
নিউজ ডেস্ক: সম্পত্তি নিয়ে বিবাদের জেরে বৃদ্ধ বাবাকে খুনের অভিযোগ উঠেছিল নিজের ছেলের বিরুদ্ধেই। শুধু তাই নয়, সেই হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূরও ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ। মায়ের চোখের সামনেই স্বামীকে খুন হতে দেখেছিলেন স্ত্রী। প্রাণে বাঁচতে শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে পালিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল তাঁকে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা মামলার শেষে সেই ঘটনায় অভিযুক্ত ছেলে ও পুত্রবধূকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিল চন্দননগর আদালত। ঘটনাটি হুগলির তারকেশ্বরের গৌরবাটি গ্রামের।
মৃতের নাম আদিত্য কোলে। ২০২৩ সালের ৬ জুলাই রাতে নিজের বাড়িতেই তাঁকে খুন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। ঘটনায় তাঁর ছেলে অমিত কোলে এবং পুত্রবধূ পূজা কোলের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আদালতে নিহতের স্ত্রী সাবিত্রীর সাক্ষ্যই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে। তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আদালতে নিজের বক্তব্য জানান।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার দিন রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে বাড়ির দোতলার ঘরে ঘুমোতে গিয়েছিলেন আদিত্য। তাঁর স্ত্রী সাবিত্রী পাশের একটি ঘরে নাতনিকে নিয়ে ছিলেন। রাত বাড়ার পর আচমকাই স্বামীর ঘরের দিক থেকে চিৎকার শুনতে পান তিনি।
সাবিত্রী ঘর থেকে বেরোনোর চেষ্টা করলে দেখতে পান, তাঁর ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে তিনি চিৎকার শুরু করেন। পরে নাতি এসে দরজা খুলে দিলে তিনি দ্রুত স্বামীর ঘরের দিকে যান।
সেখানেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান বৃদ্ধা। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, আদিত্যের বুকের উপর বসেছিলেন ছেলে অমিত। তাঁর হাতে দস্তানা ছিল। ঘরে উপস্থিত ছিলেন পুত্রবধূ পূজাও। সাবিত্রীর বক্তব্য, তাঁর চোখের সামনেই অমিত বাবার গলা টিপে ধরেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয় আদিত্যের।
অভিযোগ আরও গুরুতর জায়গায় পৌঁছয় এর পর। স্বামীকে খুন হতে দেখার পর সাবিত্রী নিজেও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর দাবি, পুত্রবধূর প্ররোচনায় অমিত তাঁকেও খুন করার দিকে এগিয়ে এসেছিলেন।
পরিস্থিতি বুঝে কোনও রকমে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান সাবিত্রী। পরে দেওরের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন তিনি। পরের দিনই তারকেশ্বর থানায় গিয়ে ছেলে অমিত এবং পুত্রবধূ পূজার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন।
সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে পুলিশ। অমিত ও পূজাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর ঘটনার দু’মাসের মধ্যেই, সেপ্টেম্বর মাসে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
মামলাটি দীর্ঘদিন চন্দননগর আদালতে বিচারাধীন ছিল। সরকার পক্ষের আইনজীবী শঙ্কর গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলায় মোট ১৯ জন সাক্ষীর নাম ছিল। তাঁদের মধ্যে ১২ জনের সাক্ষ্য আদালতে গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এই মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নিহত আদিত্যের স্ত্রী সাবিত্রীর সাক্ষ্য।
কারণ, পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার সময় বাড়িতেই ছিলেন তিনি এবং স্বামীকে খুন করার ঘটনাটি নিজের চোখে দেখেছিলেন। আদালতে তাঁর বয়ান মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
সরকার পক্ষের আইনজীবী অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর এবং পরিকল্পিত ভাবে বৃদ্ধকে খুন করা হয়েছিল। এমনকি প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে অভিযুক্তের হাতে দস্তানা থাকার বিষয়টিও আদালতে তুলে ধরা হয়।
সরকার পক্ষের তরফে এই হত্যাকাণ্ডকে ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই কারণে অমিত ও পূজার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিও জানানো হয়।
তবে আদালত শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের পথে হাঁটেনি। চন্দননগর আদালতের অতিরিক্ত দায়রা বিচারক মানবেন্দ্র মোহন সরকার পর্যবেক্ষণে জানান, অপরাধের গুরুত্ব নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। কিন্তু অভিযুক্ত দম্পতির দুই সন্তান রয়েছে এবং তারা দু’জনেই ছোট। সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মানবিক কারণে তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, বাবা হত্যার অভিযোগে ছেলে অমিত কোলে এবং পুত্রবধূ পূজা কোলে—দু’জনকেই দীর্ঘমেয়াদি কারাবাসের সাজা ভোগ করতে হবে।
২০২৩ সালের জুলাইয়ের সেই ঘটনার পর কেটে গিয়েছে প্রায় তিন বছর। তদন্ত, চার্জশিট এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার শেষে অবশেষে আদালতের রায় সামনে এল। পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন নিহতের স্ত্রী সাবিত্রী। স্বামীকে হারানোর পাশাপাশি নিজের প্রাণও বিপন্ন হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিলেন তিনি।
এই মামলার রায় সামনে আসার পর ফের আলোচনায় এসেছে পারিবারিক সম্পত্তি, বয়স্ক বাবা-মায়ের নিরাপত্তা এবং পরিবারের ভিতরে হিংসার মতো বিষয়গুলি। নিজের সন্তানই যদি বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে চরম অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তা হলে সেই পরিবারের নিরাপত্তা ও সম্পর্কের জায়গায় কতটা গভীর সংকট তৈরি হতে পারে, এই ঘটনাও সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
তবে আদালতের রায়ে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হল—অভিযোগের গুরুত্ব, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং মামলার অন্যান্য তথ্য বিবেচনা করেই অভিযুক্ত দম্পতিকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের আবেদন গ্রহণ না করে তাঁদের দুই নাবালক সন্তানের ভবিষ্যতের বিষয়টিও আদালত বিবেচনায় রেখেছে।
ঘটনার পর সাবিত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে। অভিযুক্ত দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তের পর সেপ্টেম্বরেই চার্জশিট জমা পড়ে। পরে আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। মোট ১৯ জন সাক্ষীর তালিকা থাকলেও ১২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে বলে সরকার পক্ষের আইনজীবী জানিয়েছেন।
মামলার মূল প্রশ্ন ছিল—আদিত্যকে কী ভাবে এবং কেন খুন করা হয়েছিল, সেই ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং অভিযোগের পক্ষে কী কী প্রমাণ রয়েছে। সাবিত্রীর প্রত্যক্ষদর্শী বয়ান সেই তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
অন্য দিকে, অভিযুক্তের হাতে দস্তানা থাকার অভিযোগও মামলার অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। সরকার পক্ষের দাবি ছিল, প্রমাণ না রাখার উদ্দেশ্যেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আদালতের রায়ে অবশ্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই নির্ধারিত হয়েছে।
হুগলির তারকেশ্বরের এই ঘটনায় তাই প্রায় তিন বছর পর আদালতের রায় এল। বৃদ্ধ বাবাকে হত্যার অভিযোগে ছেলে ও পুত্রবধূ—দু’জনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হল। আর সেই মামলার কেন্দ্রে থেকে সাক্ষ্য দিলেন সেই বৃদ্ধা, যিনি নিজের চোখের সামনে স্বামীকে হারিয়েও কোনও রকমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments