ে তিনি কোথায় ছিলেন—এসব তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।
অমিতকে ৯ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর ফলে তদন্তকারীদের হাতে এখন বেশ কিছুটা সময় রয়েছে। সেই সময়ে তাঁর বয়ান, মোবাইল ফোনের তথ্য, যাতায়াতের রুট, সিসিটিভি ফুটেজ, মেসের ফরেন্সিক নমুনা এবং অন্যান্য সম্ভাব্য প্রমাণ খতিয়ে দেখা হতে পারে। তরুণীর মৃত্যুর আগে এবং পরে তাঁর সঙ্গে কার কার যোগাযোগ হয়েছিল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
নিহত তরুণীর পরিবারের অভিযোগেরও তদন্তে গুরুত্ব রয়েছে। ধর্ষণের অভিযোগ সত্য কি না, তা ফরেন্সিক এবং ময়নাতদন্ত সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। একই ভাবে অমিত ছাড়া ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্তে পাওয়া প্রমাণের উপর নির্ভর করবে।
এই মুহূর্তে তাই গ্রেফতার হওয়া যুবককে ঘিরে অভিযোগ যেমন গুরুতর, তেমনই ঘটনার সময়রেখা নিয়েও একাধিক অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে। তরুণীর নিজের মেস থেকে বেরনো থেকে অমিতের মেসে পৌঁছনো, সেখান থেকে খুনের ঘটনা এবং পরে বলরামপুরে পুলিশের হাতে ধরা পড়া—পুরো সময়পর্বের একটি পরিষ্কার ছবি তৈরি করাই তদন্তকারীদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই উত্তর মিললেই হয়তো স্পষ্ট হবে, এই ভয়াবহ ঘটনার পিছনে ঠিক কী ঘটেছিল এবং আর কেউ এতে জড়িত ছিল কি না।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments