Homeপূর্ব বর্ধমানকাটোয়াকাটোয়ার যুবকের হাতে মা দুর্গার সাজ, এবার পাড়ি মেক্সিকোয়!শোলার কারুকাজে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন

কাটোয়ার যুবকের হাতে মা দুর্গার সাজ, এবার পাড়ি মেক্সিকোয়!শোলার কারুকাজে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন

নিউজ ডেস্ক : কখনও শখের বশে মাটির প্রতিমা তৈরি, কখনও নিজের তৈরি প্রতিমার জন্য সাজ বানানো। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে
resizeplus_sphEBAkpJSUKD4oq_original

নিউজ ডেস্ক : কখনও শখের বশে মাটির প্রতিমা তৈরি, কখনও নিজের তৈরি প্রতিমার জন্য সাজ বানানো। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে শুরু হয়েছিল এক শিল্পযাত্রা। আর সেই যাত্রাই এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশের মাটিতে। পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার তাঁতিপাড়ার যুবক সুমিত বরণ সাহার হাতে তৈরি মা দুর্গার সাজ এবার পাড়ি দিচ্ছে সুদূর মেক্সিকোয়। শোলা, পুঁতি, স্টোন, চুমকি, ডায়মন্ড-সহ নানা উপকরণ দিয়ে প্রায় ২০ দিন ধরে তৈরি করা হয়েছে ওই সাজ।

কাটোয়ার এই যুবকের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। নিজের আগ্রহ, পরিশ্রম এবং দীর্ঘ দিনের চর্চাকেই হাতিয়ার করে প্রতিমার সাজ তৈরির কাজ শিখেছেন তিনি। প্রথমে নিছক শখ ছিল। পরে সেই শখের কাজই ধীরে ধীরে পেশাগত পরিচিতি এনে দিয়েছে তাঁকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের তৈরি শিল্পকর্মের ছবি প্রকাশ করতেন সুমিত। সেখান থেকেই তাঁর কাজের সঙ্গে পরিচয় হয় বিভিন্ন মানুষের। একের পর এক অর্ডার আসতে শুরু করে। এ বার সেই সূত্র ধরেই মেক্সিকো থেকে এসেছে দুর্গাপুজোর সাজ তৈরির বরাত।

সুমিত জানিয়েছেন, প্রায় এক মাস আগে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এক ব্যক্তি। সেখান থেকেই মেক্সিকোর জন্য দুর্গাপুজোর সাজ তৈরির অর্ডার পান তিনি। পুরো সাজটির দাম পড়েছে ১৬ হাজার টাকা। সুমিতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনি সেটি কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। সেখান থেকে তা পাড়ি দেবে মেক্সিকোর উদ্দেশে।

বিদেশে তাঁর তৈরি শিল্পকর্ম এই প্রথম যাচ্ছে না। এর আগে তাঁর হাতে তৈরি সাজ ও অন্যান্য শিল্পকর্ম পৌঁছেছে মরিশাসে। ২০২২ সালে প্রথম বার তাঁর কাজ দেশের বাইরে যায়। তার পর সুইডেন এবং লন্ডনেও পৌঁছেছে তাঁর তৈরি সামগ্রী। তবে দুর্গাপুজোর জন্য তৈরি সম্পূর্ণ সাজ বিদেশে যাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম বলে জানিয়েছেন সুমিত।

ছোটবেলার স্মৃতিতেই লুকিয়ে রয়েছে এই শিল্পের শিকড়। কাটোয়ার কুমোরপাড়া বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় এলাকার কুমোরদের প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতেন তিনি। মাটি দিয়ে কী ভাবে ধীরে ধীরে দেবদেবীর প্রতিমার অবয়ব তৈরি হয়, তা দেখেই তাঁর মধ্যে আগ্রহ জন্মায়। পরে নিজেও মাটির প্রতিমা তৈরির চেষ্টা শুরু করেন। নিজের তৈরি প্রতিমার সাজ প্রয়োজন হওয়ায় সেখান থেকেই শুরু শোলার সাজ তৈরির চর্চা।

শুরুতে বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ নিজের আনন্দের জন্য। কিন্তু কাজের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করার পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। তাঁর তৈরি সাজের কারুকাজ নজর কাড়ে বিভিন্ন মানুষের। পরিচিতদের পাশাপাশি অপরিচিতদের কাছ থেকেও কাজের বরাত আসতে শুরু করে। এক সময় যে কাজ অবসরের শখ ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে তাঁর সৃজনশীল পরিচয়ের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে।

মেক্সিকোর জন্য তৈরি করা সাজটি আরও বিশেষ। কারণ, এতে ব্যবহার করা হয়েছে মাউন্ট বোর্ড, পুঁতি, স্টোন, আঠা, ডায়মন্ড, চুমকি-সহ একাধিক উপকরণ। প্রতিটি অংশে নিখুঁত কারুকাজ করার চেষ্টা করেছেন সুমিত। পুরো কাজটি শেষ করতে তাঁর সময় লেগেছে প্রায় ২০ দিন।

তবে এই কাজের জন্য আলাদা করে কোনও বড় কর্মশালা নেই তাঁর। পেশাগত জীবনের অন্য ব্যস্ততার মধ্যেই সময় বের করে এই কাজ করতে হয়েছে। সুমিত পেশায় তবলা বাদক। পাশাপাশি তবলা শেখানও। দিনের অন্যান্য কাজ সামলে রাত জেগে মেক্সিকোয় যাওয়ার জন্য দুর্গার সাজ তৈরি করেছেন তিনি। কাজের সময় পরিবারের সদস্যেরাও তাঁকে সহযোগিতা করেছেন।

সুমিতের কথায়, তাঁর তৈরি কাজ আগেও বিদেশে গিয়েছে। কিন্তু এ বার অনুভূতিটা কিছুটা আলাদা। কারণ, এবার শুধু কোনও একটি শিল্পসামগ্রী নয়, বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাজই দেশের সীমানা পেরিয়ে মেক্সিকোয় পৌঁছবে। নিজের হাতে তৈরি শিল্পকর্ম বিদেশের মাটিতে ব্যবহার হবে—এই ভাবনাতেই উচ্ছ্বসিত তিনি।

বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে প্রতিমার সাজের সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। শোলা, পুঁতি, চুমকি, স্টোনের মতো উপকরণ দিয়ে তৈরি সূক্ষ্ম অলঙ্করণ প্রতিমার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়। বহু শিল্পী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজের চেষ্টায় সেই শিল্প আয়ত্ত করে তা আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া নিঃসন্দেহে সুমিতের জন্য বড় প্রাপ্তি।

সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্বও এই গল্পে আলাদা করে উঠে আসছে। স্থানীয় পরিসরে তৈরি হওয়া কোনও শিল্পকর্ম কী ভাবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশের অন্য প্রান্ত বা বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে, সুমিতের যাত্রা তারই উদাহরণ। কোনও বড় বিপণন সংস্থা বা প্রদর্শনীর উপর নির্ভর না করেও নিজের কাজের ছবি নিয়মিত প্রকাশ করে তিনি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছেছেন।

মেক্সিকোয় যাওয়ার আগে সাজটি যাতে কোনও ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ সতর্ক থাকতে হচ্ছে। শোলা এবং অন্যান্য সূক্ষ্ম উপকরণে তৈরি হওয়ায় প্যাকেজিং থেকে পরিবহণ—প্রতিটি ধাপেই সাবধানতা প্রয়োজন। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বিদেশে পৌঁছনোর পরেও যাতে সাজের কারুকাজ অক্ষত থাকে, সেই প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে।

সুমিতের এই সাফল্যে খুশি তাঁর পরিবারও। পরিবারের সহযোগিতা না থাকলে পেশার পাশাপাশি রাত জেগে এত বড় কাজ শেষ করা সম্ভব হত না বলেই জানিয়েছেন তিনি। এক দিকে তবলার তাল, অন্য দিকে শোলার সূক্ষ্ম কারুকাজ—দুই ভিন্ন শিল্পকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন কাটোয়ার এই যুবক।

এক সময় কুমোরদের প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে দেখতে যে কিশোরের মনে শিল্পের প্রতি টান তৈরি হয়েছিল, আজ সেই শিল্পই তাঁকে পৌঁছে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। মরিশাস, সুইডেন, লন্ডনের পর এ বার মেক্সিকো। সীমান্ত বদলালেও তাঁর কাজের কেন্দ্রে রয়ে গিয়েছে বাংলার মাটি, দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য এবং নিজের হাতে তৈরি শিল্প।

নিছক শখ থেকে শুরু হওয়া পথচলা যে এক দিন বিদেশের মাটিতে বাংলার দুর্গাপুজোর আবহ পৌঁছে দিতে পারে, সুমিত বরণ সাহার গল্প তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মেক্সিকোয় যখন তাঁর তৈরি সাজে সেজে উঠবেন মা দুর্গা, তখন দূর দেশের সেই পুজোয় অদৃশ্য ভাবে মিশে থাকবে কাটোয়ার এক যুবকের শ্রম, ভালোবাসা এবং বাংলার শিল্প-ঐতিহ্যের স্পর্শ।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved