
নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গ তথ্য কমিশনে নতুন তথ্য কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করল রাজ্য সরকার। এই নিয়োগের জন্য গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বাছাই কমিটি। সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়।
তথ্য কমিশনের শূন্য পদগুলিতে আবেদনকারী প্রার্থীদের মধ্যে থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করাই হবে এই কমিটির প্রধান দায়িত্ব। প্রার্থীদের আবেদন ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা খতিয়ে দেখার পর নির্বাচিতদের নাম নিয়োগের জন্য রাজ্যপালের কাছে সুপারিশ করা হবে। সম্প্রতি মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়ালের দফতর থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে এই কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে।
রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় তথ্য কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় সাধারণ নাগরিকদের বিভিন্ন সরকারি দফতর ও সরকারি সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনও ক্ষেত্রে তথ্য না পাওয়া গেলে বা তথ্য সংক্রান্ত আবেদনে অসন্তোষ থাকলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে উচ্চতর স্তরে আবেদন করার সুযোগ থাকে। রাজ্য সরকারের আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় আপিল এবং তথ্য সংক্রান্ত অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হল রাজ্য তথ্য কমিশন।
তথ্যের অধিকার আইন বা আরটিআই আইনের নির্দিষ্ট বিধান অনুসারেই রাজ্য তথ্য কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে নিয়োগের জন্য এই ধরনের বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে গঠিত কমিটিতে রয়েছেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা এবং রাজ্য মন্ত্রিসভার একজন সদস্য।
এই কমিটির সামনে এখন মূল দায়িত্ব হল, তথ্য কমিশনার পদের জন্য জমা পড়া আবেদনগুলি খুঁটিয়ে দেখা। প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের কাজের মূল্যায়ন করার পর যোগ্যদের তালিকা তৈরি করা হবে।
আরটিআই আইনের ১৫(৩) ধারার নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী, বাছাই কমিটি সুপারিশ তৈরি করে নিয়োগের জন্য রাজ্যপালের কাছে পাঠাবে। চূড়ান্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন ও সাংবিধানিক বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
২০০৫ সালের তথ্যের অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গেও রাজ্য তথ্য কমিশনের কাঠামো তৈরি হয়। ১২ ডিসেম্বর, ২০০৫ সালে এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরে ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে বিষয়টি গেজেটে প্রকাশিত হয়।
তার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দফতর, সরকারি সংস্থা এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংক্রান্ত অভিযোগ ও দ্বিতীয় আপিলের ক্ষেত্রে কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
সাধারণ নাগরিকের কাছে প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তথ্যের অধিকার আইনকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। সরকারি কাজকর্ম সম্পর্কে তথ্য জানতে চাওয়া থেকে শুরু করে তথ্য প্রদানে অনীহা বা বিলম্বের অভিযোগ— বিভিন্ন বিষয়ই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তথ্য কমিশনের সামনে আসতে পারে।
সেই কারণে কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে তথ্যপ্রার্থীদের বিভিন্ন আবেদন ও আপিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াতেও প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্য তথ্য কমিশনের সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ স্টেট চিফ ইনফরমেশন কমিশনারের পদটি ১০ এপ্রিল, ২০২৬ থেকে শূন্য রয়েছে।
এর আগে বীরেন্দ্র ১০ এপ্রিল, ২০২৩ থেকে ৯ এপ্রিল, ২০২৬ পর্যন্ত স্টেট চিফ ইনফরমেশন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে ওই গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়।
প্রধান তথ্য কমিশনারের পাশাপাশি তথ্য কমিশনারের কয়েকটি পদেও গত কয়েক বছরে পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম বজায় রাখতে নতুন নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
তথ্য কমিশনের বিভিন্ন পদে গত কয়েক বছরে একাধিক নিয়োগ এবং অবসরের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে বীরেন্দ্র এবং নবীন প্রকাশ তথ্য কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
পরে নবীন প্রকাশ ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ সালে দায়িত্ব থেকে অবসর নেন। কমিশনের শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের জুন মাসে ড. মৃগাঙ্ক মাহাতো এবং সঞ্চিতা কুমারকে তথ্য কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল।
তবে প্রশাসনিক পরিস্থিতি ফের পরিবর্তিত হয় চলতি বছরে। সঞ্চিতা কুমার তথ্য কমিশনারের পদ থেকে ইস্তফা দেন বলে জানা গিয়েছে। ২৫ অগাস্ট, ২০২৬ সালে রাজ্যপাল তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।
ফলে তথ্য কমিশনের শূন্য পদ পূরণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর রাখার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে।
নতুন তথ্য কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে এর আগেই পদক্ষেপ শুরু করেছিল রাজ্য প্রশাসন। গত ২৯ জুন পার্সোনেল অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্মস দফতরের পক্ষ থেকে তথ্য কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য আবেদন চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল।
সেই বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে জমা পড়া আবেদনগুলিই এবার তিন সদস্যের বাছাই কমিটির সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। আবেদনকারীদের মধ্যে থেকে নির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বেছে নেওয়া হবে।
এর পর নির্বাচিত প্রার্থীদের নাম নিয়োগের জন্য রাজ্যপালের কাছে পাঠানোর কথা রয়েছে। ফলে আগামী দিনে রাজ্য তথ্য কমিশনের শূন্য পদগুলি পূরণের ক্ষেত্রে এই কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
তথ্যের অধিকার আইন সাধারণ নাগরিককে সরকারি প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়েছে। কোনও সরকারি দফতরের কাছে তথ্য চেয়ে আবেদন করার পর প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়া গেলে বা উত্তর নিয়ে আপত্তি থাকলে নির্দিষ্ট নিয়মে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
রাজ্য সরকারের অধীন বিভিন্ন দফতর ও সংস্থার ক্ষেত্রে তথ্য সংক্রান্ত দ্বিতীয় আপিল এবং অভিযোগের নিষ্পত্তিতে রাজ্য তথ্য কমিশনের ভূমিকা রয়েছে।
তাই কমিশনের কার্যকর পরিচালনা শুধু প্রশাসনিক দিক থেকেই নয়, নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য কমিশনের সামনে জমা পড়া আবেদনগুলির সংখ্যা, আপিলের নিষ্পত্তি এবং বিভিন্ন অভিযোগের দ্রুত শুনানি— সব ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত সংখ্যক কমিশনার থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।
তিন সদস্যের কমিটি গঠনের ফলে নতুন তথ্য কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া এবার আনুষ্ঠানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছল বলেই মনে করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিরোধী দলনেতা এবং একজন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে গঠিত এই কমিটি আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। আইন নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনেই যোগ্য প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করা হবে।
রাজ্য তথ্য কমিশনের শূন্য পদগুলি কবে পূরণ হবে এবং নতুন চেয়ারম্যান বা তথ্য কমিশনার হিসেবে কারা দায়িত্ব নেবেন, এখন সেদিকেই নজর প্রশাসনিক মহলের।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments