
নিউজ ডেস্ক; রাস্তা সারাইয়ের জন্য বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া প্রায় ১২ কোটি টাকা কি নিয়ম মেনে খরচ করা হয়েছিল? কোচবিহার পুরসভাকে ঘিরে উঠেছে এমনই গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ, রাস্তা সংস্কারের জন্য একটি গ্যাস সংস্থা এবং দু’টি টেলিকম সংস্থার দেওয়া অর্থের ৯৫ শতাংশেরও বেশি অন্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে। অস্থায়ী কর্মীদের বেতন থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পেনশন, গ্র্যাচুইটি, শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পানীয় জল প্রকল্প— একাধিক খাতে ওই অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে বলে পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি রিপোর্ট তৈরি করেছে বর্তমান প্রশাসক বোর্ড।
পুরসভা সূত্রের খবর, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি সংস্থাগুলির কাছ থেকে এই অর্থ পেয়েছিল কোচবিহার পুরসভা। রাস্তা মেরামতের কাজের জন্য দেওয়া ওই টাকা পুরসভার নিজস্ব তহবিল বা ‘ওন ফান্ড’-এ জমা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই তহবিল থেকেই বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে টাকা খরচ করা হয় বলে অভিযোগ।
তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে পেনশন বাবদ। গ্র্যাচুইটি মেটাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি অস্থায়ী পুরকর্মীদের বেতন, কনজ়ারভেন্সি বা শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, রাতে শহর পরিষ্কার রাখার বিশেষ প্রকল্প, পানীয় জল প্রকল্প-সহ একাধিক খাতেও ওই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ রাস্তা সংস্কারের জন্য নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পাওয়া অর্থের বড় অংশই অন্য কাজে চলে গিয়েছে বলে অভিযোগ।
তবে পুরসভার দাবি, ওই টাকায় কিছু রাস্তা সংস্কারের কাজও হয়েছে। কিন্তু মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে অন্য জায়গায়। যে অর্থ নির্দিষ্ট কাজের জন্য কোনও সংস্থা দিয়েছে, তা অন্য খাতে ব্যবহার করা যায় কি না, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
কোচবিহার পুরসভার আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যা ছিল বলে দাবি পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ ঘোষের। যে সময়কালে টাকা খরচের অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে, সেই সময় পুরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। তাঁর দাবি, অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনও নিয়ম ভাঙা হয়নি।
রবীন্দ্রনাথ ঘোষের বক্তব্য, বেসরকারি সংস্থাগুলির কাছ থেকে পাওয়া টাকা পুরসভার নিজস্ব তহবিলে জমা হয়েছিল। সেই কারণে ওই তহবিল থেকে পুরসভার প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাতে টাকা খরচ করা সম্ভব বলেই তাঁর দাবি। তাঁর কথায়, পুরসভার আধিকারিক-সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে খরচের একটি অংশের অডিটও হয়ে গিয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
প্রাক্তন চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি যখন পুরসভার দায়িত্ব নেন, তখন বিপুল পরিমাণ আর্থিক দায় ছিল। তাঁর দাবি, ২০০৩ সাল থেকে কর্মীদের গ্র্যাচুইটি বকেয়া ছিল। একই সঙ্গে কয়েক মাসের পেনশনও বকেয়া পড়েছিল। এমনকি একটি পেট্রল পাম্পকে প্রায় ৮৭ লক্ষ টাকা দেওয়ার বকেয়া ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। এর পাশাপাশি জিএসটি-সহ বিভিন্ন ধরনের দেনাও ছিল পুরসভার।
এই পরিস্থিতিতে পুরসভার আর্থিক দায় মেটাতে অর্থের প্রয়োজন ছিল বলে জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর বক্তব্য, পুরসভার সামনে যে সমস্ত বকেয়া ও আর্থিক সমস্যা ছিল, সেগুলি সামাল দেওয়ার জন্য অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। সেই প্রয়োজন থেকেই বিভিন্ন খাতে টাকা খরচ করা হয়েছে বলে তাঁর সাফাই।
তবে বর্তমান প্রশাসক বোর্ডের তৈরি করা রিপোর্টে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ রাস্তা সংস্কারের উদ্দেশ্যে বেসরকারি সংস্থাগুলি যে অর্থ দিয়েছিল, তার সিংহভাগই অন্য কাজে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ৯৫ শতাংশের বেশি অর্থ রাস্তা মেরামতের বাইরে বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়ে থাকলে সেই খরচের বৈধতা কী, তা নিয়েই আলোচনা শুরু হয়েছে।
পুরসভার আর্থিক সমস্যার সঙ্গে জড়িত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পেনশন এবং গ্র্যাচুইটি। অতীতে কোচবিহার পুরসভায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পেনশন নিয়মিত দেওয়া নিয়ে সমস্যা ছিল বলে জানা গিয়েছে। বহুদিন ধরে কর্মীদের গ্র্যাচুইটিও বকেয়া পড়েছিল। রাস্তা সারাইয়ের জন্য পাওয়া অর্থ ব্যবহার করে সেই বকেয়ার একটা বড় অংশ মেটানো হয়েছে বলে অভিযোগ। ফলে সাময়িক ভাবে কর্মীদের বকেয়া মেটানোর সমস্যা কমলেও পুরসভার ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কারণ পুরসভার নিজস্ব আয় সীমিত। অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পেনশনের একটি বড় অংশের দায় পুরসভার উপরেই থাকে। জানা গিয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পেনশনের প্রায় ৬০ শতাংশ পুরসভাকে বহন করতে হয়। সেই অর্থের জোগান মূলত পুরসভার কর আদায় থেকে আসে। একই সঙ্গে অস্থায়ী কর্মীদের বেতনও করের অর্থের উপর নির্ভরশীল।
ফলে একবার কোনও নির্দিষ্ট খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যয় হয়ে গেলে ভবিষ্যতে সেই খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কোচবিহার পুরসভার ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কাই তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পুরসভার তহবিলের বর্তমান অবস্থা যদি দুর্বল হয়ে থাকে, তা হলে আগামী দিনে পেনশন এবং গ্র্যাচুইটি মেটানো কতটা সম্ভব হবে, সেই প্রশ্ন উঠছে।
পুরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক আধিকারিক অবশ্য নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁর বক্তব্য, ইতিমধ্যে জমা হওয়া টাকা সম্পূর্ণ খরচ হয়ে গিয়েছে। কোন খাতের টাকা কোন খাতে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই বিষয়গুলি এখন আর আলাদা করে দেখা হচ্ছে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে গোটা খরচের একটি রিপোর্ট তৈরি করে রাখা হচ্ছে।
অর্থাৎ বর্তমান প্রশাসনের হাতে এখন মূলত খরচের হিসাব এবং তার ভিত্তিতে তৈরি রিপোর্টই রয়েছে। সেই রিপোর্টে কোন সময়ে কত টাকা এসেছে, কী ভাবে তা ব্যয় হয়েছে এবং কোন কোন খাতে অর্থ গিয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
পুরসভার আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট খাতের অর্থ অন্যত্র ব্যবহার করা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসনের সামনে জরুরি বেতন, পেনশন বা পরিষেবা চালু রাখার চাপ থাকে। কিন্তু যে অর্থ কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য দেওয়া হয়, তার ব্যবহার নিয়ে নিয়মকানুন রয়েছে। তাই কোচবিহারের ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার দেওয়া অর্থ কী শর্তে পুরসভার তহবিলে জমা হয়েছিল এবং সেই অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারের অনুমতি ছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাক্তন চেয়ারম্যান অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও টাকা ভুল ভাবে খরচ করা হয়নি। পুরসভার আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অন্য দিকে বর্তমান প্রশাসক বোর্ডের রিপোর্টে উঠে আসা তথ্যকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠছে, কেন রাস্তা সংস্কারের জন্য পাওয়া অর্থের এত বড় অংশ বেতন, পেনশন ও অন্যান্য পরিষেবার কাজে ব্যবহার করা হল।
এই বিতর্কের মধ্যে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে— ভবিষ্যতে কোচবিহার পুরসভার আর্থিক দায় কী ভাবে সামলানো হবে। অতীতের বকেয়া মেটাতে যদি এক খাতের অর্থ অন্য খাতে চলে যায়, তা হলে নতুন করে একই ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। বিশেষ করে পেনশন ও গ্র্যাচুইটির মতো নিয়মিত দায় মেটাতে স্থায়ী আয়ের প্রয়োজন।
এখন তাই নজর বর্তমান প্রশাসক বোর্ডের রিপোর্টের দিকে। প্রায় ১২ কোটি টাকা কী ভাবে খরচ হল, কোন খাতে কত টাকা গিয়েছে, রাস্তা সংস্কারে প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং ওই অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল— এই প্রশ্নগুলির উত্তরই বিতর্কের কেন্দ্রে। পাশাপাশি, অডিটে কী উঠে আসে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
রাস্তা সারাইয়ের জন্য পাওয়া অর্থ যদি সত্যিই ৯৫ শতাংশের বেশি অন্য খাতে ব্যয় হয়ে থাকে, তা হলে তার প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যাখ্যা কী, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কারণ এক দিকে পুরসভার কর্মীদের বকেয়া মেটানোর বাস্তব প্রয়োজন, অন্য দিকে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পাওয়া অর্থের ব্যবহার— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন কোচবিহার পুরসভার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments