Homeপশ্চিম মেদিনীপুরঘাটালটাকার লোভে নাবালকদের ফাঁদে ফেলছে চোলাই কারবারিরা, ঘাটালে উদ্বেগ

টাকার লোভে নাবালকদের ফাঁদে ফেলছে চোলাই কারবারিরা, ঘাটালে উদ্বেগ

নিউজ ডেস্ক; চোলাইয়ের কারবার ঠেকাতে পুলিশ ও আবগারি দপ্তরের অভিযান যত বাড়ছে, পাচারকারীদের কৌশলও তত বদলাচ্ছে বলে অভিযোগ। এ বার
Screenshot 2026-08-28 003658_edited

নিউজ ডেস্ক; চোলাইয়ের কারবার ঠেকাতে পুলিশ ও আবগারি দপ্তরের অভিযান যত বাড়ছে, পাচারকারীদের কৌশলও তত বদলাচ্ছে বলে অভিযোগ। এ বার নজর এড়াতে ‘ক্যারিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে নাবালকদের। অভিযোগ, মূলত দরিদ্র পরিবারের ১৪ থেকে ১৬ বছরের কিশোরদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে চোলাই পাচারের কাজে নামানো হচ্ছে। ঘাটালের মনসুকা-১ পঞ্চায়েত এলাকার সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে ঘিরে সেই অভিযোগই আরও জোরালো হয়েছে। ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক এবং স্কুলশিক্ষকদের মধ্যে।

মঙ্গলবার ঘাটালের ঘোড়ইঘাট এলাকায় এমনই একটি ঘটনা নজরে আসে স্থানীয়দের। অভিযোগ, তিনটি সাইকেলে ব্যাগভর্তি চোলাই নিয়ে কয়েক জন নাবালক ঝুমি নদীর দিকে যাচ্ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের সন্দেহ হওয়ায় তারা কিশোরদের পথ আটকে ব্যাগে কী রয়েছে, তা জানতে চান। কিন্তু কোনও উত্তর না দিয়ে তিন জনই সাইকেল এবং ব্যাগ ফেলে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পরে খবর দেওয়া হয় আবগারি দপ্তরে।

আবগারি দপ্তরের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যাগগুলি পরীক্ষা করে চোলাইয়ের পাউচ উদ্ধার করেন। দপ্তর সূত্রে খবর, প্রায় ৫০০ লিটার চোলাই নষ্ট করা হয়েছে। পাচারে ব্যবহৃত তিনটি সাইকেলও বাজেয়াপ্ত করা হয়। ঘটনার পর থেকেই এলাকায় আলোচনা শুরু হয়েছে— সত্যিই কি পুলিশ ও আবগারি দপ্তরের নজর এড়াতে নাবালকদের সামনে রেখে চোলাই পাচারের নতুন কৌশল নিয়েছে কারবারিরা?

স্থানীয়দের বক্তব্য, এই পথ দিয়ে চোলাই পাচারের অভিযোগ নতুন নয়। তাঁদের দাবি, সাইকেলের হ্যান্ডল এবং পিছনের অংশে বড় বড় থলে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সেই থলেতে থাকে পাউচবন্দি চোলাই। কিশোরেরা অনেক সময় সাইকেলে না চেপে হেঁটে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে গ্রামের অপেক্ষাকৃত নির্জন রাস্তা দিয়ে এগোয়। জনবহুল এলাকা এড়িয়ে দীর্ঘগ্রাম হয়ে তারা ঘোড়ইঘাটের ঝুমি নদীর পাড়ে পৌঁছয়। সেখান থেকে নৌকায় নদী পার হয়ে হুগলি জেলার কুলোট ও ময়াল এলাকায় চোলাই পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই যাতায়াত এখন অনেকটাই নিয়মিত হয়ে উঠেছে। ফলে নাবালকদের এ ভাবে বেআইনি কারবারে ব্যবহার করার অভিযোগ ঘিরে ঘাটাল জুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, যে বয়সে কিশোরদের স্কুলে যাওয়ার কথা, পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেই বয়সেই তাদের একটি বেআইনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আবগারি দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘাটাল মহকুমার একাধিক এলাকায় অতীতে চোলাইয়ের কারবার যথেষ্ট সক্রিয় ছিল। দাসপুরের আরিট, চন্দ্রকোণার কামারগেড়িয়া, ডিঙ্গাল, চিংড়িগেড়িয়া, মেটালা এবং ঘাটালের হরিশপুর, ইড়পালা, দীর্ঘগ্রাম-সহ বেশ কিছু এলাকায় চোলাই তৈরির অভিযোগ ছিল। দপ্তরের দাবি, আগের তুলনায় অনেক জায়গায় এই কারবার কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে মনসুকা-১ পঞ্চায়েতের দীর্ঘগ্রাম এলাকার কয়েকটি পাড়ায় এখনও চোলাই তৈরির অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘগ্রামের চার-পাঁচটি পাড়ায় চোলাই তৈরি করে তা পাউচে ভরে অন্যত্র পাঠানো হয়। বিশেষ করে পাশের হুগলি জেলার কুলোট ও ময়াল এলাকায় সেই চোলাই পৌঁছয় বলে অভিযোগ। নদীপথ এবং গ্রামের নির্জন রাস্তা ব্যবহার করায় নজর এড়ানো তুলনামূলক সহজ বলেই পাচারকারীরা এই রুট বেছে নিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

চোলাই কারবারের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তির দাবি, বিভিন্ন এলাকা থেকে ফোনে চোলাইয়ের বরাত আসে। সেই বরাতের টাকা অনলাইনেই লেনদেন হয়। তার পরে নির্দিষ্ট পরিমাণ চোলাই প্রথমে স্থানীয় মিডলম্যানদের কাছে পৌঁছয়। তাঁরাই বিভিন্ন উপায়ে তা নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তবে সম্প্রতি ধরপাকড় বাড়ায় পাচারের জন্য নাবালকদের ব্যবহার করার প্রবণতা বেড়েছে বলে ওই ব্যক্তির দাবি।

কেন নাবালকদের বেছে নেওয়া হচ্ছে? ওই কারবারির দাবি, এর অন্যতম কারণ তাদের বয়স। সাধারণত অল্পবয়সি কিশোরদের দেখে সহজে সন্দেহ হয় না। ফলে তাদের সামনে রেখে বেআইনি পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানো অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বলে মনে করেন পাচারকারীরা। স্থানীয় মিডলম্যানরাই এলাকার আর্থিক ভাবে দুর্বল পরিবারের কিশোরদের চিহ্নিত করেন বলে অভিযোগ। টাকার প্রলোভন দেখিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে তাদের এই কাজে নামানো হয়।

এই অভিযোগই সবচেয়ে বেশি চিন্তায় ফেলেছে স্থানীয় অভিভাবকদের। তাঁদের আশঙ্কা, সহজে টাকা পাওয়ার লোভে স্কুলছুট বা আর্থিক সমস্যায় থাকা কিশোররা ধীরে ধীরে চোলাই কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে। এক বার এই চক্রে ঢুকে পড়লে সেখান থেকে বেরিয়ে আসাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ঘোড়ইঘাট এলাকার এক বাসিন্দার কথায়, মঙ্গলবার তিন কিশোরকে সাইকেল নিয়ে নদীর দিকে যেতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল স্থানীয়দের। প্রশ্ন করা হলে তারা কোনও উত্তর না দিয়ে সাইকেল ও ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যায়। পরে আবগারি আধিকারিকরা এসে ব্যাগ থেকে চোলাইয়ের পাউচ উদ্ধার করেন। তাঁর কথায়, ঘটনাটি স্থানীয়দের কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের। কারণ, টাকার টোপে নিজের এলাকার কিশোররাও যে এই কারবারে জড়িয়ে পড়তে পারে, সেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছেও বিষয়টি উদ্বেগের। মনসুকা লক্ষ্মীনারায়ণ হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাপস মুখোপাধ্যায় বলেন, কিশোরদের চোলাই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ অত্যন্ত চিন্তার। তাঁর বক্তব্য, যে বয়সে পড়ুয়াদের স্কুলে থাকার কথা, সেই সময় তারা যদি বেআইনি কারবারে যুক্ত হয়ে পড়ে, তা হলে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারের উপর নয়, গোটা সমাজের উপর পড়বে। যারা নাবালকদের ব্যবহার করছে, তাদের চিহ্নিত করে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি দাবি করেন।

অন্য দিকে, ঘাটাল সার্কেল আবগারি দপ্তরের দাবি, চোলাই কারবার বন্ধ করতে এক দিকে যেমন অভিযান চালানো হচ্ছে, অন্য দিকে তেমনই বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা প্রচারও চলছে। দপ্তর সূত্রে খবর, গত দু’মাসে শুধু মনসুকা এলাকাতেই ২০ বারের বেশি তল্লাশি চালানো হয়েছে। ওই সময় প্রায় এক হাজার লিটার চোলাই এবং চোলাই তৈরির সরঞ্জাম নষ্ট করা হয়েছে। তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাজেয়াপ্ত হয়েছে সাতটি সাইকেল এবং একটি মোটরবাইক।

আবগারি দপ্তরের ঘাটাল সার্কেলের ওসি সুভাষ হালদার জানিয়েছেন, নাবালকদের চোলাই পাচারের কাজে ব্যবহার করার বিষয়টি তাঁদের কাছেও এসেছে। এই কারবার নির্মূল করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ করা হচ্ছে বলেও তাঁর দাবি। ফলে শুধু চোলাই তৈরির জায়গা নয়, পাচারের রুট এবং সেই কাজে কারা যুক্ত, তা নিয়েও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ঘাটালের সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শুধু বেআইনি চোলাই পাচারের অভিযোগ নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরও বড় সামাজিক সমস্যার দিকটিও সামনে এনেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে যদি সত্যিই নাবালকদের ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তা হলে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রশাসনের অভিযান যেমন জরুরি, তেমনই দরিদ্র পরিবারের কিশোরদের এই ধরনের প্রলোভন থেকে দূরে রাখতে পরিবার, স্কুল এবং স্থানীয় সমাজের নজরদারিও প্রয়োজন বলে মনে করছেন এলাকার বাসিন্দারা।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved