Homeহাওড়ালিলুয়াউত্তর হাওড়ায় জলযন্ত্রণা, ‘ধৈর্য ধরুন’ মন্ত্রীর বার্তায় তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক

উত্তর হাওড়ায় জলযন্ত্রণা, ‘ধৈর্য ধরুন’ মন্ত্রীর বার্তায় তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক

নিউজ ডেস্ক; দিনের পর দিন জল জমে থাকায় কার্যত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে উত্তর হাওড়ার বিস্তীর্ণ এলাকার জনজীবন। টানা বৃষ্টির পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেলেও বহু রাস্তা, গলি এবং বসতবাড়ি
resizeplus_Screenshot 2026-09-08 175332_edited

নিউজ ডেস্ক; দিনের পর দিন জল জমে থাকায় কার্যত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে উত্তর হাওড়ার বিস্তীর্ণ এলাকার জনজীবন। টানা বৃষ্টির পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেলেও বহু রাস্তা, গলি এবং বসতবাড়ি থেকে জল নামেনি। কোথাও হাঁটুসমান জল, কোথাও আবার নিকাশি নালার নোংরা জল ঢুকে পড়েছে ঘরের ভিতরে। তার সঙ্গে রাস্তার বড় বড় খানাখন্দ মিলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। জমা জলের উপর দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে উল্টে যাচ্ছে টোটো ও রিকশ। দুর্ঘটনায় আহত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও।

এই পরিস্থিতিতে মানুষকে ধৈর্য ধরার আবেদন জানিয়েছেন উত্তর হাওড়ার বিজেপি বিধায়ক তথা রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী উমেশ রাই। তাঁর বক্তব্য, উত্তর হাওড়ার জল জমার সমস্যা বহু দিনের। স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে রাজ্য সরকার হাওড়ার নিকাশি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করছে। সেই পরিকল্পনার জন্য রাজ্য মন্ত্রিসভা প্রায় ৪,৭০২ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে। আগামী জানুয়ারি মাস থেকে কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

মন্ত্রীর এই বক্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। বিরোধীদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে জলযন্ত্রণায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ। তাঁদের এখনই স্বস্তি দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা না করে ভবিষ্যতের প্রকল্পের কথা বলে কত দিন ধৈর্য ধরতে বলা হবে?

লিলুয়া ঝিল রোড থেকে বামুনগাছি, দুর্ভোগ চরমে

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উত্তর হাওড়ার লিলুয়া ঝিল রোড থেকে বামুনগাছি পর্যন্ত এলাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। রাস্তায় জল জমে থাকায় কোথায় গর্ত রয়েছে, তা অনেক সময় বোঝাই যাচ্ছে না। সেই গর্তে পড়ে টোটো ও রিকশ উল্টে যাচ্ছে। দুর্ঘটনায় কারও হাত-পা ভাঙছে, আবার কেউ গুরুতর ভাবে আহত হচ্ছেন।

শুধু রাস্তাঘাট নয়, বহু বাড়ির ভিতরেও ঢুকে পড়েছে নোংরা জল। ফলে রান্না, পানীয় জল সংগ্রহ, শিশু ও প্রবীণদের চলাফেরা—সব কিছুতেই সমস্যা তৈরি হয়েছে। জলমগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের বক্তব্য, কয়েক দিন ধরে এই পরিস্থিতি চললেও স্থায়ী ভাবে জল নামানোর কোনও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।

হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর এবং আমতা এলাকায় বন্যার জল অনেকটাই নেমে গেলেও উত্তর হাওড়ার মানুষ এখনও জমা জলের হাত থেকে মুক্তি পাননি। স্থানীয়দের দাবি, বৃষ্টি কমে যাওয়ার পরেও জল না নামায় স্পষ্ট হচ্ছে, সমস্যার মূল কারণ নিকাশি ব্যবস্থার দুর্বলতা।

বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ

জল জমার প্রতিবাদে গত রবিবার সালকিয়ার বামুনগাছি ব্রিজের কাছে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, দিনের পর দিন জল জমে থাকলেও প্রশাসনের তরফে কার্যকর পদক্ষেপ করা হয়নি। বিক্ষোভের সময় বিজেপি কর্মীরা তাঁদের উপর চড়াও হন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

জলযন্ত্রণা নিয়ে এলাকার মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। তাঁদের বক্তব্য, ভোটের আগে দ্রুত সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরেও পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। বরং এখন সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের বদলে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে।

নিকাশি ব্যবস্থায় একাধিক সমস্যা, দাবি মন্ত্রীর

সোমবার পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খোলেন মন্ত্রী উমেশ রাই। তিনি স্বীকার করেন, উত্তর হাওড়ার উত্তম ঘোষ লেন, সালকিয়া, কামিনী স্কুল লেন এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন অংশে এখনও জল জমে রয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা, অতিবৃষ্টির পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যা থাকায় জল দ্রুত নামছে না।

মন্ত্রী জানান, সালকিয়া থেকে বাধাঘাট এবং কিংস রোডের মধ্যবর্তী এলাকায় নিকাশি ড্রেন দিয়ে ঠিকমতো জল বেরোতে পারছে না। পাম্প চালিয়েও দ্রুত জল নামানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বৃষ্টি থেমে গেলেও নিচু এলাকাগুলিতে জল আটকে রয়েছে।

উমেশের দাবি, হাওড়ার নিকাশি ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য যে মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে, তা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে এই ধরনের জলজটের সমস্যা অনেকটাই কমবে। প্রকল্পের জন্য ৪,৭০২ কোটি টাকা অনুমোদনের কথাও জানান তিনি। আগামী জানুয়ারি থেকে কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা নিয়েও ক্ষোভ

জল জমার পাশাপাশি উত্তর হাওড়ার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা বন্ধ থাকায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকায় পানীয় জল তোলা, মোটর চালানো এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়েছে।

এই বিষয়ে মন্ত্রীর ব্যাখ্যা, জলমগ্ন এলাকায় দুর্ঘটনা এড়াতেই সাময়িক ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। উত্তম ঘোষ লেন এবং সালকিয়ার একাধিক জায়গায় জল জমে থাকায় মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ পরিষেবা চালু করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে বাসিন্দাদের প্রশ্ন, নিরাপত্তার কারণ থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থা কেন করা হল না? বিদ্যুৎ বন্ধ থাকলে পানীয় জল এবং জরুরি পরিষেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের তরফে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

বিরোধীদের বক্তব্য, বিধানসভা নির্বাচনের আগে উমেশ রাই উত্তর হাওড়ার জলযন্ত্রণা থেকে মানুষকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তখন সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁকেই ধৈর্য ধরার আবেদন করতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের একটাই প্রশ্ন—আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে? মাস্টার প্ল্যান কবে বাস্তবায়িত হবে, কাজ শেষ হতে কত সময় লাগবে, আর তত দিন পর্যন্ত প্রতি বর্ষায় তাঁদের একই দুর্ভোগ পোহাতে হবে কি না, সেই উত্তরই এখন চাইছেন তাঁরা।

রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই উত্তর হাওড়ার মানুষের নজর এখন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। আপাতত জমা জল, ভাঙা রাস্তা এবং নোংরা নিকাশির মধ্যে দিয়েই দিন কাটছে এলাকার বাসিন্দাদের।

No Comments

তাজা খবর

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved