
নিউজ ডেস্ক: আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসক-পড়ুয়ার মৃত্যুর পর তাঁর দেহ দ্রুত দাহ করা হয়েছিল বলে যে অভিযোগ উঠেছিল, সেই সংক্রান্ত পৃথক মামলায় এ বার তৃতীয় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করল পুলিশ। বেঙ্গালুরু থেকে গ্রেফতার করা হল পানিহাটি পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সোমনাথ দে-কে। তদন্তকারীদের দাবি, নতুন এফআইআর দায়ের হওয়ার পর থেকে তাঁর খোঁজ মিলছিল না। অবশেষে ভিন্রাজ্য থেকে তাঁকে আটক করতে সক্ষম হল খড়দহ থানার পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রেফতারের পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া মিটিয়ে সোমনাথকে ট্রানজিট রিমান্ডে পশ্চিমবঙ্গে আনা হবে। তার পর তাঁকে ব্যারাকপুর আদালতে হাজির করানোর কথা। তদন্তকারীরা তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন বলে সূত্রের খবর।
আরজি কর কাণ্ডের প্রেক্ষিতে নির্যাতিতার পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে এই মামলা দায়ের হয়েছিল। পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হয়েছিল, তরুণী চিকিৎসক-পড়ুয়ার দেহ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দাহ করা হয়েছিল। সেই ঘটনার নেপথ্যে কোনও নিয়মবহির্ভূত তৎপরতা ছিল কি না এবং তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার কোনও চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
এই মামলায় এর আগে আরও দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পানিহাটির প্রাক্তন বিধায়ক নির্মল ঘোষ এবং প্রাক্তন কাউন্সিলর তথা নির্যাতিতার পরিবারের পরিচিত সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নির্মলকে ওড়িশার পুরী সংলগ্ন এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অন্য দিকে, কলকাতার চিনার পার্ক এলাকা থেকে সঞ্জীবকে আটক করা হয়।
দুই অভিযুক্তই পরে এই মামলায় জামিন পেয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে অন্য একটি মামলায় নির্মল ঘোষ এখনও জেলবন্দি রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এ বার তৃতীয় অভিযুক্ত হিসেবে সোমনাথ দে-র গ্রেফতার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করল।
নতুন এফআইআর দায়ের হওয়ার পর থেকেই সোমনাথের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না এবং তিনি একাধিক জায়গায় অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। এমনকি যোগাযোগ এড়াতে একাধিক ফোন নম্বর ব্যবহার করার অভিযোগও উঠে এসেছে। যদিও এই অভিযোগগুলির তদন্ত এখনও চলছে এবং এ বিষয়ে সোমনাথের বক্তব্য প্রকাশ্যে জানা যায়নি।
তদন্তকারীদের কাছে সোমনাথ দে-র নাম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পানিহাটির শ্মশান সংক্রান্ত কিছু নথি এবং রিকুইজিশনের সূত্র ধরে। পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, দেহদাহের পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁর কোনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল কি না। নির্যাতিতার দেহ দ্রুত দাহ করার ঘটনায় তিনি কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত ছিলেন কি না, অথবা তথ্যপ্রমাণ সংক্রান্ত কোনও বিষয়ে তাঁর ভূমিকা ছিল কি না— সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
এই মামলার সূত্রপাত হয় আরজি করের তরুণী চিকিৎসক-পড়ুয়ার মৃত্যুর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এক স্মরণসভা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পর। গত ৯ অগস্ট পানিহাটিতে একটি স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী বলা ঠিক নয়; শুভেন্দু বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা।
ওই কর্মসূচির পর পানিহাটির শ্মশানঘাটে নির্যাতিতার দেহদাহের সময় ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের দাবি ওঠার পর নির্যাতিতার পরিবার থানার দ্বারস্থ হয়। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতেই খড়দহ থানায় এফআইআর রুজু করা হয়।
অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হওয়ার পর পুলিশ নির্মল ঘোষ, সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় এবং সোমনাথ দে— এই তিন জনের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে শুরু করে। দুই জনকে আগেই গ্রেফতার করা হয়েছিল। সোমনাথের গ্রেফতারের পর তদন্তকারীরা এখন তিন অভিযুক্তের ভূমিকা এবং ঘটনার সময় তাঁদের পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে পারেন।
তবে এই মামলার তদন্ত এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। অভিযোগগুলি আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হবে। পুলিশ ও তদন্তকারীদের পরবর্তী পদক্ষেপ, সোমনাথকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং শ্মশান সংক্রান্ত নথিপত্রের আরও বিশদ পরীক্ষা— সব মিলিয়ে মামলাটি আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সে দিকে নজর থাকবে।
আরজি কর কাণ্ডকে ঘিরে একের পর এক আইনি ও তদন্তগত প্রশ্ন সামনে এসেছে গত দুই বছরে। নির্যাতিতার পরিবারের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে নতুন মামলার এই তদন্ত রাজনৈতিক এবং সামাজিক— দুই ক্ষেত্রেই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বেঙ্গালুরু থেকে সোমনাথ দে-র গ্রেফতার সেই তদন্তে আপাতত বড় অগ্রগতি হিসেবেই দেখছে তদন্তকারী মহল। তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে আনার পর জিজ্ঞাসাবাদে কী নতুন তথ্য সামনে আসে এবং নির্যাতিতার দেহ দ্রুত দাহের অভিযোগে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে তদন্তকারীরা কী সিদ্ধান্তে পৌঁছন, এখন সেই উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments