Homeহাওড়াচোলাই রুখতে অভিযান, তবু বদলাচ্ছে পাচারের কৌশল! হাওড়া-হুগলিতে বাড়ছে উদ্বেগ

চোলাই রুখতে অভিযান, তবু বদলাচ্ছে পাচারের কৌশল! হাওড়া-হুগলিতে বাড়ছে উদ্বেগ

নিউজ ডেস্ক; বিষমদে মৃত্যুর আশঙ্কা ঠেকাতে রাজ্য সরকার দীর্ঘ দিন ধরেই নানা পদক্ষেপ করছে। বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকানে কম দামে বাংলা দেশি মদ বিক্রি, চোলাই তৈরি ও বিক্রি বন্ধ করতে পুলিশি
resizeplus_Screenshot 2026-09-08 164054_edited

নিউজ ডেস্ক; বিষমদে মৃত্যুর আশঙ্কা ঠেকাতে রাজ্য সরকার দীর্ঘ দিন ধরেই নানা পদক্ষেপ করছে। বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকানে কম দামে বাংলা দেশি মদ বিক্রি, চোলাই তৈরি ও বিক্রি বন্ধ করতে পুলিশি অভিযান—সবই চলছে। কিন্তু হাওড়া ও হুগলির বেশ কিছু এলাকায় চোলাইয়ের কারবার পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ। প্রশাসনের নজর এড়াতে কখনও বাইকে, কখনও অ্যাম্বুল্যান্সে করে মদ সরবরাহের অভিযোগও সামনে এসেছে। আবার ঘন ঘন বদলে ফেলা হচ্ছে চোলাই তৈরির ভাটিখানা। ফলে অভিযান চালিয়েও এই অবৈধ কারবারের শিকড় উপড়ে ফেলা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

পুরনো কারবার, জড়িয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিও

আবগারি দপ্তরের এক আধিকারিকের ব্যাখ্যা, হাওড়া ও হুগলির কিছু এলাকায় স্বাধীনতারও আগে থেকে চোলাই তৈরি হয়ে আসছে। এই কারবারের সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে। ফলে পুলিশ ও আবগারি দপ্তর সক্রিয় হলেও অবৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কারবারিরা নতুন নতুন পদ্ধতি নিচ্ছেন বলে তাঁর দাবি।

তবে শুধু উৎপাদনকারীরাই নন, নিয়মিত চোলাই পান করেন এমন মানুষের অভ্যাসও এই সমস্যাকে জটিল করে তুলছে। সরকার বৈধ দোকানে কম দামে দেশি মদ বিক্রি করলেও অনেক ক্রেতা এখনও চোলাইয়ের দিকেই ঝুঁকে থাকছেন। এর পিছনে দাম, সহজলভ্যতা এবং দীর্ঘ দিনের অভ্যাস—এই তিনটি কারণই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা।

সস্তা ও হাতের কাছে, তাই চাহিদা কমছে না

চোলাইয়ের বিকল্প হিসেবে বোতল ও টেট্রা প্যাকে বাংলা দেশি মদ বিক্রি করা হলেও অনেকের কাছে তা আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে না। চোলাইয়ে যে ধরনের নেশা হয়, সরকারি দেশি মদে তা হয় না—এমন ধারণা রয়েছে নিয়মিত পানকারীদের একাংশের মধ্যে। পাশাপাশি চোলাইয়ের তুলনায় দামও অনেকের কাছে খুব একটা কম বলে মনে হয় না।

আরও একটি বড় কারণ হল, চোলাই গ্রামেই পাওয়া যায়। বৈধ দোকান থেকে দেশি মদ কিনতে গেলে নির্দিষ্ট দোকানে যেতে হয়। ফলে সহজে হাতের কাছে পাওয়া যায় বলেই চোলাইয়ের চাহিদা এখনও কমেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চোলাইয়ের ক্রেতাদের বড় অংশই খেটে খাওয়া মানুষ। তাঁদের মধ্যে কৃষক, দিনমজুর, কলকারখানার শ্রমিক এবং পরিবহণকর্মী রয়েছেন। ফলে এই কারবারের সঙ্গে শুধু অপরাধের বিষয় নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির একটি অংশও জড়িয়ে রয়েছে বলে আবগারি দপ্তরের আধিকারিকের ব্যাখ্যা।

হাওড়ায় ধরপাকড় বাড়তেই সরবরাহের কেন্দ্র বদল

হাওড়া গ্রামীণ জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানান, আগে উলুবেড়িয়ার হীরাপুর এলাকায় বিপুল পরিমাণ চোলাই তৈরি হত। সেখান থেকে গাড়িতে করে হুগলি, পূর্ব মেদিনীপুর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হত বলে অভিযোগ।

তবে হাওড়ায় ধরপাকড় বাড়ার পর উলুবেড়িয়ায় উৎপাদন কমেছে বলে পুলিশের দাবি। তার বদলে হুগলির সিঙ্গুর, বলাগড়, পাণ্ডুয়া, পোলবা এবং দাদপুরের মতো এলাকা থেকে চোলাই সরবরাহ হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ, একটি জায়গায় অভিযান বাড়লে অন্য জায়গায় উৎপাদন ও সরবরাহের কেন্দ্র সরে যাচ্ছে—এমনটাই মনে করছেন তদন্তকারীরা।

জাতীয় সড়কে আটক একাধিক গাড়ি

গত কয়েক মাসে অভিযান চালিয়ে ১৬ নম্বর জাতীয় সড়কে বেশ কয়েকটি চোলাই বোঝাই গাড়ি আটক করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, চোলাই পাচারের জন্য ব্যবহৃত গাড়ির গতিবিধি এবং সরবরাহের পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

হাওড়া গ্রামীণ জেলা পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৭৩ হাজার ৩৮ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে ৩১ হাজার ৫০৮ লিটার চোলাই মদ নষ্ট করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৭২ হাজার লিটার ফারমেন্টেড ওয়াশ এবং ৭০ হাজার ২৬০ কেজি চিটে গুড় উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলি চোলাই তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সম্প্রতি হুগলির দিক থেকে আসা একটি অ্যাম্বুল্যান্স থেকেও চোলাইয়ের প্যাকেট উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনায় পাচারের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ সূত্রে খবর, চোলাই সরবরাহের জন্য কী ধরনের যানবাহন ব্যবহার করা হচ্ছে, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কৌশল বদলাচ্ছে কারবারিরা

হাওড়া গ্রামীণ জেলা পুলিশের এক আধিকারিকের কথায়, “চোলাই ধরার জন্য পুলিশ যতই তৎপর হচ্ছে, চোলাই পাচারের পদ্ধতিও বদলাচ্ছে। ফলে আমাদের পক্ষে কাজটা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”

প্রশাসনের বক্তব্য, চোলাই তৈরি ও বিক্রি বন্ধ করতে অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চোলাইয়ের বিকল্প হিসেবে বৈধ দেশি মদ বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু শুধু অভিযান চালালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না—চোলাইয়ের চাহিদা, সহজলভ্যতা এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা।

সব মিলিয়ে, হাওড়া ও হুগলিতে চোলাইয়ের কারবার ঠেকাতে প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন দ্বিমুখী। এক দিকে অবৈধ উৎপাদন ও পাচার বন্ধ করা, অন্য দিকে দীর্ঘ দিনের অভ্যাস এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই কারবারের বিকল্প তৈরি করা। সেই জায়গাতেই পুলিশের অভিযানের পাশাপাশি সচেতনতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা

No Comments

তাজা খবর

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved