
নিউজ ডেস্ক : দুর্গাপুজোর আর বেশি দেরি নেই। উৎসবের মরসুমে প্রতি বছরই রাজ্যের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র এবং শহরগুলিতে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। সেই ভিড়ের কথা মাথায় রেখেই এ বার হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কোনও ভাবেই হালকা ভাবে নিতে চাইছে না প্রশাসন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের একাধিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
পুজোর আগে হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বেরোনোর পথ, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স-সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় খতিয়ে দেখতে প্রশাসনিক স্তরে বৈঠক হচ্ছে। হোটেল বা রেস্তোরাঁয় পর্যটক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় কোনও ফাঁক রয়েছে কি না, সেটিই এখন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা এই তৎপরতার পিছনে বড় কারণ। অগস্টে তারাপীঠের একটি হোটেলে ভয়াবহ আগুনে একাধিক পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়। এর মাত্র দু’দিনের মধ্যে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলেও অগ্নিকাণ্ডে ন’জনের মৃত্যু হয়। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ঘটনায় হোটেল ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বেরোনোর পথ এবং অন্যান্য বিধি মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এই পরপর অগ্নিকাণ্ডের পর স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—রাজ্যের পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে থাকা হোটেল ও খাবারের জায়গাগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? কোথাও জরুরি নির্গমন পথ বন্ধ রয়েছে কি না, কোথাও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা শুধুমাত্র কাগজে-কলমে রয়েছে কি না, কোথাও প্রয়োজনীয় লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে কি না—এ বার সেই সব বিষয়েই নজর দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, হোটেলগুলির বৈধ লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং ফায়ার এক্সিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি পর্যালোচনা করা হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে অতিথিদের দ্রুত নিরাপদ জায়গায় বের করে আনার মতো ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্ব পেতে পারে।
শুধু অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকলেই যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি তা আরও একবার সামনে এনেছে। আগুন লাগলে অতিথিরা কোন পথে বেরোবেন, সেই পথ খোলা ও ব্যবহারযোগ্য কি না, ধোঁয়া বেরোনোর ব্যবস্থা রয়েছে কি না এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কর্মীদের প্রশিক্ষণ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে দেখা জরুরি।
এই বৈঠকে পুর ও নগর উন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী, সচিব এবং অন্যান্য আধিকারিকদের পাশাপাশি দমকল ও পর্যটন দফতরের আধিকারিকদের উপস্থিত থাকার কথা। ফলে হোটেলগুলির নাগরিক পরিষেবা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনা—তিনটি দিক থেকেই বিষয়টি পর্যালোচনা করার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু কলকাতা বা বড় শহর নয়, পর্যটকদের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য দিঘাতেও ইতিমধ্যে প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। পুজোর ছুটিতে দিঘায় প্রতি বছরই পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়ে। সেই কথা মাথায় রেখে ওল্ড দিঘা থেকে নিউ দিঘা পর্যন্ত হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
গতকাল বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় অভিযান চালায় প্রশাসনের একাধিক দফতর। বড় ফুড চেন থেকে শুরু করে স্থানীয় ছোট খাবারের দোকান—কোনও জায়গাই এই নজরদারির বাইরে থাকেনি। খাবারের গুণমান, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়।
দিঘায় বিভিন্ন খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ নিয়ে পর্যটকদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোথাও খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কোথাও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবের অভিযোগ থাকে। পুজোর মরসুমে পর্যটকের চাপ আরও বাড়লে এই ধরনের সমস্যা যাতে বড় আকার না নেয়, সেই কারণেই আগাম অভিযান চালানো হচ্ছে।
জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমারের নেতৃত্বে এই অভিযান চালানো হয় বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। অভিযানে কাঁথির মহকুমা প্রশাসন, ব্লক স্বাস্থ্য দফতর, স্থানীয় প্রশাসন এবং নন্দীগ্রাম স্বাস্থ্য জেলার খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসনের বিভিন্ন লাইন ডিপার্টমেন্টের আধিকারিকদেরও অভিযানে রাখা হয়।
দিঘায় মূলত খাদ্য নিরাপত্তাকে সামনে রেখে অভিযান হলেও পুজোর আগে পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ পর্যটকরা শুধু রেস্তোরাঁয় খাবার খান না, তাঁরা হোটেল বা লজে থাকেন। ফলে থাকার জায়গার নিরাপত্তা নিয়ে কোনও গাফিলতি থাকলে তার প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।
প্রশাসনের নজরে তাই একসঙ্গে একাধিক বিষয় আসতে চলেছে। হোটেলের অনুমোদন রয়েছে কি না, ফায়ার লাইসেন্স বৈধ কি না, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কার্যকর অবস্থায় রয়েছে কি না এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বেরোনোর রাস্তা ব্যবহারযোগ্য কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার এক্সিটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের অগ্নিকাণ্ডের পর ভবনে জরুরি নির্গমন এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল।
দুর্গাপুজো শুধু বাঙালির উৎসব নয়, পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন ব্যবসার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। কলকাতার পাশাপাশি দিঘা, তারাপীঠ, ডুয়ার্স, পাহাড় এবং বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে এই সময়ে হোটেলগুলিতে বুকিং বাড়ে। ফলে পর্যটন মরসুম শুরু হওয়ার আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পর্যটকদের জন্য ৪০টি সরকারি হোটেল নতুন করে সাজানোর কথা জানিয়েছেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। ফলে সরকারি পরিকাঠামোর পাশাপাশি বেসরকারি হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলির ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার মান বজায় রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে পুজোর আগে রাজ্যের পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে প্রশাসনের নজর যে আরও বাড়ছে, তা স্পষ্ট। শুধু উৎসবের সময় পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো নয়, তাঁদের নিরাপদে রাখা এবং কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার করার মতো পরিকাঠামো তৈরি রাখাই এখন মূল লক্ষ্য।
তারাপীঠ ও কলকাতার সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ স্মৃতি সামনে রেখেই এ বার হোটেল-রেস্তোরাঁগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ফাঁক রাখতে চাইছে না প্রশাসন। লাইসেন্স থেকে ফায়ার এক্সিট, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থেকে খাবারের নিরাপত্তা—পুজোর আগে একাধিক স্তরে শুরু হতে পারে নজরদারি। পর্যটন মরসুম যত এগোবে, এই তৎপরতা আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments