
নিউজ ডেস্ক; পুরনো একটি মামলায় গ্রেফতার হলেন নন্দীগ্রামের তৃণমূল কংগ্রেস নেতা বাপ্পাদিত্য গর্গ। মঙ্গলবার রাতে নন্দীগ্রাম বাজার এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ভোটারকে ভয় দেখানো এবং নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায় এই গ্রেফতার বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। বুধবার সকালে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয় নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। এরপর নন্দীগ্রাম থানায় নিয়ে আসা হয় তাঁকে। সেখান থেকে কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় হলদিয়া মহকুমা আদালতে হাজির করানো হয় তৃণমূলের প্রাক্তন ব্লক সভাপতিকে। শুনানি শেষে আদালত বাপ্পাদিত্যকে পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
একসময় নন্দীগ্রাম ১ নম্বর ব্লকে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বাপ্পাদিত্য গর্গ। দলের সাংগঠনিক দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। নন্দীগ্রাম ১-এর প্রাক্তন ব্লক সভাপতি হওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের কোর কমিটির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ছিল বলে দলেরই একাংশের দাবি। তৃণমূলের শাসনকালে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছিল। এর মধ্যে সমবায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বোমাবাজি, লোকসভা নির্বাচনে ভোটদানে বাধা এবং ভোটারদের ভয় দেখানোর মতো অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশের দাবি, ভোটারকে ভয় দেখানোর অভিযোগ সংক্রান্ত পুরনো মামলাতেই এ বার বাপ্পাদিত্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে ওই অভিযোগের বিষয়ে আদালতে পুলিশ কী কী তথ্য ও নথি পেশ করেছে, তা নিয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। বুধবার আদালতে তাঁকে হাজির করার পর তদন্তের স্বার্থে পুলিশ হেফাজত চাওয়া হয়। সেই আবেদন মঞ্জুর করে পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক।
মঙ্গলবার রাতের গ্রেফতারের পর থেকেই নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। রাতে বাজার এলাকা থেকে বাপ্পাদিত্যকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরবর্তী সময়ে গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। বুধবার সকালে তাঁকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকদের পরীক্ষার পর তাঁকে ফের থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। সেখান থেকে পুলিশের গাড়িতে করে হলদিয়া মহকুমা আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।
বাপ্পাদিত্যর গ্রেফতারের সময়টিও রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে বিভিন্ন মহল। নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন সামনে। তার আগে তৃণমূলের এক প্রাক্তন ব্লক সভাপতির গ্রেফতার স্বাভাবিক ভাবেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। যদিও পুলিশের বক্তব্য, আইন মেনেই পুরনো মামলার তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে এই গ্রেফতার করা হয়েছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নির্বাচনের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ কোনও মন্তব্য করেনি।
নন্দীগ্রামে তৃণমূলের সাংগঠনিক রাজনীতিতে বাপ্পাদিত্যর ভূমিকা দীর্ঘদিনের। একসময় ব্লক স্তরে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তিনি। দলের কোর কমিটির সদস্য হিসেবেও তাঁর নাম সামনে এসেছে। সেই কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা আরও বেড়েছে।
এর আগে সোমবারই কাঁথি সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল সভাপতি পীযূষ পণ্ডাকে গ্রেফতার করে পটাশপুর থানার পুলিশ। তাঁকেও একটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে তিনি বর্তমানে সাত দিনের পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তার ঠিক পরের দিন নন্দীগ্রামের আরও এক পরিচিত তৃণমূল নেতাকে গ্রেফতার করায় শাসকদলের অন্দরে এবং বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পরপর দুই তৃণমূল নেতার গ্রেফতারকে সামনে রেখে বিরোধীদের তরফে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে, তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বক্তব্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। দলীয় মহলে বিষয়টি কী ভাবে দেখা হচ্ছে, সে দিকেও নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।
বাপ্পাদিত্যর বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অভিযোগ ওঠার কথা সামনে এসেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় ভোটারদের প্রভাবিত করা বা ভয় দেখানোর অভিযোগ রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভোটকেন্দ্রে সাধারণ মানুষের স্বাধীন ভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করাই নির্বাচন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শর্ত। সেই সংক্রান্ত কোনও মামলায় তদন্ত চললে পুলিশ বিভিন্ন সাক্ষী, অভিযোগকারী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতে বাপ্পাদিত্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা কী তথ্য পান, এখন সেদিকেই নজর।
তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত বাপ্পাদিত্য গর্গকে অভিযুক্ত হিসেবেই দেখা হবে। গ্রেফতার হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। তদন্তের পর পুলিশ কী তথ্য আদালতের সামনে পেশ করে এবং পরবর্তী সময়ে মামলার গতিপথ কোন দিকে যায়, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
নন্দীগ্রামের রাজনীতি বরাবরই রাজ্য রাজনীতির আলোচনায় থেকেছে। রাজনৈতিক সংঘর্ষ, নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা এবং দলবদলের মতো নানা ঘটনা এই বিধানসভা কেন্দ্রকে বারবার খবরের শিরোনামে এনেছে। তার মধ্যেই সামনে উপনির্বাচন। ফলে এই সময়ে কোনও পরিচিত রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ স্বাভাবিক ভাবেই বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এখন পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতে বাপ্পাদিত্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তদন্তকারী দল। পুরনো মামলার নেপথ্যে কী অভিযোগ ছিল, ঘটনার সময় তাঁর ভূমিকা কী ছিল, অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত অন্য কারও নাম তদন্তে উঠে আসে কি না—এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে পুলিশ। একই সঙ্গে আদালতের পরবর্তী শুনানিতে তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও নজর থাকবে।
সব মিলিয়ে, নন্দীগ্রামে ফের একবার রাজনৈতিক উত্তাপের আবহে সামনে এল তৃণমূলের প্রাক্তন ব্লক সভাপতি বাপ্পাদিত্য গর্গের নাম। পুরনো মামলায় তাঁর গ্রেফতার এবং পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ আপাতত জেলার রাজনৈতিক মহলে আলোচনার অন্যতম বিষয়। আগামী কয়েক দিনে তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং এই মামলায় আরও কারও নাম সামনে আসে কি না, সেটাই এখন দেখার।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments