Homeমালদাবেঙ্গালুরু থেকে মালদায় ৩১ বাংলাদেশি, অনুপ্রবেশের অভিযোগে তদন্তে পুলিশ

বেঙ্গালুরু থেকে মালদায় ৩১ বাংলাদেশি, অনুপ্রবেশের অভিযোগে তদন্তে পুলিশ

নিউজ ডেস্ক; ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েও মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিলেন কয়েক জন তরুণী। কারও হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, কারও পরনে জিন্স
resizeplus_IMG-20260902-WA0018

নিউজ ডেস্ক; ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েও মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিলেন কয়েক জন তরুণী। কারও হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, কারও পরনে জিন্স ও টপ। তাঁদের দেখে সীমান্ত পেরিয়ে আসা অনুপ্রবেশকারী বলে বোঝার উপায় ছিল না বলেই দাবি পুলিশের। কিন্তু বেঙ্গালুরুতে বেআইনি ভাবে বসবাসের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে ৩১ জন বাংলাদেশিকে মালদায় নিয়ে এল কর্নাটক পুলিশ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ১১ জন মহিলা ও তরুণী, ১৭ জন পুরুষ এবং তিন শিশু।

বেঙ্গালুরু পুলিশের একটি দল মঙ্গলবার প্রায় মধ্যরাতে ওই বাংলাদেশিদের মালদা টাউন স্টেশনে নিয়ে আসে। পরে তাঁদের ইংরেজবাজার শহরের একটি হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁদের বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হতে পারে। তবে তার আগে তাঁদের পরিচয়, ভারতে প্রবেশের পথ, বেঙ্গালুরুতে থাকার ব্যবস্থা এবং দালালচক্রের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশের দাবি, কর্নাটকের কোরামঙ্গলা, জয়ানগর, মলেশ্বরম, শিবদাপুর এবং রাজানগর থানা এলাকায় একাধিক অভিযান চালিয়ে ওই ৩১ জনকে চিহ্নিত করা হয়। ধৃতদের অধিকাংশের বাড়ি বাংলাদেশের রাজশাহী এবং যশোহর এলাকায়। অভিযোগ, তাঁরা ভিন্ন নামে বেঙ্গালুরুতে বসবাস করছিলেন। কয়েক জনের কাছে নকল আধার কার্ডও পাওয়া গিয়েছে বলে পুলিশের দাবি। যদিও ওই নথিগুলি কী ভাবে তৈরি হয়েছিল, কারা সরবরাহ করেছিল এবং এর পিছনে কোনও বড় চক্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

প্রাথমিক জেরায় মালদার নাম উঠে আসায় তাঁদের এই জেলায় নিয়ে আসা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেঙ্গালুরু পুলিশের এক আধিকারিক কে আনাপ্পা। তাঁর বক্তব্য, কর্নাটকের পাঁচটি থানা এলাকায় অভিযান চালানোর পর ৩১ জনের সন্ধান মেলে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, অনেকেই মালদার সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। এরপর দালালদের সাহায্যে তাঁরা বেঙ্গালুরুতে পৌঁছন। সেই কারণেই তাঁদের মালদা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

পুলিশি জেরায় ধৃত দুই তরুণী দাবি করেছেন, প্রায় আট মাস আগে তাঁরা আরও কয়েক জনের সঙ্গে মালদার সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রত্যেকের কাছ থেকে দালালরা প্রায় ২০ হাজার টাকা নিয়েছিল। পরে বেঙ্গালুরু পৌঁছনোর জন্য আরও টাকা দিতে হয়। সেখানে গিয়ে কেউ শপিংমলে, কেউ রেস্তোরাঁয় কাজ নেন। তাঁদের দাবি, ভারতে এসে কাজ করে নিয়মিত উপার্জন করছিলেন তাঁরা।

যশোহর জেলার বাসিন্দা আব্দুল করিম এবং আব্বাস শেখও জেরায় জানিয়েছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁদের রোজগারের পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়। কাজের সন্ধানেই দালালচক্রের মাধ্যমে তাঁরা ভারতে এসেছিলেন বলে দাবি করেছেন। বেঙ্গালুরুতে গত কয়েক মাস ধরে তাঁরা কাজ করছিলেন। তবে পুলিশের বক্তব্য, শুধুমাত্র কাজের জন্যই তাঁরা ভারতে এসেছিলেন, নাকি অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তাঁদের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

মালদা জেলা পুলিশের একাংশের ধারণা, সীমান্ত পারাপারের এই ঘটনায় একাধিক দালাল যুক্ত থাকতে পারে। সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবহার করে বাংলাদেশিদের ভারতে ঢোকানো, ভুয়ো নথি তৈরি করা এবং পরে দেশের বিভিন্ন শহরে পাঠানোর একটি সংগঠিত ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মালদা থেকে বেঙ্গালুরু পর্যন্ত তাঁদের যাতায়াতের পথ, যাঁরা টাকা নিয়েছিলেন এবং বেঙ্গালুরুতে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন, তাঁদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তবে ধৃতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে কি না, তাঁদের প্রত্যেকের পরিচয়পত্র যাচাই হয়েছে কি না, এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ কী হবে—এই বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিশুদের সঙ্গে কেন তাঁরা সীমান্ত পেরিয়েছিলেন, তারা পরিবারের সদস্য কি না, নাকি অন্য কোনও উদ্দেশ্যে তাদের সঙ্গে আনা হয়েছিল, তা নিয়েও তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন আধিকারিকেরা।

মালদা সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ পারাপার এবং দালালচক্রের অভিযোগে আলোচনায় রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকার দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং দ্রুত উপার্জনের প্রলোভনকে কাজে লাগিয়ে দালালরা বহু মানুষকে দেশের বাইরে বা অন্য রাজ্যে পাঠানোর চেষ্টা করে বলে অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের হাতে ভুয়ো পরিচয়পত্র তুলে দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন শহরে শ্রমিক, গৃহসহায়ক, রেস্তোরাঁকর্মী কিংবা ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়া হয়।

এই ঘটনায়ও একই ধরনের কোনও চক্র কাজ করেছে কি না, তা স্পষ্ট করতে তদন্ত চালাচ্ছে বেঙ্গালুরু ও মালদা পুলিশ। ধৃতদের কাছ থেকে পাওয়া মোবাইল ফোন, নথি এবং যোগাযোগের তালিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁদের জেরা করে আরও কোনও ব্যক্তি বা দালালের নাম উঠে আসে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে তদন্তকারীদের।

মঙ্গলবার রাতে মালদায় আনার পর আপাতত হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে ৩১ জনকে। তাঁদের নিরাপত্তা, খাবার এবং চিকিৎসার বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেনে তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে না।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved