Homeরাজ্য৫৫ বেআইনি বহুতল ঘিরে কালো টাকা সাদা করার অভিযোগ, CBI তদন্তের নির্দেশ কলকাতা হাই কোর্টের

৫৫ বেআইনি বহুতল ঘিরে কালো টাকা সাদা করার অভিযোগ, CBI তদন্তের নির্দেশ কলকাতা হাই কোর্টের

নিউজ ডেস্ক; কলকাতা শহরের একাধিক এলাকায় অনুমোদনহীন বহুতল নির্মাণকে কেন্দ্র করে উঠেছিল গুরুতর অভিযোগ। শুধু বেআইনি ভাবে নির্মাণ নয়, সেই বহুতলগুলির আড়ালে কোটি কোটি টাকার কালো টাকা সাদা করার কারবার
Screenshot 2026-08-27 123338

নিউজ ডেস্ক; কলকাতা শহরের একাধিক এলাকায় অনুমোদনহীন বহুতল নির্মাণকে কেন্দ্র করে উঠেছিল গুরুতর অভিযোগ। শুধু বেআইনি ভাবে নির্মাণ নয়, সেই বহুতলগুলির আড়ালে কোটি কোটি টাকার কালো টাকা সাদা করার কারবার চলেছে বলেও অভিযোগ উঠেছিল। এ বার সেই মামলাতেই সরাসরি সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। শুক্রবার এই নির্দেশ দিয়েছে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ। আগামী ১৪ অক্টোবর মামলার পরবর্তী শুনানি। তার আগেই প্রাথমিক তদন্তের রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়ার জন্য সিবিআইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মামলাটি মূলত কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা বেআইনি বহুতলকে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজাবাজার, বেলেঘাটা, ক্যানাল স্ট্রিট, মানিকতলা-সহ শহরের একাধিক জায়গায় অন্তত ৫৫টি বহুতল নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলির অধিকাংশের ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ওই নির্মাণগুলির মালিকানা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে বলে অভিযোগ। কার নামে সম্পত্তিগুলি রয়েছে, কারা সেগুলি তৈরি করেছে এবং নির্মাণের পিছনে আর্থিক উৎস কী—এই সমস্ত বিষয় নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

মামলাকারীদের আরও অভিযোগ, শুধু বেআইনি নির্মাণের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়। এই নির্মাণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা সাদা করা হয়ে থাকতে পারে। ফলে বিষয়টি পুর আইন বা বেআইনি নির্মাণের গণ্ডি ছাড়িয়ে আর্থিক অনিয়মের তদন্তেরও দাবি তৈরি করেছে।

এই অভিযোগের ভিত্তিতেই প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে মামলা দায়ের হয়। শুনানির সময় কলকাতা পুরসভার ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত। সাধারণ মানুষ একাধিক বার বেআইনি নির্মাণের বিষয়ে অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন যথাযথ পদক্ষেপ করেনি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ।

আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, কোনও এলাকায় একের পর এক বেআইনি বহুতল গড়ে উঠলেও প্রশাসনের নজরে বিষয়টি আসেনি—এমনটা কী ভাবে সম্ভব? বিশেষ করে পুরসভার কাছে সাধারণ মানুষের তরফে অভিযোগ পৌঁছনোর পরেও যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়ে থাকে, তা হলে তার কারণ কী, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছে আদালত।

শুনানিতে কলকাতা পুরসভার তরফে জানানো হয়, বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে আদালতে রিপোর্ট জমা দিতে চায় তারা। তবে পুরসভার এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়নি ডিভিশন বেঞ্চ। আদালতের মতে, তথ্য সংগ্রহের নামে তদন্ত বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা যেন না হয়। প্রয়োজনে কলকাতা পুরসভার পুর কমিশনারকে আদালতে হাজির করানোর কথাও জানানো হয়।

বেআইনি নির্মাণ বন্ধ করতে এর আগেও রাজ্য সরকারের তরফে বিভিন্ন পদক্ষেপ করা হয়েছিল। শহরে বেআইনি নির্মাণের সমস্যা মোকাবিলায় একটি টাস্ক ফোর্স গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে। কিন্তু সেই টাস্ক ফোর্স গঠনের পর বাস্তবে কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তার ফলাফল কী—সেই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত।

প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানতে চায়, রাজ্য সরকার যখন বেআইনি নির্মাণ রুখতে টাস্ক ফোর্স তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল, তখন সেই নির্দেশ বাস্তবায়নে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। শুধুমাত্র একটি কমিটি বা টাস্ক ফোর্স তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে আদালতের পর্যবেক্ষণ।

এই পরিস্থিতিতে মামলার তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রাথমিক ভাবে যে সমস্ত নথি ইতিমধ্যে পাওয়া গিয়েছে, সেগুলি খতিয়ে দেখতে হবে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে। পাশাপাশি কলকাতা পুরসভা এবং পুলিশের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি সংগ্রহ করতে পারবে সিবিআই।

অর্থাৎ, তদন্তের পরিধি শুধু বহুতল নির্মাণের অনুমোদন ছিল কি না, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা সংস্থা কারা, সম্পত্তির মালিকানা কী ভাবে বদলেছে, আর্থিক লেনদেনের কোনও অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না—এই ধরনের প্রশ্নও তদন্তে গুরুত্ব পেতে পারে। তবে সিবিআই তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনও অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া হবে না। তদন্তে পাওয়া নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আদালত আরও জানিয়েছে, তদন্তের প্রয়োজনে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করার প্রয়োজন হলে সেই পথও খোলা থাকবে। অর্থাৎ মামলাটিকে শুধুমাত্র সাধারণ বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত অভিযোগ হিসেবে না দেখে বৃহত্তর পরিসরে খতিয়ে দেখার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এখন নজর ১৪ অক্টোবরের পরবর্তী শুনানির দিকে। তার আগে সিবিআইকে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দিতে হবে। সেই রিপোর্টে এখনও পর্যন্ত কী তথ্য পাওয়া গেল, কতগুলি নির্মাণের নথি পরীক্ষা করা হয়েছে, পুরসভা ও পুলিশের কাছ থেকে কী তথ্য মিলেছে এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কোনও প্রাথমিক ভিত্তি পাওয়া গিয়েছে কি না—সেই সমস্ত বিষয় উঠে আসতে পারে।

কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বেআইনি বহুতল নির্মাণের বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, নাগরিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ হলে অগ্নিনিরাপত্তা, ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব, রাস্তা ও নিকাশি ব্যবস্থার উপর চাপ—একাধিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। তার সঙ্গে যদি বেআইনি নির্মাণের পিছনে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও যুক্ত হয়, তা হলে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

হাই কোর্টের নির্দেশের ফলে আপাতত তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে সিবিআই। ৫৫টি বহুতল সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা কতটা, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং কালো টাকা সাদা করার অভিযোগের কোনও বাস্তব ভিত্তি রয়েছে কি না—তদন্ত এগোলে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে বেআইনি নির্মাণ রুখতে পুরসভা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved