
নিউজ ডেস্ক: নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ধ্বংসস্তূপের উপর দিয়ে একের পর এক উড়ান। বিশ্রামের সুযোগ প্রায় নেই। দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকায় আটকে থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে টানা কয়েক দিন ধরে আকাশপথে উদ্ধার অভিযানে ব্যস্ত নেপালের প্রথম মহিলা হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন প্রিয়া অধিকারী।
সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের মধ্যে মাত্র ছ’দিনে প্রায় ১০০টি উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন প্রিয়া। বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলার তিমুরে-সহ একাধিক দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে তিনি এবং অন্য হেলিকপ্টার চালকেরা নিরলস কাজ করে চলেছেন। নেপালে ভয়াবহ এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে এবং এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তিমুরে অঞ্চলটি এখন উদ্ধারকাজের অন্যতম কেন্দ্র। পাহাড়ি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত, বহু জায়গায় ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ এবং প্রবল স্রোত স্থলপথে উদ্ধার অভিযানকে কঠিন করে তুলেছে। সেই পরিস্থিতিতে হেলিকপ্টারই হয়ে উঠেছে দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছোনোর অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
প্রিয়া জানিয়েছেন, ছোট একটি উপত্যকায় একই সময়ে প্রায় ২০টি হেলিকপ্টারের সমন্বয় করে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক সময় পাঁচ-ছ’টি হেলিকপ্টার একই এলাকায় অবতরণের চেষ্টা করছে। ফলে আকাশে চলাচল, রেডিও যোগাযোগ এবং নিরাপদ অবতরণের সিদ্ধান্ত— সব কিছুই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে চালকদের।
আরও বড় সমস্যা তৈরি করেছে বন্যার পরে জমে থাকা পুরু কাদা। উপর থেকে অনেক জায়গা শক্ত জমির মতো মনে হলেও বাস্তবে মাটি অত্যন্ত নরম ও অস্থিতিশীল। ফলে হেলিকপ্টার অবতরণের সময় বিশেষ সতর্ক থাকতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও মাটির পরিস্থিতির কারণে ইঞ্জিন বন্ধ না করেই উদ্ধারকাজ চালাতে হচ্ছে বলে প্রিয়ার অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে।
টানা উড়ানের চাপে ক্লান্তি যে নেই, তা নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রিয়া স্বীকার করেছেন, লাগাতার উদ্ধার অভিযানে তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা অত্যন্ত ক্লান্ত। কিন্তু ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও উদ্ধার অভিযান থামানোর উপায় নেই। কারণ এখনও বহু মানুষ দুর্গম এলাকায় আটকে রয়েছেন।
প্রিয়ার কাছে এই বিপর্যয় নতুন নয়, তবে এর ব্যাপকতা তাঁকে গভীর ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। বহু বছর ধরে হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টার চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। আহত পর্বতারোহীদের উদ্ধার থেকে শুরু করে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে জরুরি উড়ান— নানা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।
প্রিয়ার বিমানচালক হওয়ার পথও ছিল ব্যতিক্রমী। পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার পর কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করেন। পরে হেলিকপ্টারে উড়ানের অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মধ্যে পাইলট হওয়ার আগ্রহ জন্মায়। বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য ফিলিপিন্সে যান এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৭ সালে পূর্ণকালীন হেলিকপ্টার চালক হিসেবে কাজ শুরু করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হিমালয়ের উঁচু এলাকায় হেলিকপ্টার চালানো এমনিতেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিকূল আবহাওয়া, কম দৃশ্যমানতা, সরু উপত্যকা এবং অস্থিতিশীল পাহাড়ি ভূখণ্ড পাইলটদের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তোলে। আর বন্যা ও ভূমিধসের পরে সেই চ্যালেঞ্জ আরও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।
তবু প্রিয়া থামেননি।
বিপর্যস্ত উপত্যকার উপর দিয়ে বার বার উড়ে গিয়ে তিনি পৌঁছে যাচ্ছেন আটকে থাকা মানুষদের কাছে। উদ্ধার হওয়া প্রতিটি জীবিত মানুষ যেন তাঁর কাছে নতুন আশার প্রতীক।
আজ নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে প্রিয়া অধিকারী শুধুই একজন দক্ষ হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন নন। দুর্গত মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন আকাশ থেকে নেমে আসা আশার আলো— এক নিরলস উদ্ধারযোদ্ধা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments