Homeজেলাঅরণ্যের মৃত্যুর পর প্রশ্নের মুখে চিকিৎসকদের যোগ্যতা, পূর্ব বর্ধমানে সব বেসরকারি হাসপাতালের নথি যাচাই

অরণ্যের মৃত্যুর পর প্রশ্নের মুখে চিকিৎসকদের যোগ্যতা, পূর্ব বর্ধমানে সব বেসরকারি হাসপাতালের নথি যাচাই

নিউজ ডেস্ক; চার বছরের শিশু অরণ্য রায়ের মৃত্যুর পর পূর্ব বর্ধমানের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন করে উদ্বেগ। ফাইমোসিসের অস্ত্রোপচারের পর শিশুটির মৃত্যু এবং সেই ঘটনায় এক চিকিৎসকের যোগ্যতা
resizeplus_Screenshot 2026-09-14 123008_edited

নিউজ ডেস্ক; চার বছরের শিশু অরণ্য রায়ের মৃত্যুর পর পূর্ব বর্ধমানের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন করে উদ্বেগ। ফাইমোসিসের অস্ত্রোপচারের পর শিশুটির মৃত্যু এবং সেই ঘটনায় এক চিকিৎসকের যোগ্যতা নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর এ বার জেলার বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলিতে কর্মরত চিকিৎসকদের নথিপত্র ফের যাচাই করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, পূর্ব বর্ধমানের সমস্ত বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় তথ্য নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে চিকিৎসকদের যাবতীয় তথ্য ফের দফতরে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে খবর।

উদ্দেশ্য একটাই—চিকিৎসকদের যোগ্যতা ও রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করা। একই সঙ্গে কোনও চিকিৎসকের নথিপত্রে অসঙ্গতি রয়েছে কি না, কিংবা কেউ ভুয়ো পরিচয় বা শংসাপত্র ব্যবহার করে চিকিৎসা করছেন কি না, সেটিও যাচাই করতে চাইছে প্রশাসন।

এই তৎপরতার সূত্রপাত মূলত অরণ্য রায়ের মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ থেকে। গত ২ সেপ্টেম্বর বর্ধমানের নবাবহাট মোড়ের একটি নার্সিংহোমে ফাইমোসিসের অস্ত্রোপচারের জন্য ভর্তি করা হয়েছিল চার বছরের ওই শিশুকে। অস্ত্রোপচারের পরেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। খিঁচুনি শুরু হওয়ায় দ্রুত তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত অরণ্যকে বাঁচানো যায়নি।

ঘটনার পর চিকিৎসায় যুক্ত ‘জেনারেল সার্জন’ শেখ সায়দুলের যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই চিকিৎসকের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকী তাঁর বিরুদ্ধে ভুয়ো শংসাপত্র ব্যবহার করে চিকিৎসা করার অভিযোগও উঠেছে। তবে এই সমস্ত অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের বিষয়। প্রশাসনিক ও আইনি তদন্তের মাধ্যমেই তা নিশ্চিত হওয়ার কথা।

তবে অরণ্যের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই বর্ধমানের রোগী ও তাঁদের পরিজনদের একাংশের মধ্যে চিকিৎসকের যোগ্যতা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক দেখাতে এসে অনেকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক সত্যিই চিকিৎসা করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও বৈধ রেজিস্ট্রেশন রাখেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন করছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

বর্ধমান শহরের খোসবাগান এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ‘ডাক্তারপাড়া’ নামে পরিচিত। সেখানে বহু চিকিৎসকের চেম্বার রয়েছে। অরণ্যের ঘটনার পর সেই এলাকার চিকিৎসকরাও রোগীদের প্রশ্নের মুখে পড়ছেন বলে জানা যাচ্ছে। এক চিকিৎসকের সহযোগী অলোক সাহার অভিজ্ঞতা সেই পরিস্থিতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অলোকের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে একজন বিশিষ্ট সার্জনের সঙ্গে কাজ করলেও তাঁকে কখনও এমন প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে, তা তিনি ভাবেননি। তাঁর দাবি, এক রোগী সরাসরি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, যে চিকিৎসকের কাছে তিনি এসেছেন, তিনি আদৌ চিকিৎসক কি না। দীর্ঘ ন’বছর ধরে চিকিৎসকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতিতে পড়ে তিনি নিজেও অস্বস্তিতে পড়েছেন বলে জানান।

তাঁর বক্তব্য, ভুয়ো চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় প্রকৃত চিকিৎসকরাও বিব্রত। রোগী বা তাঁদের পরিবারের এমন প্রশ্নের জবাব দেওয়া তাঁদের পক্ষেও কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ একজন চিকিৎসকের যোগ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে গোটা চিকিৎসক সমাজের উপরেই।

তবে ভুয়ো চিকিৎসকের অভিযোগ বর্ধমানে নতুন নয়। এর আগে ২০১৭ সালে কাটোয়ায় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভুয়ো চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার অভিযোগ সামনে এসেছিল। ওই ঘটনার তদন্ত করেছিল সিআইডি। সেই সময় চিকিৎসকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ডিগ্রি যাচাই নিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতাও দেখা গিয়েছিল। এমনকি সেই সময় বেশ কয়েকজন চিকিৎসক তাঁদের চেম্বারের বাইরে থাকা সাইনবোর্ড পর্যন্ত খুলে ফেলেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই তৎপরতা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায় বলে অভিযোগ। ওই তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টও প্রকাশ্যে আসেনি বলে দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের। ফলে চিকিৎসকদের ডিগ্রি ও রেজিস্ট্রেশন যাচাইয়ের প্রশ্নটি ফের অরণ্যের মৃত্যুর ঘটনায় সামনে চলে এসেছে।

বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলির সংগঠনও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটালস অ্যান্ড নার্সিংহোমের সহ-সভাপতি শেখ আব্বাসউদ্দিন জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় তাঁরাও উদ্বিগ্ন। বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নথিপত্র যাচাই করা হয় বলেও তাঁর দাবি।

আব্বাসউদ্দিনের প্রশ্ন, যদি কোনও চিকিৎসকের নথি ও রেজিস্ট্রেশন বৈধ বলে সরকারি ব্যবস্থায় স্বীকৃতি পায়, তা হলে সেই রেজিস্ট্রেশন কী ভাবে দেওয়া হয়েছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। তাঁর বক্তব্য, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সরকারি পোর্টালেও অনেক চিকিৎসকের নাম নথিভুক্ত থাকে। ফলে কোনও চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে পরবর্তীতে প্রশ্ন উঠলে শুধু সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক নয়, রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

এই অবস্থায় জেলা স্বাস্থ্য দফতরের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে চিকিৎসক মহলের একাংশ। সব বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে কর্মরত চিকিৎসকদের যোগ্যতা, ডিগ্রি, রেজিস্ট্রেশন এবং সংশ্লিষ্ট নথি নতুন করে যাচাই করা হলে রোগীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এই যাচাই প্রক্রিয়ায় অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগে থেকেই দোষী ধরে না নিয়ে নথি ও সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুয়ো যোগ্যতার অভিযোগ ওঠা এবং অভিযোগটি প্রমাণিত হওয়া—দুই বিষয় এক নয়।

জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জয়রাম হেমব্রম জানিয়েছেন, প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে কঠোর মনোভাব নিয়েই এগোচ্ছে। তদন্ত চলছে এবং এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছেন তিনি।

অরণ্যের মৃত্যুর পর তাই একদিকে যেমন শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তদন্তের প্রশ্ন রয়েছে, অন্য দিকে উঠে এসেছে চিকিৎসকদের যোগ্যতা যাচাইয়ের বৃহত্তর বিষয়টিও। জেলা স্বাস্থ্য দফতরের নতুন উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার উপরই অনেকটা নির্ভর করবে বর্ধমানের রোগী ও তাঁদের পরিজনদের আস্থা ফেরানো।

সবচেয়ে বড় কথা, চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রে রোগীর বিশ্বাসই অন্যতম ভিত্তি। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রভাব যাতে গোটা চিকিৎসক সমাজের উপর না পড়ে, তার জন্য স্বচ্ছ যাচাই এবং প্রকৃত তথ্য সামনে আনা জরুরি। একই সঙ্গে যদি কোথাও সত্যিই ভুয়ো নথি বা অবৈধ রেজিস্ট্রেশনের প্রমাণ মেলে, সে ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved