
নিউজ ডেস্ক;শুক্রবার বিকেল। ঘড়িতে তখন প্রায় ৩টে ৪৫। কর্মব্যস্ত কলকাতার মানুষ আচমকাই থমকে গেলেন আকাশের দিকে তাকিয়ে। পশ্চিম আকাশে ঘন মেঘের একটি অংশের গায়ে ফুটে উঠেছিল রামধনুর মতো বিচিত্র রঙের ছটা। প্রথম দেখায় অনেকেরই মনে হয়েছিল, হয়তো রামধনু দেখা যাচ্ছে। কিন্তু একটু ভালো করে লক্ষ্য করতেই বোঝা যায়, বিষয়টি সাধারণ রামধনু নয়। মেঘের শরীরেই যেন ছড়িয়ে রয়েছে গোলাপি, সবুজ এবং হালকা বেগুনি রঙের মায়াবী আভা।
বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিরল ও দৃষ্টিনন্দন আলোকীয় ঘটনাকে বলা হয় ‘ক্লাউড ইরিডেসেন্স’ (Cloud Iridescence)। সহজ ভাষায় একে অনেক সময় ‘রামধনু মেঘ’ও বলা হয়। শুক্রবার বিকেলে কলকাতার আকাশে সেই দৃশ্যই ধরা পড়ে। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ ছাদ, বারান্দা কিংবা রাস্তা থেকে এই অদ্ভুত সুন্দর মেঘের ছবি তুলে রাখেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
শুক্রবারের বিকেলের কলকাতার আকাশ তখন বর্ষার মেঘে ঢাকা। তারই মধ্যে একটি পাতলা মেঘের স্তর ঘন মেঘের উপর চাদরের মতো ছড়িয়ে ছিল। সূর্যের আলো সেই পাতলা মেঘের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তৈরি করে রঙের বিচিত্র খেলা। কোথাও গোলাপি, কোথাও সবুজ, আবার কোথাও হালকা বেগুনি আভা দেখা যায়। রঙগুলি একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে মেঘের গায়ে তৈরি করেছিল এক অপার্থিব দৃশ্য।
ঘটনাটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে, অনেকেই প্রথমে বুঝতে পারেননি আকাশে ঠিক কী দেখা যাচ্ছে। কেউ ভেবেছেন রামধনু, কেউ আবার মেঘের মধ্যে কোনও অস্বাভাবিক আলোর প্রতিফলন হয়েছে বলে মনে করেছেন। পরে বিষয়টি সম্পর্কে জানাজানি হলে পরিষ্কার হয়, এটি আসলে একটি প্রাকৃতিক আলোকীয় ঘটনা।
আবহাওয়াবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ক্লাউড ইরিডেসেন্সের পিছনে রয়েছে সূর্যের আলো এবং মেঘের অতি সূক্ষ্ম কণা। সাধারণত মেঘের মধ্যে থাকা ক্ষুদ্র জলকণা বা বরফকণার আকার যখন তুলনামূলক ভাবে কাছাকাছি হয় এবং মেঘের স্তর পাতলা থাকে, তখন সূর্যালোক ওই কণাগুলির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় বিশেষ ধরনের আলোকীয় প্রক্রিয়া তৈরি করতে পারে। সেই কারণেই মেঘের গায়ে বিভিন্ন রঙের ঝলক দেখা যায়।
বিশেষ করে সূর্য যখন আকাশে তুলনামূলক নিচু অবস্থানে থাকে, তখন এই ধরনের দৃশ্য চোখে পড়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। শুক্রবার বিকেলে সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছিল। সেই সময় আকাশের উঁচু স্তরে থাকা পাতলা মেঘের উপর সূর্যের আলো পড়ে এবং মেঘের ক্ষুদ্র জলকণা বা বরফকণার সঙ্গে আলোর মিথস্ক্রিয়ায় তৈরি হয় এই রঙিন আভা।
এখানে আলোর ব্যতিচার বা ডিফ্র্যাকশন (Diffraction)-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সূর্যের সাদা আলো আসলে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর সমষ্টি। মেঘের ক্ষুদ্র কণার সঙ্গে আলো নির্দিষ্ট ভাবে মিথস্ক্রিয়া করলে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ভিন্ন ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তার ফলেই মানুষের চোখে গোলাপি, সবুজ, বেগুনি কিংবা অন্য নানা রঙের আভা ধরা দিতে পারে।
তবে ‘রামধনু মেঘ’ এবং সাধারণ রামধনু এক জিনিস নয়। সাধারণ রামধনু তৈরি হয় মূলত বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যে সূর্যের আলোর প্রতিসরণ, অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন এবং বিচ্ছুরণের ফলে। অন্যদিকে ক্লাউড ইরিডেসেন্স মূলত মেঘের ক্ষুদ্র কণার সঙ্গে আলোর ব্যতিচারজনিত মিথস্ক্রিয়ার ফল। ফলে দু’টি ঘটনাতেই রঙের উপস্থিতি থাকলেও তাদের তৈরি হওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া আলাদা।
কলকাতার আকাশে শুক্রবারের এই দৃশ্য তাই শুধু সৌন্দর্যের কারণে নয়, বৈজ্ঞানিক দিক থেকেও আকর্ষণীয়। শহরের মতো ব্যস্ত নগরীতে সাধারণত মানুষের চোখ আটকে থাকে যানজট, রাস্তা, অফিস কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে। কিন্তু শুক্রবার বিকেলে আকাশের অস্বাভাবিক রঙের খেলা কয়েক মুহূর্তের জন্য শহরবাসীর মনোযোগ সম্পূর্ণ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়।
বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা মোবাইল ফোনে সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন। ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ থেকে শুরু করে রাস্তা দিয়ে যাওয়া পথচারী—অনেকেই আচমকা পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে ছবি তুলতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলিতে দেখা যায়, সাদা ও ধূসর মেঘের স্তরের মধ্যে একটি অংশ যেন রঙিন আলোয় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
বর্ষার শেষ পর্বে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময় কলকাতার আকাশে মেঘের নানা ধরনের রূপ দেখা যায়। কখনও কালো মেঘে ঢেকে যায় গোটা আকাশ, কখনও বৃষ্টির পর হঠাৎ রোদ উঠে তৈরি হয় রামধনু। আবার বিশেষ কিছু পরিবেশে মেঘের গায়েই রঙের এমন বিচিত্র খেলা দেখা যেতে পারে। শুক্রবারের ক্লাউড ইরিডেসেন্স সেই প্রকৃতিরই একটি মনোমুগ্ধকর উদাহরণ।
এই ধরনের ঘটনা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মেঘের অবস্থান, সূর্যের কোণ এবং মেঘের মধ্যে থাকা জলকণা বা বরফকণার বৈশিষ্ট্য বদলে গেলেই রঙের সেই বিশেষ প্রভাবও মিলিয়ে যায়। ফলে যারা শুক্রবার বিকেলে এই দৃশ্য দেখেছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই তা হয়ে উঠেছে একটি আকস্মিক ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
শহরের আকাশে এমন প্রাকৃতিক দৃশ্য মানুষকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল, কংক্রিটের জঙ্গলেও প্রকৃতি তার নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হতে পারে। কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই কয়েক মিনিটের জন্য পশ্চিম আকাশ যেন রঙিন ক্যানভাসে পরিণত হয়েছিল। সূর্যের আলো, মেঘের সূক্ষ্ম কণা এবং আলোর বিজ্ঞানের মিলিত খেলায় তৈরি সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে শহরজুড়ে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের এই সময়ে আগামী দিনগুলিতেও আকাশে নানা ধরনের মেঘের দৃশ্য দেখা যেতে পারে। তবে শুক্রবারের মতো ক্লাউড ইরিডেসেন্স প্রতিদিন দেখা যায় না। তাই বিকেলের ওই কয়েক মুহূর্ত কলকাতাবাসীর কাছে নিঃসন্দেহে ছিল প্রকৃতির এক আকস্মিক উপহার।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments