
নিউজ ডেস্ক; নেপালে বেড়াতে গিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ায় কয়েক দিন ধরে উদ্বেগে ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কখনও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কখনও ফেরার পথ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছিল আরামবাগের একাধিক পরিবার। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান। নেপাল সফরে যাওয়া হুগলির আরামবাগের ৬৫ জন পর্যটক নিরাপদে বাড়ি ফিরলেন। বুধবার সকাল নাগাদ পর্যটকদের নিয়ে বাসটি আরামবাগে পৌঁছতেই স্বস্তি ফিরল পরিবারগুলিতে।
গত ২৪ অগস্ট আরামবাগের একটি পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে মোট ৬৫ জন বাসিন্দা নেপাল ভ্রমণে রওনা হয়েছিলেন। আরামবাগের ওলাইবিবি তলা এলাকা থেকে তাঁদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল নেপালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও ধর্মীয় স্থান ঘুরে দেখার। কিন্তু সফরের মাঝপথেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ২৬ অগস্ট নেপালের বিভিন্ন এলাকায় হড়পা বান ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর সামনে আসতে শুরু করে। খবর ছড়িয়ে পড়ার পরেই আরামবাগে থাকা পর্যটকদের পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
পর্যটন সংস্থার সঙ্গে এবং নেপালে থাকা কয়েক জন পর্যটকের সঙ্গে একটা সময় যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ না হওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়তে থাকে। পরিবারের সদস্যরা বারবার ফোন করেও সাড়া না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সকলেরই খোঁজ পাওয়া যায়। পর্যটকদের তরফে একটি ভিডিয়ো বার্তাও পাঠানো হয়। সেখানে তাঁরা জানান, তাঁরা সকলেই নিরাপদে রয়েছেন এবং তাঁদের নিয়ে উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। সেই ভিডিয়ো পরে সমাজমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। তাতে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও পরিবারের চিন্তা পুরোপুরি কাটেনি। কারণ, নেপালের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে তাঁরা ঠিক কোন পথে দেশে ফিরবেন, আদৌ যাত্রাপথ স্বাভাবিক রয়েছে কি না—তা নিয়ে সংশয় থেকেই গিয়েছিল।
অবশেষে বুধবার সকাল ৯টা নাগাদ পর্যটকদের বাস আরামবাগে পৌঁছয়। দীর্ঘ কয়েক দিন পর প্রিয়জনদের চোখের সামনে ফিরে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। নয় দিন পর মাকে সামনে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রায়গঞ্জ বিএড কলেজের অধ্যাপক অর্ণব দত্ত। তাঁর কথায়, এই কয়েক দিন বাড়ি যেন একেবারে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।
অর্ণব বলেন, টানা নয় দিন তিনি মাকে দেখতে পাননি। বাড়িতে থাকলেও মাকে ছাড়া সব কিছুই যেন অচেনা লাগছিল। বাড়ি ফেরার পর মাকে জড়িয়ে ধরে তিনি চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। এত দিন ধরে যে উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন, প্রিয়জনকে সুস্থ অবস্থায় সামনে পাওয়ার আনন্দ কোনও ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেই জানান তিনি।
পর্যটক দলের অন্যতম সদস্য শিখা দত্তও জানালেন, শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরেছেন। বড় কোনও বিপদের মুখে তাঁদের পড়তে হয়নি। তবে নেপালের পরিস্থিতির কারণে যাত্রাপথে বেশ কিছু জায়গায় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিনাথ যাওয়ার পথে নদীর পাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল পর্যটকদের মধ্যে।
শিখার বক্তব্য, নদীর পাড়ের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ায় যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতে ভয়ও পেয়েছিলেন তাঁরা। কোনও রকমে মুক্তিনাথ পৌঁছতে পারলেও সফরের পরিকল্পনা অনুযায়ী পশুপতিনাথ মন্দিরে দর্শন করা সম্ভব হয়নি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে তাঁদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়। তবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিরাপদে ফিরে আসাই তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়।
শিখা আরও বলেন, ছোটবেলা থেকেই বন্যা ও জলবন্দি পরিস্থিতি দেখেছেন তিনি। ফলে বিপদের মুহূর্তে কী ভাবে ধৈর্য ধরে থাকতে হয়, সেই অভিজ্ঞতাও কিছুটা কাজে এসেছে। নেপালের ঘটনাতেও আতঙ্কের পাশাপাশি পরিস্থিতি বুঝে সতর্ক থাকার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
এই সফরে পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাসের চালক সুরজিৎ কুণ্ডু এবং খালাসি মন্টু বটব্যালের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় পর্যটকদের নিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে মন্টুর। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অভিজ্ঞ চালক সুরজিৎ। নেপালের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাসযাত্রীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
মন্টু জানান, শনিবার নেপালের জনকপুর থেকে ফেরার যাত্রা শুরু হয়। বুধবার সকালে আরামবাগে পৌঁছন তাঁরা। পথে নেপালের নারায়ণগড় এলাকায় প্রশাসনের তরফে বড় গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। ফলে পর্যটকদের ছোট গাড়িতে করে আশপাশের কিছু এলাকা ঘুরিয়ে দেখানো হয়।
এরপর ফেরার পথে জনকপুর ও দেওঘর হয়ে তাঁরা ভারতে প্রবেশ করেন। দেশে ফিরে তারাপীঠ মন্দিরেও পুজো দেন পর্যটকরা। তারপরই আরামবাগের উদ্দেশে রওনা দেন। দীর্ঘ যাত্রার শেষে বুধবার সকালে বাস পৌঁছতেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা হয় পর্যটকদের।
মন্টুর কথায়, গোটা সফরেই তাঁর মূল চিন্তা ছিল যাত্রীদের নিরাপত্তা। কোনও বিপদের আঁচ যাতে পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি না করে, সেই চেষ্টাই করেছেন তিনি। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার খবর পাওয়ার পরেও সবাইকে নিয়ে নিরাপদে ফেরার জন্য প্রার্থনা করেছেন। তাঁর কথায়, যাত্রীরা যেন সুস্থ ভাবে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, নেপাল সফরের ধকল কাটিয়ে বাড়ি ফেরার পরও তাঁদের ভ্রমণ থেমে যাচ্ছে না। মন্টু জানিয়েছেন, শুক্রবার ফের পর্যটকদের নিয়ে পুরীর উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ নেপালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরেও ভ্রমণের উৎসাহে ভাটা পড়েনি।
এই ৬৫ জন পর্যটকের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন শুধু তাঁদের পরিবারের কাছেই স্বস্তির খবর নয়, নেপালে আটকে পড়া পর্যটকদের ফেরার ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সহযোগিতার গুরুত্বও সামনে আনল। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো পরিস্থিতিতে পর্যটকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, যাত্রাপথ সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী বিকল্প রুট বেছে নেওয়া কতটা জরুরি, আরামবাগের এই ঘটনাও যেন তারই উদাহরণ।
নেপাল সফরে গিয়ে কয়েক দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটালেও শেষ পর্যন্ত হাসিমুখেই বাড়ি ফিরলেন ৬৫ জন। পরিবারগুলির কাছে এ যেন দীর্ঘ উদ্বেগের পর বড় স্বস্তি। প্রিয়জনকে চোখের সামনে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাওয়ার আনন্দেই আপাতত চাপা পড়ে গিয়েছে নেপালের সেই আতঙ্কের স্মৃতি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments