Homeপূর্ব বর্ধমানগোবিন্দভোগেও ভেজালের অভিযোগ! ‘সনম’ ধান মিশিয়ে বাজারে নকল চাল, দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা

গোবিন্দভোগেও ভেজালের অভিযোগ! ‘সনম’ ধান মিশিয়ে বাজারে নকল চাল, দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা

নিউজ ডেস্ক; পূর্ব বর্ধমানকে রাজ্যের শস্যভান্ডার বলা হয়। এই জেলার দক্ষিণ দামোদর এলাকার মাটি ও আবহাওয়া বিশেষ ধরনের সুগন্ধি ধান চাষের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। তার মধ্যে অন্যতম গোবিন্দভোগ। ছোট
resizeplus_Screenshot 2026-09-14 122500_edited

নিউজ ডেস্ক; পূর্ব বর্ধমানকে রাজ্যের শস্যভান্ডার বলা হয়। এই জেলার দক্ষিণ দামোদর এলাকার মাটি ও আবহাওয়া বিশেষ ধরনের সুগন্ধি ধান চাষের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। তার মধ্যে অন্যতম গোবিন্দভোগ। ছোট দানার এই চালের স্বাদ এবং বিশেষ সুগন্ধের জন্য বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর চাহিদা রয়েছে। এমনকি বিদেশের বাজারেও রপ্তানি হয় পূর্ব বর্ধমানের গোবিন্দভোগ চাল। কিন্তু সেই বিখ্যাত চাল নিয়েই এ বার উঠেছে গুরুতর ভেজালের অভিযোগ। আর অভিযোগ তুলেছেন অন্য কেউ নন, গোবিন্দভোগ ধান চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কৃষকরাই।

কৃষকদের একাংশের দাবি, বাজারে আসল গোবিন্দভোগ চালের সঙ্গে অন্য একটি জাতের চাল মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগের তির রাইস মিল মালিকদের একাংশের দিকে। কৃষকদের দাবি, বিহার এবং উত্তরবঙ্গ থেকে ‘সনম’ নামে একটি ধান আসছে। দেখতে অনেকটাই গোবিন্দভোগ ধানের মতো হওয়ায় সাধারণ ক্রেতার পক্ষে দু’টির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন। অভিযোগ, সেই ধান থেকে চাল তৈরি করে তার সঙ্গে সুগন্ধি মিশিয়ে গোবিন্দভোগ চালের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে।

শুধু আসল চালের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া নয়, কোথাও কোথাও ওই নকল চালকেই গোবিন্দভোগ নামে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ কৃষকদের। তাঁদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা বন্ধ না হলে শুধু চাষির আর্থিক ক্ষতিই হবে না, গোবিন্দভোগ চালের দীর্ঘদিনের সুনামও ধাক্কা খেতে পারে। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এই চালের যে আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে, নকল চালের কারণে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

কী অভিযোগ কৃষকদের?

কৃষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘সনম’ নামের যে ধানটি বিহার ও উত্তরবঙ্গ থেকে আসছে, তার চেহারা গোবিন্দভোগ ধানের সঙ্গে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মিলে যায়। ফলে ধান বা চাল দেখে সাধারণ ক্রেতার পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব নয় কোনটি আসল গোবিন্দভোগ।

অভিযোগ, কিছু রাইস মিল সেই সনম ধান থেকে চাল তৈরি করছে। পরে সেই চালে কৃত্রিম ভাবে সুগন্ধ যোগ করা হচ্ছে। এর পর তা আসল গোবিন্দভোগ চালের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারে পাঠানো হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও সম্পূর্ণ নকল চালকেও গোবিন্দভোগের নামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে দাবি কৃষকদের।

এই অভিযোগের জেরে এখন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করছেন চাষিরা। তাঁদের বক্তব্য, রাইস মিলগুলিতে অভিযান চালিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হোক এবং পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হোক বাজারে গোবিন্দভোগ নামে যে চাল বিক্রি হচ্ছে, তার কতটা সত্যিই গোবিন্দভোগ।

কমছে আসল গোবিন্দভোগের দাম?

কৃষকদের অভিযোগের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, নকল চাল বাজারে আসার প্রভাব পড়ছে তাঁদের উৎপাদিত আসল গোবিন্দভোগ ধানের দামের উপর। পূর্ব বর্ধমানের রায়না, খণ্ডঘোষ এবং মাধবডিহি এলাকায় গোবিন্দভোগ ধানের চাষ উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি বাঁকুড়ার ইন্দাসের কিছু এলাকাতেও এই ধানের চাষ হয়।

মাধবডিহির কৃষক সুমন সাহার অভিযোগ, সনম ধান থেকে চাল তৈরি করে তাতে সুগন্ধি মেশানোর পর সেটিকে গোবিন্দভোগ চালের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, চাষিরা বিপুল খরচ করে আসল গোবিন্দভোগ ধান ফলালেও সেই অনুযায়ী দাম পাচ্ছেন না।

রায়না-১ ব্লকের বজরুকদিঘি এলাকার কৃষক শেখ আনসার আলির কথাতেও একই অভিযোগের প্রতিফলন। তাঁর দাবি, এক বিঘা জমিতে প্রায় ৯ থেকে ১০ বস্তা গোবিন্দভোগ ধান উৎপাদন হয়। এক একটি বস্তায় প্রায় ৬০ কেজি ধান থাকে। কয়েক বছর আগে সেই ধান কেজিপ্রতি ১১০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত দামে রাইস মিলে বিক্রি করতে পারতেন বলে দাবি তাঁর।

কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে বলে অভিযোগ। কৃষকটির দাবি, সনম চালের সঙ্গে গোবিন্দভোগ চাল মেশানোর প্রবণতার কারণে আসল গোবিন্দভোগ ধানের জন্য মিল মালিকেরা কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকার বেশি দিতে চাইছেন না। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষকদের হাতে আগের মতো লাভ থাকছে না।

খণ্ডঘোষের কৃষক শেখ বদলে আলমও একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, গোবিন্দভোগ চাষে খরচ যথেষ্ট বেশি। অথচ বাজারে নকল বা ভেজাল চাল ঢুকে পড়ায় আসল ধান উৎপাদন করেও চাষিরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। এর ফলে কৃষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে এই চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন অনেকেই—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

বিদেশের বাজারেও রয়েছে চাহিদা

গোবিন্দভোগের গুরুত্ব শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ দামোদর এলাকার এই সুগন্ধি চাল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। জানা গিয়েছে, কেরালায় এই চালের উল্লেখযোগ্য বাজার রয়েছে। সেখান থেকে সৌদি আরব-সহ বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় এই চাল পৌঁছয়।

সুগন্ধ, স্বাদ এবং গুণমান—এই তিন বৈশিষ্ট্যের জন্য গোবিন্দভোগ দীর্ঘদিন ধরেই ক্রেতাদের কাছে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। পূর্ব বর্ধমানের দক্ষিণ দামোদর এলাকার সঙ্গে এই চালের নামও কার্যত একসূত্রে জড়িয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি পাওয়ার পর কয়েক বছর ধরে গোবিন্দভোগ চাষ কৃষকদের কাছে তুলনামূলক ভাবে লাভজনক হয়ে উঠেছিল।

কৃষকদের বক্তব্য, সেই বাজার এবং সুনাম ধরে রাখতে হলে আসল গোবিন্দভোগের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বাজারে একই নামে অন্য চাল বিক্রি হলে ক্রেতারা ধীরে ধীরে গোবিন্দভোগের গুণমান নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠতে পারেন। বিদেশের বাজারে এক বার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে তা ফেরানো কঠিন বলেও আশঙ্কা করছেন চাষিরা।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি

এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের দাবি, শুধু রাইস মিল নয়, বাজারেও নজরদারি বাড়ানো হোক। গোবিন্দভোগ নামে বিক্রি হওয়া চালের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হোক। কোন ধানের চাল বাজারে যাচ্ছে, তার উৎস কোথায় এবং চালের সঙ্গে কোনও কৃত্রিম সুগন্ধি মেশানো হচ্ছে কি না—সেগুলিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

কৃষকদের বক্তব্য, তাঁদের উৎপাদিত আসল গোবিন্দভোগ ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে নকল চালের কারবার বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এক দিকে অসাধু ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন, অন্য দিকে প্রকৃত চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়বেন।

তবে কৃষকদের এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং কোনও নির্দিষ্ট রাইস মিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্রশাসনিক তদন্ত ও চালের পরীক্ষার রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই এলাকায় যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তাতে গোবিন্দভোগের বাজার ও চাষিদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে।

একটি বিশেষ আঞ্চলিক কৃষিপণ্য কী ভাবে ধীরে ধীরে দেশ-বিদেশে পরিচিতি পায়, গোবিন্দভোগ তারই উদাহরণ। সেই পরিচিতির ভিত যদি ভেজাল বা নকল পণ্যের কারণে দুর্বল হয়ে যায়, তার সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসতে পারে কৃষকদের উপরেই। তাই চাষিদের দাবি, সময় থাকতে প্রশাসন কঠোর নজরদারি শুরু করুক এবং আসল গোবিন্দভোগের বাজারকে নকল চালের দাপট থেকে রক্ষা করা হোক।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved