Homeপশ্চিম মেদিনীপুরমেদিনীপুরহাতির আতঙ্কে জঙ্গলমুখো হতে ভয়, মেদিনীপুরে খাসির মাংসকেও টেক্কা দুর্গা ছাতুর দাম

হাতির আতঙ্কে জঙ্গলমুখো হতে ভয়, মেদিনীপুরে খাসির মাংসকেও টেক্কা দুর্গা ছাতুর দাম

নিউজ ডেস্ক: বর্ষার শেষভাগ এলেই জঙ্গলমহলের জঙ্গলে শুরু হয় এক বিশেষ প্রাকৃতিক সম্পদের সন্ধান। শাল গাছের গোড়ায়, ভেজা মাটিতে, ঝোপঝাড়ের
resizeplus_Screenshot 2026-08-30 151328_edited

নিউজ ডেস্ক: বর্ষার শেষভাগ এলেই জঙ্গলমহলের জঙ্গলে শুরু হয় এক বিশেষ প্রাকৃতিক সম্পদের সন্ধান। শাল গাছের গোড়ায়, ভেজা মাটিতে, ঝোপঝাড়ের আড়ালে কিংবা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় ফুটে ওঠে দুর্গা ছাতু। স্থানীয় মানুষের কাছে কাড়াঙ ছাতু নামেও পরিচিত এই বুনো ছাতু প্রতি বছরই ভাদ্র-আশ্বিন মাসে বাজারে আসে। কিন্তু এ বার সেই মরশুমি খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে নতুন সমস্যার মুখে পড়েছেন জঙ্গল লাগোয়া এলাকার বহু মানুষ। জঙ্গলের বিভিন্ন অংশে হাতির দল অবস্থান করায় গভীরে গিয়ে ছাতু সংগ্রহ করতে ভয় পাচ্ছেন অনেকেই। তার জেরেই বাজারে দুর্গা ছাতুর জোগান কমেছে এবং চড়েছে দাম।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মেদিনীপুরের কোনও কোনও বাজারে কলি অবস্থার দুর্গা ছাতুর কেজি-দর খাসির মাংসের দামকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে মেদিনীপুরে খাসির মাংস কেজি প্রতি আনুমানিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেখানে পুরোপুরি না-ফোটা অর্থাৎ কলি অবস্থায় থাকা দুর্গা ছাতুর দাম উঠেছে কেজি প্রতি প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। যদিও ছাতু ফুটে যাওয়ার পরে তার দাম অনেকটাই কমে যায়। সে ক্ষেত্রে কেজি প্রতি প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

মেদিনীপুর শহরের বিভিন্ন বাজারে ইতিমধ্যেই দুর্গা ছাতুর পসরা বসেছে। কলেজ স্কোয়ারেও দেখা যাচ্ছে বিক্রেতাদের ভিড়। ক্রেতারাও এই মরশুমি খাবারের জন্য দোকানগুলিতে ভিড় করছেন। দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই দরদাম করছেন। কেউ এক কেজি না কিনে সামান্য পরিমাণে ছাতু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তবে দাম বাড়লেও চাহিদা কমেনি বলেই দাবি বিক্রেতাদের।

বিক্রেতাদের বক্তব্য, দুর্গা ছাতু এমন কোনও খাবার নয় যা সারা বছর বাজারে পাওয়া যায়। নির্দিষ্ট সময়েই জঙ্গল থেকে তা সংগ্রহ করা সম্ভব। ফলে মরশুমে ছাতু বাজারে এলেই অনেক ক্রেতা স্বাভাবিক ভাবেই তা কিনতে চান। তার উপর স্থানীয় মানুষের কাছে এই বুনো ছাতুর স্বাদ ও রান্নার আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। তাই দাম বেড়ে গেলেও চাহিদা বজায় রয়েছে।

মেদিনীপুর শহরের কলেজ স্কোয়ারে ছাতু বিক্রি করছেন রবি রানা। তাঁর কথায়, জঙ্গলে হাতির অবস্থানের কারণেই এ বার দুর্গা ছাতুর দাম বেড়েছে। তিনি জানান, কলি ছাতু ১০০ টাকা প্রতি ১০০ গ্রাম এবং ফোটা ছাতু ৫০ টাকা প্রতি ১০০ গ্রাম দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কলি ছাতুর ক্ষেত্রে কেজি প্রতি দাম প্রায় ১০০০ টাকা এবং ফোটা ছাতুর ক্ষেত্রে প্রায় ৫০০ টাকা। অবশ্য বাজার, মান ও সংগ্রহের পরিমাণ অনুযায়ী দামের কিছুটা তারতম্য রয়েছে।

রবি রানার বক্তব্য, দাম বাড়লেও মানুষ ছাতু কিনছেন। কারণ খাসির মাংস চাইলে বছরের অন্য সময়েও কেনা যায়। কিন্তু দুর্গা ছাতুর ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। মরশুম শেষ হয়ে গেলে এই বুনো ছাতু আর সহজে পাওয়া যায় না। ফলে পছন্দের খাবারটি একবারের জন্য কিনতে অনেক ক্রেতাই বাড়তি টাকা খরচ করতে রাজি।

ব্যবসায়ীদের মতে, দুর্গা ছাতু সংগ্রহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে হাতির উপস্থিতি নিয়ে। ভালো মানের এবং বেশি পরিমাণে ছাতু পেতে হলে অনেক সময় জঙ্গলের গভীরে ঢুকতে হয়। কিন্তু পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন জঙ্গল এলাকায় বর্তমানে হাতির দল ঘোরাফেরা করছে। হাতির মুখোমুখি পড়লে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তাই আগে যাঁরা নিয়মিত জঙ্গলে ঢুকে ছাতু সংগ্রহ করতেন, তাঁদের অনেকেই এখন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

এর ফলে বাজারে ছাতুর আমদানি কমেছে। অন্য দিকে মরশুমি এই খাবারের চাহিদা প্রায় একই থাকায় স্বাভাবিক নিয়মেই দাম বেড়েছে। বিশেষ করে কলি অবস্থায় থাকা ছাতুর দাম বেশি। কারণ অনেক ক্রেতার কাছে এই অবস্থার ছাতুই বেশি পছন্দের। সরবরাহ কমে যাওয়ায় তার দামও তুলনামূলক ভাবে বেশি উঠছে।

দুর্গা ছাতু শুধু স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির অংশ নয়, জঙ্গল লাগোয়া বহু পরিবারের কাছে এটি বাড়তি আয়েরও একটি মাধ্যম। বর্ষার শেষ দিকে জঙ্গল থেকে ছাতু সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন বহু মানুষ। বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে এই কাজ করে তাঁরা সংসারে কিছু অতিরিক্ত অর্থ যোগ করতে পারেন। ফলে জঙ্গলে প্রবেশের উপর বিধিনিষেধ বা হাতির আতঙ্ক তাঁদের খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলছে।

চাঁদড়া রেঞ্জের বন আধিকারিক লক্ষ্মীকান্ত মাহাতো অবশ্য মানুষের নিরাপত্তাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, যে সব জঙ্গলে হাতির অবস্থান রয়েছে, সেই সব এলাকার বাসিন্দাদের বন দপ্তরের তরফে নিয়মিত সতর্ক করা হচ্ছে। বিশেষ করে হাতি থাকা জঙ্গলের গভীরে গিয়ে ছাতু, পাতা কিংবা শুকনো কাঠ সংগ্রহ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শুধু ছাতু সংগ্রহ নয়, গবাদি পশু নিয়েও জঙ্গলের গভীরে না যাওয়ার জন্য গ্রামবাসীদের সতর্ক করা হচ্ছে। গোরু বা ছাগল চরাতে গিয়ে মানুষ যাতে হাতির দলের কাছাকাছি চলে না যান, সে বিষয়েও নজর দেওয়া হচ্ছে বলে বন দপ্তর সূত্রে খবর।

স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে দুর্গা ছাতুর জন্মও অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলাঞ্চলে শাল গাছের গোড়ার ভেজা মাটি এই ছাতুর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। পাশাপাশি ফাঁকা মাঠ, ঝোপঝাড় এবং অন্যান্য স্যাঁতসেঁতে জায়গাতেও এই ছাতু জন্মাতে দেখা যায়। বর্ষার জল এবং মাটির আর্দ্রতা কমতে শুরু করার পর নির্দিষ্ট সময়ে এগুলি ফুটে ওঠে।

তাই দুর্গা ছাতুর মরশুমকে ঘিরে জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় এক ধরনের উৎসবের আবহও তৈরি হয়। সকালবেলা ছাতু সংগ্রহ করে তা বাজারে নিয়ে আসেন অনেকে। কোথাও নিজেরাই বিক্রি করেন, আবার কোথাও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেন। ক্রেতাদের একাংশ সরাসরি সংগ্রাহকদের কাছ থেকেও ছাতু কিনে নেন।

এ বার সেই চেনা ছবিতে খানিকটা বদল এসেছে। জঙ্গলের পথে হাতির ভয়, অন্য দিকে বাজারে চড়া দাম—দুইয়ের টানাপড়েনে দুর্গা ছাতুর মরশুম চলছে। সংগ্রাহকেরা নিরাপত্তার কারণে জঙ্গলের গভীরে যেতে পারছেন না, ফলে বাজারে জোগান কমছে। আর সেই ঘাটতির কারণেই মরশুমি এই খাবারের দাম কোথাও কোথাও খাসির মাংসকেও পিছনে ফেলেছে।

তবে বন দপ্তরের বার্তাও স্পষ্ট—দাম বা বাড়তি আয়ের আশায় হাতির উপস্থিতি থাকা জঙ্গলে ঢুকে ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। কারণ কয়েকশো টাকা বেশি উপার্জন কিংবা পছন্দের খাবার সংগ্রহের চেয়ে মানুষের জীবন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ বার দুর্গা ছাতুর বাজারে চাহিদা থাকলেও জঙ্গলে নিরাপত্তার প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, জঙ্গলমহলের দুর্গা ছাতু এ বার শুধু রসনাতৃপ্তির বিষয় নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবিকা, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং জঙ্গলে মানুষের নিরাপদ চলাচলের প্রশ্নও। এক দিকে হাতির দল, অন্য দিকে মরশুমি ছাতুর বাজার—এই দুইয়ের মাঝেই তৈরি হয়েছে মেদিনীপুরের এবারের অন্য রকম বাজারচিত্র।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved