
নিউজ ডেস্ক; দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে ফের বিক্ষোভের মুখে পড়লেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। মঙ্গলবার নদিয়ার চাপড়ার এলেম নগরে যাওয়ার পথে তাঁর গাড়ি ঘিরে কালো পতাকা দেখানোর পাশাপাশি ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে হয় পুলিশকে। পরে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিয়ে সাংসদের গাড়ি এগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
মহুয়া মৈত্রের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা বিজেপি কর্মী-সমর্থক। তাঁর দাবি, পরিকল্পিত ভাবে রাস্তার উপর বাস দাঁড় করিয়ে যান চলাচলে বাধা তৈরি করা হয়েছিল। সেই পথেই তিনি দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। আচমকা তাঁর গাড়িকে ঘিরে ধরে হাতে কালো পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়। স্লোগানও দেওয়া হয় তাঁকে উদ্দেশ করে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
অন্য দিকে, বিজেপির তরফে মহুয়ার অভিযোগ খারিজ করে পাল্টা দাবি করা হয়েছে, এলাকায় অশান্তি তৈরি করার চেষ্টা করছেন তৃণমূল সাংসদই। বিজেপি নেতা খলিল শেখের বক্তব্য, মহুয়ার বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই প্রতিবাদ হয়েছে বলে দাবি তাঁর। আগামী দিনেও এই ধরনের বিক্ষোভ চলবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত এমন একটি সময়, যখন নদিয়ার তেহট্ট-১ পঞ্চায়েত সমিতিতে তৃণমূলের অন্দরে সাংগঠনিক টানাপোড়েন নিয়ে জোর চর্চা চলছে। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তেহট্ট-১ পঞ্চায়েত সমিতির ছয় তৃণমূল সদস্যকে ছ’বছরের জন্য দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ওই সিদ্ধান্তের পর স্থানীয় রাজনীতিতে জল্পনা শুরু হয়। তার পরের দিনই চাপড়ায় দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দিতে পৌঁছন মহুয়া।
তবে কর্মসূচির গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মহুয়ার অভিযোগ অনুযায়ী, এলেম নগরের কাছে তাঁর গাড়ির পথ আটকে দেওয়া হয়। রাস্তায় একটি বাস দাঁড় করিয়ে কার্যত ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি তাঁর। এরপর বিক্ষোভকারীরা হাতে কালো পতাকা নিয়ে গাড়ির সামনে ও আশপাশে দাঁড়িয়ে পড়েন। তাঁকে উদ্দেশ করে ‘গো ব্যাক’ স্লোগানও দেওয়া হয়।
বিক্ষোভের খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় আরও লোকজন জড়ো হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বুঝে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশি হস্তক্ষেপেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানা গিয়েছে। এরপর মহুয়ার গাড়ি দলীয় কর্মসূচির দিকে এগিয়ে যায়।
তৃণমূল সাংসদ অবশ্য এই ঘটনাকে নিছক স্থানীয় প্রতিবাদ হিসেবে দেখতে নারাজ। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরাই পরিকল্পিত ভাবে এই বিক্ষোভ সংগঠিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দলীয় কর্মসূচিতে যাওয়ার সময় রাস্তায় বাস দাঁড় করিয়ে দেওয়া এবং গাড়ি ঘিরে কালো পতাকা দেখানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যদিও বিজেপির তরফে সেই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
চাপড়ার ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে কারণ এর আগেও মহুয়া মৈত্রকে একই ধরনের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল। গত ১ জুলাই পলাশীতে তৃণমূলের একটি বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তাঁর বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখানোর অভিযোগ ওঠে। সে সময় তাঁকে উদ্দেশ করে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি ডিম ছোড়ার অভিযোগও সামনে এসেছিল। সেই ঘটনার পরও তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে বিস্তর রাজনৈতিক তরজা হয়েছিল।
এ বার চাপড়ার এলেম নগরের ঘটনায় সেই বিতর্ক ফের সামনে এল। পরপর দুই ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, মহুয়ার রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে কি পরিকল্পিত ভাবে বিরোধী বিক্ষোভ সংগঠিত করা হচ্ছে? নাকি স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষোভ থেকেই এই প্রতিবাদ? দু’পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ায় এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত স্পষ্ট নয়।
তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বক্তব্য, নির্বাচিত সাংসদকে তাঁর নিজের সংসদীয় এলাকার মধ্যে দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে বাধা দেওয়া গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ভাল বার্তা নয়। তাঁদের অভিযোগ, বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকেরা রাজনৈতিক কর্মসূচি বানচাল করার উদ্দেশ্যেই রাস্তা আটকে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। পুলিশের হস্তক্ষেপ না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারত বলেও দাবি তাঁদের।
বিজেপির পাল্টা বক্তব্য, সাধারণ মানুষ যদি কোনও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তাকে রাজনৈতিক ভাবে দমন করার চেষ্টা করা উচিত নয়। বিজেপি নেতা খলিল শেখের দাবি, মহুয়ার বিরুদ্ধে এলাকায় অসন্তোষ রয়েছে এবং সেই কারণেই প্রতিবাদ হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এই প্রতিবাদ আগামী দিনেও চলবে।
তবে বিক্ষোভকারীদের পরিচয় এবং তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে দুই দলের মধ্যে যে দাবি-পাল্টা দাবি উঠেছে, তা প্রশাসনের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। পুলিশের ভূমিকা মূলত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাস্তা সচল রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে জানা গিয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনও বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
মহুয়ার এই বিক্ষোভের ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন নদিয়া জেলার তৃণমূল রাজনীতিতে একাধিক বিষয়ে দলের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন নিয়ে আলোচনা চলছে। তেহট্ট-১ পঞ্চায়েত সমিতির ছয় সদস্যকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর দলের সাংগঠনিক অবস্থান নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। সেই আবহে সাংসদের চাপড়া সফর এবং পথের বিক্ষোভ ঘটনাটিকে আরও রাজনৈতিক তাৎপর্য দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বা জনপ্রতিনিধির সফরকে কেন্দ্র করে রাস্তা আটকে দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হয়। যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই ভবিষ্যতে এই ধরনের কর্মসূচি বা প্রতিবাদের ক্ষেত্রে প্রশাসনের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
মহুয়ার বিরুদ্ধে এর আগেও প্রকাশ্য বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। ফলে চাপড়ার মঙ্গলবারের ঘটনাকে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না অনেকেই। তবে প্রতিটি ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা এবং স্থানীয় পরিস্থিতিও ভিন্ন। তাই প্রশাসনের তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে।
এই ঘটনার পর এখন নজর রয়েছে চাপড়ায় তৃণমূলের পরবর্তী কর্মসূচি এবং বিজেপির পাল্টা কর্মসূচির দিকে। বিক্ষোভ আরও বাড়ে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্মসূচিকে ঘিরে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশাসনের উপর চাপ বাড়তে পারে।
মঙ্গলবারের ঘটনায় শেষ পর্যন্ত পুলিশ হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সামাল দিলেও, মহুয়ার গাড়ি ঘিরে কালো পতাকা এবং ‘গো ব্যাক’ স্লোগানের ছবি ইতিমধ্যেই চাপড়ার রাজনৈতিক উত্তাপের নতুন চিত্র সামনে এনেছে। এক দিকে তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপি পরিকল্পিত ভাবে বিক্ষোভ করেছে। অন্য দিকে বিজেপির দাবি, স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ থেকেই প্রতিবাদ। ফলে ঘটনার রাজনৈতিক রেশ কত দূর গড়ায়, এখন সেটাই দেখার।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments