
নিউজ ডেস্ক: ঘটনার প্রায় ৫৭ দিনের মাথায় বারুইপুরের সূর্যপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় চার্জশিট জমা দিল পুলিশ। বিশেষ পকসো আদালতে তিন খণ্ডে মোট ৭০২ পাতার চার্জশিট পেশ করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। চার অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের একাধিক ধারা এবং পকসো আইনে মামলা রুজু করে তদন্তকারীরা চার্জশিট জমা দিয়েছেন। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন এনকাউন্টারে নিহত প্রভাস মণ্ডলও।
তবে চার্জশিট জমা পড়লেও তদন্তের সমস্ত দিক এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে জানা যাচ্ছে। ফরেন্সিক, ব্যালিস্টিক এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট পরীক্ষার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট এখনও তদন্তকারীদের হাতে পৌঁছয়নি। সেই রিপোর্টগুলি পাওয়ার পর মামলার তদন্তে নতুন কোনও তথ্য সামনে এলে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূরক চার্জশিট জমা দেওয়া হতে পারে।
বারুইপুর থানার মামলা নম্বর ১৩৫০/২৬-এর ভিত্তিতে তদন্ত এগোয়। চার্জশিট নম্বর ১৪০৮/২৬ অনুযায়ী ৩১ অগস্ট ২০২৬ সালে বারুইপুরের বিশেষ পকসো আদালতে চার্জশিট পেশ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীদের জমা দেওয়া নথিতে চার অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারার পাশাপাশি পকসো আইনের ৬ নম্বর ধারাও যুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে দাবি, নাবালিকার উপর সংঘটিত অপরাধের তদন্তে বিভিন্ন সাক্ষ্য, তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহের পর এই চার্জশিট তৈরি করা হয়েছে। মামলার চার অভিযুক্তের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রভাস মণ্ডল নামে ওই অভিযুক্ত ঘটনাস্থলে পুনর্নির্মাণের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছেন বলে তদন্তের সঙ্গে যুক্ত সূত্রে জানা গিয়েছে। যদিও তাঁর মৃত্যুর পরেও মূল ঘটনার তদন্ত এবং অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
সূর্যপুরের এই ঘটনায় নাবালিকার পরিচয় আইন অনুযায়ী গোপন রাখা হয়েছে। পকসো আইনের বিধান মেনে তদন্ত এবং সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও নির্যাতিতার নাম, ছবি বা এমন কোনও তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না, যার মাধ্যমে তাঁর পরিচয় প্রকাশ্যে চলে আসতে পারে।
এই নৃশংস ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। ঘটনার পরে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেয় রাজ্য প্রশাসন। মৃত নাবালিকার পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর বাবাকে কারা দফতরে চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
নিহত ছাত্রীর বাবা জানিয়েছেন, পরিবারের উপর নেমে আসা ভয়াবহ ঘটনার পরে তাঁর মানসিক পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক নয়। পরিস্থিতি কিছুটা সামলে উঠতে পারলে তিনি নতুন দায়িত্বে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। পরিবারের প্রতি প্রশাসনিক সহায়তা এবং মামলার দ্রুত তদন্ত— দুই বিষয়ই শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল।
ঘটনার পরে নিহত নাবালিকার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। পরিবারের বক্তব্য শোনার পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের তদন্ত এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়।
এই মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার এবং তদন্তের পাশাপাশি অন্য একটি ঘটনার জেরে রাজনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি হয়েছিল বারুইপুরে। নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি এবং পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে সিপিএম নেতা লাহেক আলিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে অসুস্থ মায়ের দেখভালের কারণ দেখিয়ে তাঁর জামিনের আবেদন করা হয়।
কলকাতা হাই কোর্ট নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাঁকে জামিন মঞ্জুর করেছে বলে জানা গিয়েছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁর জামিনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে লাহেক আলির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাটি নাবালিকা ধর্ষণ-খুন মামলার তদন্ত থেকে পৃথক বিষয় বলেই আইনজীবী মহলের একাংশের মত।
এ দিকে মূল মামলায় চার্জশিট জমা পড়ায় তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হল। কিন্তু ফরেন্সিক এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার রিপোর্ট এখনও বাকি থাকায় তদন্তের নথিতে ভবিষ্যতে আরও তথ্য যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তদন্তকারীরা ওই রিপোর্টগুলির অপেক্ষায় রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন গুরুতর অপরাধের মামলায় ফরেন্সিক, ব্যালিস্টিক এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিপোর্ট আদালতে প্রমাণের গুরুত্ব বহন করতে পারে। ফলে বাকি রিপোর্ট হাতে আসার পর তদন্তকারীরা নতুন করে তথ্য যাচাই করবেন। প্রয়োজন হলে আদালতে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটও পেশ করা হতে পারে।
ঘটনার মাত্র ৫৭ দিনের মধ্যে তিন খণ্ডে ৭০২ পাতার চার্জশিট জমা দেওয়াকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এখন আদালতের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকে নজর থাকবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণের দায় অবশ্য শেষ পর্যন্ত আদালতে প্রসিকিউশনের উপরই থাকবে।
বারুইপুরের সূর্যপুরের এই ঘটনা ঘিরে যে ক্ষোভ এবং উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, চার্জশিট জমা পড়ার পরে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগোয় কি না, এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বাকি বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট হাতে আসার পর তদন্তে নতুন কোনও তথ্য সামনে আসে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments