Homeকলকাতাবরানগরে মহিলার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার, খুনের অভিযোগে বিক্ষোভ—পুলিশের লাঠিচার্জ

বরানগরে মহিলার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার, খুনের অভিযোগে বিক্ষোভ—পুলিশের লাঠিচার্জ

নিউজ ডেস্ক : বরানগরের অশোকগড়ে এক মহিলার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবার রাতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মৃতাকে
resizeplus_q

নিউজ ডেস্ক : বরানগরের অশোকগড়ে এক মহিলার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবার রাতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মৃতাকে খুন করে দেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমনই অভিযোগ তুলে পুলিশের হাতে দেহ তুলে দিতে অস্বীকার করেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। দীর্ঘক্ষণ ধরে বাড়ির সামনে বিক্ষোভ চলার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে বলে অভিযোগ। ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও আক্রান্ত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

মৃত মহিলার নাম রিয়া পাল (৩২)। তাঁর বাপের বাড়ি জলপাইগুড়ির পাটকাটা কলোনিতে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বরানগরের অশোকগড়ে প্রাক্তন ফুটবলার মানস দাসের বাড়িতে থাকছিলেন রিয়া। কয়েক মাস ধরে দু’জনের মধ্যে লিভ-ইন সম্পর্ক ছিল বলে জানা গিয়েছে। পেশায় আইনজীবী রিয়া এর আগে মানসের বিবাহবিচ্ছেদের মামলার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। দু’জনেই বিবাহবিচ্ছিন্ন ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে খবর।

শনিবার সন্ধ্যায় মানস দাস থানায় ফোন করে জানান, বাড়ির একটি ঘরের ভিতরে রিয়াকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পাওয়া গিয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশের দাবি, ঘরের দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে রিয়ার দেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর নিয়ম মেনে দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু সেই সময়েই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, এটি নিছক আত্মহত্যার ঘটনা নয়। তাঁদের দাবি, রিয়াকে খুন করার পর তাঁর দেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে এখনও কোনও প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। পুলিশের তরফেও রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত খুনের কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হওয়ার কথা জানানো হয়নি। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অশোকগড়ের ওই বাড়িতে মানস দাসের সঙ্গে তাঁর ৬৫ বছর বয়সি মা এবং এক বোনও থাকেন। মানস অতীতে মোহনবাগান-সহ একাধিক নামী ক্লাবে ফুটবল খেলেছেন। বর্তমানে তিনি মেট্রোরেলের কর্মী বলে জানা গিয়েছে। তাঁর আগের স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। রিয়ার সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আগে থেকেই আলোচনা ছিল বলে জানা গিয়েছে।

রিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মানসের বাড়ির সামনে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড় জমতে শুরু করে। তাঁদের অভিযোগ, ওই পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকার মানুষের সম্পর্ক ভালো নয়। মানসের বিরুদ্ধে তাঁর আগের স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগও স্থানীয়দের একাংশের মুখে শোনা যায়। এমনকি মানসের বাবার মৃত্যুকেও ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি বিক্ষোভকারীদের। তবে এই সমস্ত অভিযোগের কোনওটিই এখনও তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি ছিল, রিয়ার পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে না আসা পর্যন্ত দেহ নিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। তাঁদের বক্তব্য, পরিবারের লোকজনের উপস্থিতিতে এবং তাঁদের সম্মতি নিয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ করতে হবে। এই দাবিতে দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ির সামনে অবস্থান ও বিক্ষোভ চলে। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ঘটনাস্থলে আরও পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

প্রায় রাত ১১টা পর্যন্ত চলে বিক্ষোভ। এরপর পুলিশ দেহ উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়দের দাবি। পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশ লাঠিচার্জ করে ভিড় সরিয়ে দেয় এবং দেহ উদ্ধার করে বলে অভিযোগ। পুলিশের এই পদক্ষেপ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে।

ঘটনার সময় সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাও পুলিশের আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিক ও ক্যামেরাকর্মীকে ধাক্কাধাক্কি করা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। যদিও পুলিশের তরফে গোটা ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তাঁদের নোটিস দিয়ে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে, রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রিয়া পালের মৃত্যুর ঘটনায় খুনের অভিযোগ দায়ের হয়নি। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, সেই বিষয়টিই এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় বিজেপি নেত্রী সঞ্চিতা চৌধুরিও ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিক্ষোভের সময় পুলিশ স্থানীয় বাসিন্দাদের উপর লাঠিচার্জ করেছে। তাঁর নিজের পাশাপাশি তাঁর স্বামী ও ছেলেকেও মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাও পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাননি বলে অভিযোগ তাঁর। তাঁর বক্তব্য, এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে ওই পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ জানিয়ে আসছেন।

তবে রিয়া পালের মৃত্যুর পিছনে আসলে কী কারণ রয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আত্মহত্যা, নাকি অন্য কোনও কারণে মৃত্যু—তা নিশ্চিত করতে তদন্তের পাশাপাশি ময়নাতদন্তের রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে পুলিশ। একইসঙ্গে স্থানীয়দের তোলা অভিযোগগুলিও তদন্তের আওতায় আসে কি না, সেটিও নজরে রয়েছে। রিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের হলে তদন্তের গতিপথ আরও স্পষ্ট হতে পারে।

ঘটনাকে ঘিরে বরানগরের অশোকগড়ে এখনও চাপা উত্তেজনা রয়েছে। একদিকে মৃতার মৃত্যুর কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য, অন্যদিকে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষের অভিযোগ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। এখন তদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং বিক্ষোভের সময় ঠিক কী ঘটেছিল, সেই দুই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই পুলিশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ।

No Comments

তাজা খবর