
নিউজ ডেস্ক; তারাপীঠ মন্দিরে মা তারার বিশেষ লাইনে দাঁড়িয়ে দর্শনের জন্য আর কাউন্টারে গিয়ে টিকিট কাটতে হবে না। পুণ্যার্থীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে এ বার সেই টিকিটের ব্যবস্থাই অনলাইনে নিয়ে আসছে জেলা প্রশাসন ও মন্দির কমিটি। অ্যান্ড্রয়েড অথবা আইফোনে অ্যাপের মাধ্যমে আগেভাগেই বিশেষ দর্শনের টিকিট কেটে নেওয়া যাবে। মন্দিরে পৌঁছে বিশেষ লাইনের কাউন্টারে মোবাইলে থাকা ডিজিটাল টিকিট দেখালেই দ্রুত দর্শনের সুযোগ পাবেন ভক্তেরা।
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে তারাপীঠে পুণ্যার্থীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের জন্য এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। এত দিন বিশেষ লাইনের টিকিট কাটতে মন্দির চত্বরে নির্দিষ্ট কাউন্টারে গিয়ে কুপন সংগ্রহ করতে হতো। ফলে ভিড়ের সময়ে অপেক্ষা, লাইনে দাঁড়ানো এবং টিকিট পাওয়ার অনিশ্চয়তা তৈরি হত। অনলাইন ব্যবস্থা চালু হলে বাড়ি থেকেই দর্শনের টিকিট বুক করা সম্ভব হবে।
রামপুরহাটের মহকুমা শাসক রাঠোর অশ্বিন বাবু সিং জানিয়েছেন, অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস—দুই ধরনের মোবাইল ব্যবহারকারীদের জন্য অ্যাপ তৈরির কাজ প্রায় শেষের দিকে। আগামী ৬ তারিখে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এই পরিষেবার উদ্বোধন করা হবে। তাঁর আশা, নতুন ব্যবস্থায় পুণ্যার্থীদের অনেকটাই সুবিধা হবে। প্রাথমিক ভাবে পরীক্ষামূলক ভাবে পরিষেবা চালু হলেও পরবর্তী সময়ে তা আরও বিস্তৃত করা হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় পুণ্যার্থীরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মূল্যের বিশেষ দর্শনের টিকিট কিনতে পারবেন। সেই টিকিটে থাকা তথ্য বা কিউআর কোড বিশেষ লাইনের কাউন্টারে দেখাতে হবে। কাউন্টার থেকে তা যাচাই করার পর দর্শনের জন্য নির্দিষ্ট লাইনে যাওয়ার সুযোগ মিলবে। ফলে কাগজের কুপন বহন করার প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে টিকিট হারিয়ে যাওয়ার সমস্যা থেকেও রেহাই মিলতে পারে।
তারাপীঠ মন্দিরে বিশেষ লাইনের জন্য বর্তমানে ৫০০ টাকার কুপন চালু রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় সেই কুপনই ডিজিটাল করা হচ্ছে। মন্দির কমিটির ধারণা, ডিজিটাল টিকিট চালু হলে টিকিট বিক্রি ও দর্শনের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে। কতগুলি টিকিট বিক্রি হচ্ছে, কোন সময়ে কত জন পুণ্যার্থী বিশেষ দর্শনের সুযোগ নিচ্ছেন এবং কত টাকা জমা পড়ছে—এই সব তথ্য সহজে নথিভুক্ত করা সম্ভব হবে।
বিশেষ লাইনের টিকিটের মূল্য নিয়ে অতীতে নানা অভিযোগ উঠেছিল। পুণ্যার্থীদের একাংশের অভিযোগ ছিল, বিশেষ দর্শনের জন্য কখনও ৫০০ টাকা, কখনও ১,০০০ টাকা, এমনকি ২,০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও সেই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও টিকিটের মূল্য ও বিক্রির পদ্ধতি নিয়ে ভক্তদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। নতুন ব্যবস্থা সেই বিতর্ক এড়াতে সাহায্য করবে বলে মনে করছে মন্দির কমিটি।
প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর তারাপীঠ মন্দিরের পরিচালন ব্যবস্থাতেও বদল আসে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্দির কমিটি ভেঙে দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। পরবর্তী সময়ে নতুন মন্দির কমিটি গঠন করে বিশেষ লাইনের জন্য নির্দিষ্ট ৫০০ টাকার কুপন চালু করা হয়। সেই ব্যবস্থায় একাধিক দামের কুপনের বদলে একটি নির্দিষ্ট মূল্য রাখা হয়েছে। এ বার সেই কুপনকেই অনলাইন ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে।
মন্দির কমিটির বক্তব্য, নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করলে আর্থিক অনিয়মের সুযোগও কমবে। অনলাইনে টিকিট কাটার ক্ষেত্রে প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড থাকবে। ফলে টিকিট বিক্রির হিসাব রাখা সহজ হবে। একই সঙ্গে ভক্তদের কাছ থেকেও নির্দিষ্ট মূল্যের বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগের সম্ভাবনা কমবে। তবে নতুন ব্যবস্থায় কোনও অতিরিক্ত চার্জ থাকবে কি না, টিকিট বাতিল বা তারিখ পরিবর্তনের নিয়ম কী হবে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়নি।
তারাপীঠে সারা বছরই পুণ্যার্থীদের ভিড় থাকে। বিশেষ করে শনিবার, মঙ্গলবার, অমাবস্যা, কৌশিকী অমাবস্যা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের সময়ে মন্দির চত্বরে ভিড় অনেক বেড়ে যায়। সেই সময়ে সাধারণ লাইন ও বিশেষ লাইনের ব্যবস্থাপনা সামলানো প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অনলাইন টিকিট চালু হলে বিশেষ লাইনে কত জন ভক্ত আসবেন, তা আগেভাগে বোঝা সম্ভব হবে। এতে ভিড় নিয়ন্ত্রণেও সুবিধা হতে পারে।
তবে অনলাইন পরিষেবা চালু হলেও সব পুণ্যার্থীর হাতে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট পরিষেবা নাও থাকতে পারে। তাই মন্দির চত্বরে অফলাইন টিকিটের ব্যবস্থা থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বয়স্ক ভক্ত, গ্রামাঞ্চল থেকে আসা মানুষ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভ্যস্ত পুণ্যার্থীদের কথা মাথায় রেখে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে। প্রশাসনের তরফে এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা উদ্বোধনের পরই স্পষ্ট হবে।
মন্দির কমিটির আশা, ডিজিটাল টিকিট চালু হলে এক দিকে পুণ্যার্থীদের সময় বাঁচবে, অন্য দিকে বিশেষ দর্শনের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আসবে। কাউন্টারে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা না করে ভক্তেরা আগেই টিকিট কেটে নির্দিষ্ট সময়ে মন্দিরে পৌঁছতে পারবেন। এতে মন্দির চত্বরের ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে।
আগামী ৬ তারিখে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে পরিষেবা চালু হওয়ার পর তার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা হবে। কোথাও প্রযুক্তিগত সমস্যা হচ্ছে কি না, টিকিট বুকিংয়ে অসুবিধা হচ্ছে কি না, কিংবা কাউন্টারে ডিজিটাল টিকিট যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত হচ্ছে—সবই পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হতে পারে। আপাতত তারাপীঠে বিশেষ দর্শনের টিকিট ব্যবস্থাকে আরও সহজ, নির্দিষ্ট এবং স্বচ্ছ করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments