
নিউজ ডেস্ক; বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকে আরও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করে তুলতে এ বার বড় পরিসরে গণ-সচেতনতা অভিযান শুরু করল রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্ট ৩২৯১। ২০২৫ সালের উদ্যোগের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে এ বার প্রতিমা নির্মাণ থেকে বিসর্জন—পুজোর প্রতিটি পর্যায়ে পরিবেশরক্ষার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ মেনে চলার জন্য গাইডলাইন তৈরি করে এই উদ্যোগের অন্যতম অংশীদার হয়েছে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ।
সম্প্রতি আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে এই অভিযান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, দুর্গাপুজোর বিপুল আয়োজনের সঙ্গে পরিবেশরক্ষা, অর্থনীতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটানোই তাঁদের মূল লক্ষ্য। শুধু একটি মরসুমের প্রচার নয়, দীর্ঘমেয়াদে পুজো আয়োজনের ধরন বদলে দেওয়াই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
রোটারির এই কর্মসূচিতে সামিল হয়েছে রিসার্চ ইনস্টিটিউটস অফ দ্য গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিবেশবান্ধব উৎসবের একটি মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চান তাঁরা। সেই লক্ষ্যেই এ বার অন্তত একটি মডেল পুজো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রোটারির শরৎ স্বীকৃতি কমিটির চেয়ারম্যান সুমন গুহ বলেন, “এ বছর অন্তত একটি মডেল পুজো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।” তাঁর কথায়, সেই পুজোয় সৌরশক্তির ব্যবহার, বৃষ্টির জল বা ভূগর্ভস্থ জল রিচার্জের উপযোগী ব্যবস্থা এবং পুজোয় ব্যবহৃত ফুল থেকে জৈব সার তৈরির উদ্যোগ থাকবে। ভোগ ও কমিউনিটি লাঞ্চে সিঙ্গল ইউজ়ড প্লাস্টিকের পরিবর্তে মাটি ও পাতা দিয়ে তৈরি বাসন ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রতিমা নির্মাণের ক্ষেত্রেও পরিবেশবান্ধব উপকরণের উপরে জোর দেওয়া হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিমায় উদ্ভিদজাত এবং বিষমুক্ত জৈব রং ব্যবহার করা হবে। মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা, ভোগ বিতরণ এবং বিসর্জন—প্রতিটি পর্যায়েই বর্জ্য কমানো, পুনর্ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। মণ্ডপ তৈরির উপকরণ, প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট, ফুল এবং অন্যান্য সামগ্রী মিলিয়ে উৎসবের শেষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেই জায়গাতেই এ বার পরিকল্পিত ভাবে কাজ করতে চাইছে রোটারি।
উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, পুজোর আয়োজনের শুরু থেকেই বর্জ্য কমানোর ব্যবস্থা করা হলে শেষ পর্যায়ে চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার, এক বার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়ানো এবং ফুলের মতো জৈব বর্জ্য থেকে সার তৈরির উদ্যোগ সেই পরিকল্পনার অংশ। একই সঙ্গে সৌরশক্তির ব্যবহার এবং জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা পরিবেশবান্ধব পুজোর গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তি বা উপকরণ বদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পুজোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পুজোর সঙ্গে যুক্ত প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নও এই অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। প্রতিমাশিল্পী, কারিগর, পুরোহিত, থিমশিল্পী, বিদ্যুৎকর্মী, দৈনিক শ্রমিক, হকার, বিসর্জনকর্মী এবং সাফাইকর্মীদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, শুধু পুজোর সময় কিছু নির্দেশিকা মেনে চললেই হবে না। যাঁরা প্রতি বছর এই বিপুল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাঁদেরও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে তাঁদের জীবিকা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়েও ‘লং টার্ম বেসিস’-এ পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
রোটারির বক্তব্য, পরিবেশরক্ষার উদ্যোগ তখনই স্থায়ী রূপ পাবে, যখন এর সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলির জীবন ও জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। তাই সচেতনতা, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে একই পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে।
এই কাজে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নির্দেশিকা অনুসরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক সহায়তা নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে।
পুজো আয়োজনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবেশগত প্রভাব কমানোর জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিমা, মণ্ডপ, আলোকসজ্জা এবং বিসর্জনের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি কী ভাবে বাস্তবায়িত করা যায়, সেই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
উদ্যোক্তারা সরকারি সহযোগিতাও চেয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই ধরনের উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর করতে প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রকল্পের বাস্তবায়ন, স্থায়িত্ব এবং অন্য পুজো কমিটিগুলির মধ্যে এই মডেল ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে সাংবাদিক বৈঠকে।
এ বছর অন্তত একটি পুজোকে আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলাই রোটারির প্রধান লক্ষ্য। সেই পুজোয় পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাগুলির বাস্তব প্রয়োগ দেখিয়ে অন্য পুজো কমিটিগুলিকেও একই পথে উৎসাহিত করতে চান উদ্যোক্তারা।
তাঁদের আশা, একটি সফল মডেল তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে আরও পুজো কমিটি সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারবে। এর ফলে দুর্গাপুজোর মতো বৃহৎ উৎসবের সঙ্গে পরিবেশরক্ষার বিষয়টি আরও গভীর ভাবে যুক্ত হবে।
সব মিলিয়ে, এ বারের উদ্যোগে শুধু দূষণ কমানোর বার্তা নয়, পুজো আয়োজনের সামগ্রিক ধরন বদলের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রতিমা নির্মাণ থেকে বিসর্জন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে জল সংরক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে প্রান্তিক মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা—সব দিককে একসঙ্গে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব দুর্গাপুজোর মডেল গড়ে তুলতে চাইছে রোটারি। এখন দেখার, এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা সফল হয় এবং তার প্রভাব কতটা ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যের অন্য পুজো কমিটিগুলির মধ্যে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments