Last updated: September 11th, 2026 at 10:07 pm

নিউজ ডেস্ক: মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের আকুল আর্তি ছিল স্রেফ একটাই— মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে দীর্ঘ দিন জেলবন্দি থাকা ছেলের মুখটা শেষবারের মতো দু’চোখ ভরে দেখবেন, একটু ছুঁয়ে আশীর্বাদ করবেন। কিন্তু এক চরম অমানবিক বাস্তবতার সাক্ষী রইল প্রতিবেশী বাংলাদেশ। বারবার আইনি দরবার এবং জামিনের আবেদন সত্ত্বেও জীবিত অবস্থায় ছেলের দেখা পেলেন না ক্যানসার আক্রান্ত মা। অবশেষে বৃহস্পতিবার সকালে মায়ের মৃত্যুর পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য মিলল প্যারোলে মুক্তি। বাড়ি ফিরে যখন পৌঁছলেন, ততক্ষণে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন জননী। সন্তানহারা শোকে কাতর হয়ে মৃত মায়ের পায়ের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়লেন বাংলাদেশে দীর্ঘ প্রায় দু’বছর ধরে কারারুদ্ধ ইসকন সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভু। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন মানবাধিকার কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ও পরিবর্তিত শাসনব্যবস্থার নির্মমতার বিরুদ্ধে সরাসরি তোপ দেগেছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা সন্ধ্যারানি ধর দীর্ঘদিন ধরে মারণরোগ ক্যানসারে ভুগছিলেন। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করানো হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পেয়ে হাসপাতালে আর আবদ্ধ থাকতে চাননি তিনি। চিকিৎসাধীন অবস্থা থেকেই তিনি আকুল ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, জীবনের অন্তিম মুহূর্তটুকু যেন তিনি ছেলের স্মৃতিবিজড়িত আশ্রমে কাটাতে পারেন, যেখানে সন্ন্যাসজীবনে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছিলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস। সেই শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী গত মঙ্গলবার তাঁকে ওই আশ্রমে নিয়ে আসা হয়। শয্যাশায়ী বৃদ্ধা তখন প্রহর গুনছিলেন একটাই আশায়— হয়তো মানবিকতার খাতিরে অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্যও জামিনে বাড়ি এসে পাশে দাঁড়াবে তাঁর বন্দি সন্তান।
পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে আর্জি জানিয়েছিলেন, যাতে অন্তিমলগ্নে চিন্ময় প্রভুকে মায়ের কাছে যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু অনমনীয় আইনি জটিলতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতায় জীবিত অবস্থায় সন্তানের স্পর্শটুকু তাঁর কপালে জুটল না। বৃহস্পতিবার সকালেই আশ্রমের শয্যায় চিরতরে চোখ বুজলেন সন্ধ্যারানি দেবী। আর মা চলে যাওয়ার পরেই তড়িঘড়ি আদালতের নির্দেশে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় চিন্ময় প্রভুকে। কড়া পুলিশি পাহারায় তিনি যখন আশ্রমে মায়ের মরদেহের সামনে পৌঁছান, তখন গোটা পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে কান্নার রোলে। প্রাণহীন মায়ের চরণ স্পর্শ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই হিন্দু ধর্মীয় নেতা। এই করুণ দৃশ্য নাড়িয়ে দিয়েছে বহু মানুষের বিবেককে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংবেদনশীলতা নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘ এক ক্ষোভবার্তায় তিনি সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছেন বাংলাদেশের শাসককুলকে। তসলিমা লিখেছেন, ‘‘একজন মা মৃত্যুর আগে তাঁর ছেলেকে একবার দেখতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি। একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের এর চেয়ে স্বাভাবিক এবং সাধারণ মানবিক আবেদন আর কী হতে পারে? তিনি কেবল চেয়েছিলেন তাঁর সন্তান একবার এসে পাশে দাঁড়াবে, হয়তো তাঁর হাতটি শেষবারের মতো ধরবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেই সামান্যতম মানবিক অধিকারটুকুও রক্ষা করতে পারল না।’’
তসলিমা নাসরিন সরাসরি দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিশানা করে একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শাসকদল যখন মুখে ‘বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ’-এর কথা বলে, তখন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এমন কঠোর ও অসংবেদনশীল আচরণের ব্যাখ্যা কী? তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা আশ্বাসের বাণী শুনিয়েও কেন একজন ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের শেষ আকুতি পূরণ করতে পারলেন না? ধর্মীয় সম্প্রীতির ভাষণে যতই বড় বড় কথা বলা হোক না কেন, বাস্তবে সন্ধ্যারানি ধরের মৃত্যুশয্যা সেই মিথ্যে আশ্বাসের মুখে দাঁড়িয়ে চিরকাল প্রশ্ন তুলে যাবে— অন্তিম সময়ে তাঁর সন্তানকে কেন কাছে দেওয়া হয়নি? রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের মতে, পরিবর্তিত বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থার খোলনলচে বদলের যে দাবি তোলা হয়েছিল, তা যে কেবল কথার কথাই রয়ে গিয়েছে, এই মর্মান্তিক ঘটনা তা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments