
নিউজ ডেস্ক: যাত্রী নিরাপত্তা ও পরিষেবার মান আরও উন্নত করতে প্রযুক্তিনির্ভর একাধিক পদক্ষেপ করল পূর্ব রেলের হাওড়া ডিভিশন। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা থেকে স্টেশন আলোকসজ্জা, জল নিষ্কাশন থেকে এস্কেলেটর নজরদারি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ট্রেনের AC কোচের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং দূর থেকে যন্ত্রপাতির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও পরীক্ষামূলক ভাবে চালু করা হয়েছে। রেলের দাবি, এই উদ্যোগগুলির ফলে যাত্রী পরিষেবা যেমন আরও স্বচ্ছন্দ হবে, তেমনই পরিচালন ব্যবস্থার দক্ষতাও বাড়বে।
পূর্ব রেলের হাওড়া ডিভিশনের ইলেকট্রিক্যাল (জেনারেল) বিভাগ যাত্রী সুবিধা, শক্তি সাশ্রয় এবং রেল পরিষেবার নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একাধিক কাজ করেছে। ডিভিশন সূত্রে জানানো হয়েছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে মোট ২,৪২৫টি GPRS/RF-ভিত্তিক স্মার্ট এনার্জি মিটার বসানো হয়েছে।
এই ধরনের স্মার্ট মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য আরও কার্যকর ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। ফলে কোথায় কতটা বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, কোথাও অস্বাভাবিক ব্যবহার হচ্ছে কি না কিংবা শক্তি ব্যবস্থাপনায় কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন—সেসব বিষয়ে দ্রুত নজর দেওয়া যায়। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছে রেল।
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আজিমগঞ্জ, কাটোয়া, বর্ধমান, হাওড়া এবং ব্যান্ডেল কলোনি এলাকায় মোট ৯.৮৫ কিলোমিটার ওভারহেড LT লাইন ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে। খোলা জায়গায় থাকা বিদ্যুৎ লাইনের তুলনায় ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ এবং পরিকাঠামোগত দিক থেকেও সুবিধাজনক। বিশেষ করে জনবহুল স্টেশন বা রেল কলোনির এলাকায় এই ধরনের ব্যবস্থা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
যাত্রীদের সরাসরি সুবিধার জন্যও একাধিক পদক্ষেপ করা হয়েছে। হাওড়া ডিভিশনের বিভিন্ন স্টেশনে মোট ১৬৪টি ওয়াটার কুলার বসানো হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
স্টেশন এবং গুডস ইয়ার্ডের আলো ব্যবস্থাতেও বড়সড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। মোট ৭৪টি হাই মাস্ট টাওয়ারে ৩০০ ওয়াটের LED ফ্লাডলাইট বসানো হয়েছে। পাশাপাশি ১৫৫টি স্টেশনে LED ব্যাটেন, স্ট্রিট লাইট এবং ট্রাঙ্ক লাইট ব্যবহারের মাধ্যমে আলোকসজ্জার উন্নতি করা হয়েছে।
রেলের মতে, পর্যাপ্ত আলো শুধু যাত্রীদের চলাচলকে সহজ করে না, স্টেশনের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্ধকার বা কম আলোযুক্ত জায়গা কমানো গেলে যাত্রীদের দৃশ্যমানতা বাড়ে এবং রাতে স্টেশন চত্বরে নজরদারি চালানোও সহজ হয়।
যাত্রী পরিষেবার পরিকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে তারকেশ্বর স্টেশনেও নতুন ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে তৈরি হওয়া ১২ মিটার দীর্ঘ ফুট ওভার ব্রিজের কনকোর্স এলাকায় ৪০ ওয়াটের ৫৬টি LED ট্রাঙ্ক লাইট বসানো হয়েছে। রেলের দাবি, এর ফলে ওই অংশে আলোর মাত্রা বা lux level বাড়ার পাশাপাশি স্টেশনের সামগ্রিক পরিবেশও আরও উন্নত হয়েছে।
ফুট ওভার ব্রিজের মতো যাত্রী চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পর্যাপ্ত আলো থাকা বিশেষ ভাবে জরুরি। রাতে প্ল্যাটফর্ম পরিবর্তন বা স্টেশনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াতের সময় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়াতে সাহায্য করে।
বর্ষায় জল জমার সমস্যা মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে হাওড়া ডিভিশন। EMU কারশেড, ঝিল সাইডিং টিকিয়াপাড়া এবং সালকিয়া এলাকায় থাকা ৮টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেনেজ পাম্পকে রাডার সেন্সর এবং LoRa কমিউনিকেশন নোডের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার মূল ধারণা হল—জলের পরিস্থিতি সেন্সরের মাধ্যমে শনাক্ত করা, সেই তথ্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় পাঠানো, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। অর্থাৎ Sense–Transmit–Monitor–Respond পদ্ধতিতে পাম্প পরিচালনার ফলে মানুষের উপর নির্ভরতা কমবে।
বর্ষার সময় রেল এলাকায় জল জমে গেলে ট্রেন চলাচল এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজে সমস্যা হতে পারে। স্বয়ংক্রিয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা সেই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে বলে রেলের আশা। একই সঙ্গে পাম্প চালু করার ক্ষেত্রে দেরি কমবে এবং কর্মীদের ম্যানুয়াল নজরদারির চাপও কমবে।
বর্ধমান স্টেশনে যাত্রী চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এস্কেলেটরগুলির নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে চালু হয়েছে Escalator Fault Alert & Monitoring System। বিভাগীয় ভাবে এবং তুলনামূলক কম খরচে তৈরি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্তমানে ১০টি এস্কেলেটর রিয়েল-টাইমে নজরদারির আওতায় রয়েছে।
কোনও এস্কেলেটরে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে প্রথমে প্যানেল লাইটের মাধ্যমে সংকেত পাওয়া যাবে। তার সঙ্গে থাকবে audible alarm বা শ্রুতিসংকেত। এরপর CCTV-র সাহায্যে সমস্যাটি যাচাই করা হবে। প্রয়োজনে দ্বিতীয় পর্যায়ের যাচাইয়ের জন্য IR-NIYANTRAC ব্যবস্থার সাহায্য নেওয়া হবে।
Watch–Alert–Verify–Escalate—এই চারটি ধাপকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে কোনও ত্রুটি দেখা দিলে সেটি দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
শুধু স্টেশন নয়, চলন্ত ট্রেনের যাত্রী পরিষেবাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। Coach 261135-এ AC Coach Remote Monitoring System-এর সফল পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থায় RDSO-অনুমোদিত VENUS মাইক্রোকন্ট্রোলারকে একটি cellular router-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোচের Roof Mounted Package Units বা RMPU-এর কার্যকলাপ দূর থেকেই রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
রেলের মতে, এর ফলে যন্ত্রে কোনও সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই তার সম্ভাব্য লক্ষণ চিহ্নিত করা যেতে পারে। অর্থাৎ preemptive maintenance বা আগাম রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে Rail Madad-এর মাধ্যমে আসা AC সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত চিহ্নিত ও নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থা সহায়ক হতে পারে।
ট্রেনের ভিতরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখাও এই প্রযুক্তির অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রায় AC কোচের তাপমাত্রা ঠিকঠাক থাকা যাত্রীদের আরামের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পূর্ব রেলের দাবি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে জল নিষ্কাশন, স্টেশন আলোকসজ্জা, এস্কেলেটর এবং ট্রেনের AC পরিষেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে যাত্রী নিরাপত্তা, পরিষেবার নির্ভরযোগ্যতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষতা একসঙ্গে উন্নত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝি জানিয়েছেন, যাত্রী নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই পরিষেবার আধুনিকীকরণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হাওড়া ডিভিশনে পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ধারাবাহিক এই উন্নয়ন রেলযাত্রাকে আরও নিরাপদ, দক্ষ এবং আরামদায়ক করার প্রচেষ্টারই অংশ বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে, প্ল্যাটফর্মের আলো থেকে শুরু করে এস্কেলেটরের নজরদারি কিংবা বর্ষার জল নিষ্কাশন—হাওড়া ডিভিশনের এই উদ্যোগগুলির লক্ষ্য একটাই: প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে রেল পরিষেবাকে আরও নিরাপদ এবং যাত্রীবান্ধব করে তোলা। আগামী দিনে এই ধরনের স্মার্ট প্রযুক্তি আরও বেশি স্টেশন এবং কোচে যুক্ত হলে দৈনন্দিন রেলযাত্রায় তার প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে বলেই মনে করছে রেল কর্তৃপক্ষ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments