Homeআলিপুরদুয়ারবক্সায় বাঘ আসার আগে বনবস্তি সরানোর তোড়জোড়, দু’বছরেও মেলেনি স্কুল-স্বাস্থ্যকেন্দ্র

বক্সায় বাঘ আসার আগে বনবস্তি সরানোর তোড়জোড়, দু’বছরেও মেলেনি স্কুল-স্বাস্থ্যকেন্দ্র

নিউজ ডেস্ক; বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে বাঘ ফেরানোর প্রস্তুতি তুঙ্গে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর মাত্র এক মাসের মধ্যেই ভিন্‌রাজ্য থেকে বাঘ
resizeplus_eisamay_2026-08-29_a20zd4cc_North-Bengal-news

নিউজ ডেস্ক; বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে বাঘ ফেরানোর প্রস্তুতি তুঙ্গে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর মাত্র এক মাসের মধ্যেই ভিন্‌রাজ্য থেকে বাঘ আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তার আগে ব্যাঘ্র প্রকল্পের কোর এলাকার মধ্যে থাকা জয়ন্তী বনবস্তি সরানোর কাজও শুরু করে দিয়েছে প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গলের ভিতরে বসবাসকারী পরিবারগুলিকে কালচিনির বনছায়া বস্তির কাছে পুনর্বাসন দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য ১৫ লক্ষ টাকা এবং ৮ ডেসিমেল করে জমি দেওয়ার কথা রয়েছে।

কিন্তু নতুন করে বনবস্তি সরানোর উদ্যোগ শুরু হতেই সামনে এসেছে পুরনো এক ক্ষোভ। দু’বছর আগে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের কোর এলাকা থেকে সরিয়ে বনছায়া বস্তিতে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছিল ভুটিয়া ও গাঙ্গুটিয়া বস্তির পরিবারগুলিকে। তাঁদের অভিযোগ, নতুন জায়গায় বসবাস শুরু করার পরেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো মৌলিক চাহিদাগুলি এখনও পূরণ হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, জয়ন্তীর পরিবারগুলিকেও যদি একই পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়, তা হলে বাঘ পুনর্বাসন প্রকল্পের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের সমন্বয় কতটা সফল হবে?

২০২৪ সালের মার্চ মাসে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের কোর এলাকার গাঙ্গুটিয়া এবং ভুটিয়া বস্তির পরিবারগুলিকে সরিয়ে কালচিনি ব্লকের ভাটপাড়া চা-বাগান সংলগ্ন বনছায়া বস্তিতে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ প্রয়োজনীয় পরিষেবা গড়ে তোলার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুনর্বাসনের পর রাস্তা তৈরি হয়েছে, বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হয়েছে। পানীয় জলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিন্তু নতুন বসতিতে এখনও পর্যন্ত কোনও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয় বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে শিশুদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানো— প্রতিদিনের জীবনেই নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।

বনছায়া বস্তির বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, জঙ্গল ছেড়ে মূল জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য তাঁরা প্রশাসনের পুনর্বাসন পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু দু’বছর কেটে গেলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো ন্যূনতম পরিকাঠামো না থাকায় তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

এই ক্ষোভ এবার সংগঠিত আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করেছে। গাঙ্গুটিয়ার ৬৬টি পরিবার এবং ভুটিয়া বস্তির ১৭টি পরিবার নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়ে একজোট হয়েছে। জয়ন্তী বনবস্তির বাসিন্দাদের নতুন করে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই পুরনো পুনর্বাসন প্রকল্পের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার দাবি তুলেছেন তাঁরা।

বৃহস্পতিবার জয়ন্তীর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে বনছায়া বস্তিতে যান আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসক ময়ূরী ভাসু এবং জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের আধিকারিকেরা। তাঁদের সামনে নিজেদের ক্ষোভের কথা জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। দ্রুত অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, প্রাথমিক স্কুল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির দাবি জানান তাঁরা।

জেলাশাসক বাসিন্দাদের তাঁদের দাবিগুলি লিখিত আকারে প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেই মতো শুক্রবার বনছায়া বস্তির একটি প্রতিনিধি দল কালচিনির বিডিওর কাছে দাবিপত্র জমা দিয়েছে।

দাবি আদায় মঞ্চের অন্যতম কর্মকর্তা তথা বনছায়ার বাসিন্দা মনি লামা বলেন, দীর্ঘদিন তাঁরা অপেক্ষা করেছেন। প্রশাসনের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে, সেই আশাতেই এত দিন কোনও আন্দোলনে যাননি। কিন্তু দু’বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মৌলিক পরিষেবাগুলি না মেলায় এবার তাঁরা সংগঠিত হয়েছেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

আর এক বাসিন্দা সরস্বতী ছেত্রির প্রশ্ন, জঙ্গলের জীবন ছেড়ে যদি নতুন বসতিতেও প্রয়োজনীয় পরিষেবা না মেলে, তা হলে সেই পুনর্বাসনের অর্থ কী? তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে পুনর্বাসিত পরিবারগুলির মূল ক্ষোভ— শুধু বাড়ি এবং রাস্তা তৈরি করলেই পুনর্বাসন সম্পূর্ণ হয় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জল, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য নাগরিক পরিষেবাও নিশ্চিত করতে হয়।

এদিকে জয়ন্তী বনবস্তি সরানোর প্রাথমিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গিয়েছে। বক্সার কোর এলাকার বাসিন্দাদের হরিপুরে, বনছায়া বস্তির কাছাকাছি এলাকায় পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ১৫ লক্ষ টাকা এবং ৮ ডেসিমেল জমি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। আলোচনা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবারগুলিকে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, জয়ন্তীর বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের আগে বনছায়ায় বসবাসরত পরিবারগুলির পুরনো সমস্যাগুলি সমাধান করা হবে কি না। কারণ একই এলাকায় নতুন করে আরও পরিবার এসে বসবাস শুরু করলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল এবং অন্যান্য পরিষেবার উপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

এই বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়েছে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে বাঘ ফেরানোর পরিকল্পনার কারণে। দীর্ঘদিন ধরে বাঘশূন্য বক্সায় ফের বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তুতি চলছে। কোর এলাকা থেকে মানুষের বসতি সরিয়ে বন্যপ্রাণীদের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সেই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় বনবাসী পরিবারগুলির পুনর্বাসন যদি পর্যাপ্ত নাগরিক পরিষেবা ছাড়া হয়, তা হলে স্থানীয় স্তরে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

প্রশাসনের তরফে অবশ্য বর্তমান সমস্যার দায় নিতে রাজি নন কালচিনির বিধায়ক তথা রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য উন্নয়ন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র তিন মাস হয়েছে। বনছায়া বস্তিতে যে মৌলিক পরিষেবাগুলি এখনও গড়ে ওঠেনি, তার দায় আগের তৃণমূল সরকারের বলেই দাবি তাঁর।

বিশাল লামার বক্তব্য, বর্তমান প্রশাসন শুধু পুরনো সমস্যার সমাধান করতেই নয়, বনছায়ায় একটি প্রাথমিক স্কুল, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশাপাশি হাইস্কুল তৈরির উদ্যোগও নিয়েছে। দ্রুত সেই প্রকল্পগুলির কাজ শুরু হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

রাজ্যের বনমন্ত্রীও একই সুরে জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সময় খুব বেশি পেরোয়নি। আগের সরকারের আমলে দু’বছর ধরে কেন বনছায়া বস্তির মৌলিক পরিষেবার সমস্যাগুলি মেটানো হয়নি, সেই দায় বর্তমান সরকার নেবে না। তবে সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে রাজনৈতিক দায় ঠেলাঠেলির বাইরে পুনর্বাসিত পরিবারগুলির দাবি এখন বেশ স্পষ্ট। তাঁদের প্রয়োজন স্কুল, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা। বক্সার জঙ্গলে নতুন করে বাঘ আনার আগে মানুষের পুনর্বাসন এবং তাঁদের জীবনযাত্রার ন্যূনতম নিশ্চয়তা কতটা দেওয়া যাচ্ছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

বন সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষার স্বার্থে কোর এলাকা থেকে বসতি সরানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্য থাকতেই পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন জঙ্গলে বসবাসকারী মানুষদের অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের সামাজিক ও নাগরিক পরিষেবা নিশ্চিত করাও একই ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুনর্বাসনের সাফল্য শুধু জমি বা আর্থিক ক্ষতিপূরণের অঙ্ক দিয়ে মাপা যায় না। নতুন জায়গায় পরিবারগুলি নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা নিয়ে বসবাস করতে পারছেন কি না, সেটিই আসল মাপকাঠি।

বনছায়ার অভিজ্ঞতা তাই জয়ন্তীর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। দু’বছর আগে সরানো পরিবারগুলির অভিযোগ যদি দ্রুত মেটানো না যায়, তা হলে নতুন করে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় আস্থা তৈরিতে সমস্যা হতে পারে। আর বাঘ ফেরানোর মতো বড় প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে আগামী এক মাসে বক্সায় বাঘ আনার প্রস্তুতির পাশাপাশি বনবাসী পরিবারগুলির পুনর্বাসন পরিকাঠামো নিয়েও প্রশাসন কতটা দ্রুত কাজ করে, সেদিকেই নজর থাকবে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবনযাত্রা— দু’টির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই বক্সার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সফল করতে হবে। নইলে জঙ্গলে বাঘ ফেরানোর সাফল্যের আড়ালে পুনর্বাসিত মানুষের পুরনো ক্ষোভই নতুন করে সামনে আসতে পারে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved