
নিউজ ডেস্ক; তৃণমূলের কোনও নেতা বা কর্মীকে আপাতত দলে নেওয়া হবে না—বিধানসভা ভোটের পরেই এমন বার্তা দিয়েছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শুধু দলবদল নয়, তৃণমূলের হাতে থাকা কোনও গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদ কিংবা পুরবোর্ডও জোর করে দখল করা হবে না বলে জানিয়েছিলেন তিনি। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সেই অবস্থানের সঙ্গে অবশ্য রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পঞ্চায়েতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ছবি পুরোপুরি মেলানো যাচ্ছে না।
পালাবদলের পর হাওড়া ও হুগলি—এই দুই জেলায় একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েতের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বদলেছে। কোথাও তৃণমূলের নির্বাচিত প্রধান এবং উপপ্রধান পদত্যাগ করেছেন, কোথাও আবার নতুন করে ভোটাভুটিতে বিজেপির সদস্যরা প্রধান বা উপপ্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ হল, কয়েকটি ক্ষেত্রে বিজেপির প্রার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল সদস্যদের সমর্থনেই পঞ্চায়েতের শীর্ষ পদে বসেছেন।
এতে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে—রাজ্য নেতৃত্ব যখন প্রকাশ্যে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের দলে না নেওয়ার কথা বলছেন এবং জোর করে পঞ্চায়েত দখলের বিরোধিতা করছেন, তখন নিচুতলায় এই ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ কী ভাবে তৈরি হচ্ছে? তৃণমূলের নির্বাচিত সদস্যেরা বিজেপির প্রার্থীকে ভোট দিলেও তাঁরা আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন কি না, সেই প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর সব ক্ষেত্রে মিলছে না।
হুগলির গোঘাটের মান্দারণ গ্রাম পঞ্চায়েতের ঘটনাটি এই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। ২৭ অগস্ট ওই গ্রাম পঞ্চায়েতের নিয়ন্ত্রণ বিজেপির হাতে যায়। অথচ ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, সেখানে তৃণমূলের সদস্য সংখ্যাই ছিল অনেক বেশি।
মান্দারণ গ্রাম পঞ্চায়েতে মোট সদস্য ২১ জন। ২০২৩ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের ১৭ জন এবং বিজেপির চার জন সদস্য জয়ী হয়েছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তৃণমূল বোর্ড গঠন করে। প্রধান ও উপপ্রধানও নির্বাচিত হন তৃণমূলের সদস্যদের মধ্য থেকেই।
কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর পরিস্থিতিতে বদল আসে। অভিযোগ, তৃণমূলের প্রধান এবং উপপ্রধান দীর্ঘদিন পঞ্চায়েত অফিসে নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন না। এর ফলে পঞ্চায়েতের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছিল এবং সাধারণ মানুষ পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়ছিলেন বলে দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রধান ও উপপ্রধান দু’জনেই পদত্যাগ করেন।
এরপর নিয়ম মেনে নতুন করে প্রধান ও উপপ্রধান নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভোটাভুটিতে শেষ পর্যন্ত বিজেপির প্রার্থী সাথী সিং প্রধান নির্বাচিত হন। উপপ্রধানের পদও যায় বিজেপির প্রার্থীর দখলে।
এখানেই তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক প্রশ্ন। যে পঞ্চায়েতে বিজেপির সদস্য সংখ্যা মাত্র চার, সেখানে কী ভাবে বিজেপির প্রার্থী প্রধান হলেন? স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণের উত্তর, তৃণমূলের একাধিক নির্বাচিত সদস্য বিজেপির মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থন করেছেন। অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে পিছিয়ে থেকেও ভোটের সমীকরণে এগিয়ে যায় বিজেপি।
তবে ওই তৃণমূল সদস্যেরা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও তথ্য সামনে আসেনি। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বও এই বিষয়ে নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। ফলে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, আনুষ্ঠানিক দলবদল ছাড়াই কি পঞ্চায়েতের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাচ্ছে?
প্রধান নির্বাচিত হওয়ার পরে সাথী সিংয়ের বক্তব্য, আগের প্রধান পঞ্চায়েত অফিসে না আসায় সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়েছিলেন। সেই কারণেই নিয়ম মেনে নতুন করে ভোটাভুটি করে প্রধান নির্বাচন করতে হয়েছে। তাঁর দাবি, কোনও ভাবেই পঞ্চায়েত জোর করে দখল করা হয়নি।
একই ধরনের ছবি দেখা গিয়েছে আরামবাগের মায়াপুর ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতেও। এত দিন এই পঞ্চায়েত তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের পর সেখানেও প্রধান ও উপপ্রধান পদত্যাগ করেন। এর পরে নতুন করে নির্বাচন হয়।
১ সেপ্টেম্বরের ওই ভোটাভুটিতে বিজেপির সদস্য লক্ষ্মণ রায় প্রধান নির্বাচিত হন। উপপ্রধান হন অঞ্জনা মালিক। মায়াপুর ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতে মোট সদস্য ১৪ জন। তাঁদের মধ্যে বিজেপির তিন জন, সিপিআইয়ের এক জন এবং বাকিরা তৃণমূলের সদস্য।
সংখ্যার বিচারে এখানেও তৃণমূলেরই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। কিন্তু ভোটের দিন ১৪ জনের মধ্যে ১১ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তৃণমূলের আট জন সদস্য বিজেপির মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থন করেন। সেই ভোটের জোরেই প্রধান ও উপপ্রধানের পদ চলে যায় বিজেপির হাতে।
লক্ষ্মণ রায়ের বক্তব্য, বিধানসভা নির্বাচনের পর আগের প্রধান ও উপপ্রধান নিয়মিত অফিসে না আসায় পঞ্চায়েতের কাজ কার্যত থমকে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়ছিলেন। সেই কারণেই নতুন করে ভোটাভুটি করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তাঁর দাবি, বিজেপি কোনও অনৈতিক পথে পঞ্চায়েতের দখল নেয়নি; তৃণমূলের সদস্যেরা নিজেদের সিদ্ধান্তেই ভোট দিয়েছেন।
এই ঘটনাগুলি সামনে আসার পর বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের ঘোষণার সঙ্গে নিচুতলার রাজনৈতিক বাস্তবতার ফারাক নিয়েই আলোচনা শুরু হয়েছে। শমীক ভট্টাচার্য আগেই জানিয়েছিলেন, আপাতত তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের বিজেপিতে নেওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই। একই সঙ্গে তৃণমূলের দখলে থাকা স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান জোর করে দখল করারও পক্ষপাতী নয় বিজেপি। কিন্তু পঞ্চায়েতের প্রধান নির্বাচনের ক্ষেত্রে তৃণমূলের সদস্যদের ভোট যদি বিজেপির প্রার্থীর পক্ষে যায়, তা হলে সেই ঘটনাকে দলবদল বলা হবে কি না, নাকি নিছক স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আইনগত ভাবে কোনও পঞ্চায়েতের প্রধান বা উপপ্রধান নির্বাচনের ক্ষেত্রে সদস্যদের ভোটই নির্ণায়ক। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যেরা অন্য দলের প্রার্থীকে ভোট দিলে, শুধুমাত্র সেই কারণে তাঁদের দলবদল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। আবার রাজনৈতিক ভাবে তাঁদের অবস্থান বদলের সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে স্থানীয় স্তরে ভোটের সমীকরণ এবং আনুষ্ঠানিক দলবদলের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হাওড়া ও হুগলির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি সেই জায়গাতেই নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলছে। এক দিকে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের ‘দলবদল নয়’ বার্তা, অন্য দিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল সদস্যদের ভোটে বিজেপি প্রার্থীর পঞ্চায়েতের শীর্ষ পদে আসীন হওয়া—এই দুই ছবিকে কী ভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
তবে আপাতত যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হল বিধানসভা নির্বাচনের পর স্থানীয় প্রশাসনের স্তরে রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। পঞ্চায়েতের সদস্য সংখ্যা এক দলের বেশি হলেও প্রধানের পদ অন্য দলের হাতে চলে যাচ্ছে। আগামী দিনে আরও কতগুলি পঞ্চায়েতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, এবং সেখানে নির্বাচিত সদস্যদের অবস্থান কী হয়, এখন সেটাই দেখার।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments