
নিউজ ডেস্ক; নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করেই ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। দীর্ঘ সময় নন্দীগ্রাম ছিল তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। ২০০৯ সালের বিধানসভা উপনির্বাচন থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এই কেন্দ্রের রাজনীতিতে তৃণমূলের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। এবার সেই নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রেই সম্ভাব্য উপনির্বাচনের আগে প্রার্থী খুঁজতে গিয়ে কার্যত বেকায়দায় তৃণমূল।
পুজোর আগেই নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করেছে বিজেপি। অন্যদিকে, তৃণমূলের অন্দরেই প্রার্থী হওয়া নিয়ে অনীহার খবর সামনে আসছে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব একাধিকবার বৈঠকে বসলেও এখনও পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে স্পষ্ট ছবি তৈরি হয়নি বলে দলীয় সূত্রে খবর।
নন্দীগ্রামের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রে রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হন শুভেন্দু। নন্দীগ্রামে তিনি তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করকে ৯,৬৬৫ ভোটে পরাজিত করেন। পরে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। নিয়ম অনুযায়ী, ওই কেন্দ্রেই উপনির্বাচন হওয়ার কথা।
নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস অবশ্য একসময় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০০৭ সালে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছিল গোটা এলাকা। আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘর্ষে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে নন্দীগ্রাম। সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব পড়ে ভোটের ময়দানেও।
২০০৯ সালের বিধানসভা উপনির্বাচনে প্রথমবার নন্দীগ্রামে জয় পায় তৃণমূল। দলের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন ‘শহিদ মাতা’ হিসেবে পরিচিত ফিরোজা বিবি। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূলের টিকিটে নন্দীগ্রাম থেকে জেতেন ফিরোজা। সেই বছরই রাজ্যে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস।
এরপর ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে জয়ী হন শুভেন্দু অধিকারী। পরবর্তী সময়ে রাজ্য মন্ত্রিসভাতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান তিনি। তবে ২০২০ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম হয়ে ওঠে রাজ্যের অন্যতম নজরকাড়া কেন্দ্র। তৃণমূলের হয়ে সেখানে প্রার্থী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু শুভেন্দুর কাছে ১,৯৫৬ ভোটে পরাজিত হন তিনি। যদিও ওই নির্বাচনে রাজ্যে তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় ফেরে তৃণমূল।
২০২৬ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর জয় আরও বড় ব্যবধানে আসে। তৃণমূলের পবিত্র করকে ৯,৬৬৫ ভোটে হারিয়ে ফের নন্দীগ্রাম থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন তিনি। পরে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বিধায়ক পদ ছাড়ায় আসনটি শূন্য হয়।
এই পরিস্থিতিতে উপনির্বাচনের প্রস্তুতিতে বিজেপি অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে বলে দাবি গেরুয়া শিবিরের। দলের তরফে এলাকায় জনসংযোগ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পকে সামনে রেখে মানুষের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে। বিজেপির দাবি, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর ভাবমূর্তি এবং নন্দীগ্রামে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব উপনির্বাচনে দলের পক্ষে বড় সুবিধা হয়ে উঠবে।
তৃণমূলের অন্দরেও অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা প্রকাশ্যে এসেছে। দলের বর্ষীয়ান নেতা চিত্তরঞ্জন মাইতি কার্যত নন্দীগ্রামে কঠিন লড়াইয়ের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই কেন্দ্রে বিজেপিকে হারানো তৃণমূলের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। তাঁর দাবি, দলের বহু নেতা-কর্মীর এখনও শুভেন্দুর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এবং সেই কারণেই সংগঠনকে নতুন করে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
চিত্তরঞ্জন মাইতি আরও অভিযোগ করেছেন, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বিরোধীদের পাশাপাশি তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। যদিও এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিজেপি।
অন্যদিকে, তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী অখিল গিরি পুলিশি হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, দলীয় বৈঠকে যোগ দেওয়া তৃণমূল কর্মীদের বাড়িতে পুলিশ গিয়ে চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে দলের কর্মসূচিতে অংশ নিতে ভয় পাচ্ছেন। তবে বিজেপির বিরুদ্ধে পাল্টা রাজনৈতিক লড়াইয়ের বার্তাও দিয়েছেন তিনি। অখিল গিরির বক্তব্য, নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে কে প্রার্থী হবেন, তা দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই চূড়ান্ত করবেন। বিজেপি সরকারের ব্যর্থতাকে সামনে রেখেই তৃণমূল নির্বাচনে লড়বে বলে দাবি তাঁর।
বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সিন্টু সেনাপতির দাবি, তৃণমূলের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার কারণেই দলের হয়ে নন্দীগ্রামে প্রার্থী হতে অনেকে আগ্রহী নন। তাঁর আরও দাবি, নন্দীগ্রামের মানুষ ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়নমূলক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী এক লক্ষেরও বেশি ভোটে জয়ী হবেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে পুজোর আগে নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের সম্ভাবনা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। একসময় যে কেন্দ্র তৃণমূলের উত্থানের অন্যতম প্রতীক ছিল, সেই নন্দীগ্রামেই এখন সংগঠন ধরে রাখা এবং উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে বের করা দলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, বিজেপি চাইছে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আরও বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করতে। শেষ পর্যন্ত তৃণমূল কাকে প্রার্থী করে এবং বিজেপি কাকে সামনে আনে, তার উপরই অনেকটাই নির্ভর করবে নন্দীগ্রামের পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments